জাকির মুন্সী বেশ কেতাদুরস্ত লোক। সে সরকারি দপ্তরে তোয়ালে, টিস্যু, কলম, আলপিন সরবরাহ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ায়; নব্বুই-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের সঙ্গে পরিচয় ছিল। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে সেই যে সে ১৯৯১ সালে সচিবালয়ে সূঁচ হয়ে ঢুকেছে; আজ অবধি সে ফাল হয়ে বের হয়নি। তার নীতি হচ্ছে সবসময় সূঁচ হয়ে রয়ে যাওয়া। কী বিএনপি, কী আওয়ামী লীগ, কী কেয়ারটেকার সরকার, কী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার; মুন্সী নতুন মন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টার জন্য নতুন তোয়ালে কিনে তাদের চেয়ারের হেলানে পেতে দেয়নি; এমন হয়নি।
মুন্সী যে কোনো সরকারের একজন মন্ত্রীর একান্ত সচিবের রুমে গিয়ে কাতল মাছের মতো হাসি হাসি মুখ করে বসে থাকে। কখনো কোন একান্ত সচিব তাকে বসতে না দিলে; সেকশন অফিসারদের কক্ষে গিয়ে স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট করে; আবার একান্ত সচিবের রুমে গিয়ে বসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। নতুন সরকার আসার আনন্দে দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টি এনে মিষ্টিমুখ করানোর মাধ্যমে মুন্সীজী সচিবালয়ে মিষ্টিদাদা বলেই পরিচিত।
কখনো কোন সরকার পতনে তার কোনো মন খারাপ হয় না। তার কাছে দলের চেয়ে সচিবালয় বড়, সচিবালয়ের চেয়ে সাপ্লাই বড়। এই সাপ্লাইয়ের পয়সায় মুন্সীজী গাজিপুরে পুকুরসমেত একটি বাড়ি করেছিলো। সেই পুকুরে মাছ চাষ হয়। এই পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে পোলাও-কোর্মা-দই খেয়ে আসেনি; এমন কোনো ডাকসাইটে উপসচিব, যুগ্মসচিব, সচিব বলতে গেলে নেই।
মুন্সীজীর দুই ছেলে আর একটি মেয়ে। একজন মাদ্রাসায় পড়েছে, একজন বাংলা মিডিয়ামে আর একজন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে। ফলে একটি ছেলে মুসলিম জাতীয়তাবাদী, একটি মেয়ে বিশুদ্ধ বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী আর একটি ছেলে নির্দলীয় নিরপেক্ষ হয়েছে। এরই ফজিলতে নিজগৃহে তুরস্ক, ভারত ও এমেরিকার তিন ভক্ত নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ রচনা করেছে সে।
এক ছেলে টিএসসিতে গিয়ে কাওয়ালি গায়; এক মেয়ে জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজায় গিয়ে গুপ্ত পুরুষের উপহাস গান করে; আরেক ছেলে জিম মরিসনের গান শুনে ঝিম ধরে থাকে। ফলে মুন্সীজীর বাড়ির নিয়মিত অতিথি হিসেবে শরিয়ত, রাবেয়া, শিবব্রত, ললিতা, রহমত ও ডেভিড আসে। সর্বদলীয় আপ্যায়নের গৃহ হিসেবে মুন্সীজীর বৈঠকখানা অতিশয় সুখ্যাত।
জুলাই বিপ্লবের শুরুতে একটি ছেলে শরিয়ত ও রহমতের সঙ্গে রাজপথে যায়, মেয়েটি শিবব্রত ও ললিতার সঙ্গে মেট্রোরেল রেলস্টেশন ভাংচুর নিয়ে কাঁদে। আরেক ছেলে ডেভিডের সঙ্গে ইউনিভার্সিটির গেটে প্রতিবাদ সভা করে। মুন্সীজী তখন ফেসবুকে লিখতে থাকে, মনটা ভীষণ খারাপ লাগে। এখন এই খারাপ লাগাটা ছাত্র-জনতা হত্যা নিয়ে হতে পারে; আবার ফ্যাসিস্টের খুনে পুলিশ নিহত হওয়া নিয়েও হতে পারে। ছেলে দুইটা মোটামুটি ঠিক লাইনেই আছে দেখে, মুন্সীজী তার মেয়েকে বলে, অপয়া অপ্সরী মামণি প্রোপিক লাল করে দ্রোহ করো মা। জুলাই বিপ্লবে মিশে যাও; পরে সময় মতো আবার ‘আগেই ভালো ছিলাম’ গ্রুপে ফিরে এসো।
মুন্সীজী ঠিকই ৯ অগাস্ট সকালে একজন উপদেষ্টার চেয়ারে নতুন তোয়ালে পেতে দিয়েছিল। দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টি খেয়ে সেকশন অফিসারেরা কত না রঙ্গে মেতেছিল। ঠিকই একজন একান্ত সচিব মুন্সীজীর গাজিপুরের পুকুর বাড়িতে গিয়ে মৎস্য শিকার করে পোলাও কোর্মা দই খেয়ে এসেছিলো। মুন্সীজী ফেসবুকে ড. ইউনূসের ছবি দিয়ে আলতো করে লিখেছিল, আপনি শুধু আমাদের নন, গোটা বিশ্বের গর্ব। এক জুলাই বিপ্লবীকে ফোন করে বলেছিল, বাবা আপনার গাড়ি টাড়ি লাগলে বলবেন, আমার একটা গাড়ি গ্যারেজেই পড়ে থাকে; আপনাকে কদিন নিজের গ্রামের বাড়িতে ঘুরিয়ে আনলে গাড়িটা ধন্য হবে।
এই গাড়িটা ছাত্রলীগ, ছাত্রদল নেতাদের গ্রামের বাড়ি ঘুরিয়ে এনেছে ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে। সেদিক থেকে এটা সর্বদলীয় গাড়ি। মুন্সীজী শুধু উদিত সূর্যকেই আবাহন করে তা নয়; অস্তমিত সূর্যের জন্য জেলখানায় টক দই ও ড্রাই কেক পৌঁছে দেয়। সুতরাং ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীনতা সবদিকেই সমান নজর তার। সচিব ও ওএসডি সচিব উভয়ের জন্য মুন্সীজীর অর্ঘ্য পৌঁছে যায় তাদের বাসভবন ও হাসপাতালের বিছানায়।
মুন্সীজীর গাজিপুরের পুকুর বাড়িতে সব নেতার ছবিই যত্নে রাখা থাকে; মৌসুম অনুযায়ী ও আমন্ত্রিত অতিথির দলীয় আদর্শ অনুযায়ী নেতার ছবি টাঙ্গানো হয় অতিথির মনকে পেলব করতে।
মুন্সীজী এবার তারেক রহমানের ছবি ফেসবুকে দিয়ে বলে, তিনি আমাদের সবার নেতা। গুনী বাবা-মায়ের গুনী সন্তান।



পাঠকের মন্তব্য