রঙ্গভবনে আজ আবার পাখি ডেকেছে, ফুল ফুটেছে, প্রেসসচিব এসেছে। ছালের কণ্ঠে পিলে চমকানো ইন্টারভিউ দেখে অতিরঞ্জন বাজার পত্রিকা তার অতিবেদক ভুতুম লাহিড়ীকে রওয়ানা করে দিয়েছে শেষ রাতের বাসে। ভুতুম লাহিড়ী রঙ্গভবনে পৌঁছে প্রেস সচিবের সামনে বসে চুকচুক করে চা খাচ্ছে। শিঙাড়া ভেঙে ভেঙে চায়ে চুবিয়ে খাচ্ছে। তাতে একটা মোলায়েম বেড়ালের চুক চুক করে দুধ খাওয়ার মতো শব্দ তৈরি হয়।
–প্রেস সচিব মহোদয়, কখন ওনার দেখা পাওয়া যাবে!
–উনি এখন সংবিধান পুজো করছেন; তর্পণ মন্ত্রের মতো অনুচ্ছেদ পাঠ করছেন। সংবিধান যজ্ঞ শেষ হলেই উনি আপনাকে দেখা দেবেন। চলুন আমরা লনে গিয়ে বসি। প্রায় দেড়বছর ডাকঘর নাটকের অমলের মতো জানালার কাছে বসে থেকে থেকে; এখন উনি মুক্তির আনন্দে গোলাপবাগানে বসে থাকতে পছন্দ করেন; সেখানেই দইওয়ালা, ফকির ও প্রহরীরা আসে গল্পের ঝাঁপি নিয়ে।
লনের চেয়ারে বসে কথা শুরু হয়।
অমল: তা আপনি এলেন কোন দিক দিয়ে!
ভুতুম: আজ্ঞে আমি মনিপুর কাভার করে ইম্ফালে ছিলুম। হঠাৎ অতিরঞ্জন বাজার থেকে বলল, আগরতলা থেকে বাস সার্ভিস আবার চালু হয়েছে। সেই বাসে চেপে ঢুকে পড়েছি।
অমল: নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ।
ভুতুম: কোন মুহূর্তে আপনি সবচেয়ে ভয় পেয়েছিলেন!
অমল: রঙ্গভবনের গেটে যখন ওরা ইনকিলাব জিন্দাবাদ ও আজাদি জিন্দাবাদ শ্লোগান দিচ্ছিল। আমার তো রীতিমতো রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায়। একচুয়ালি আওয়ার টিচারস ফেইলড আস। তারা সংস্কৃত শব্দ শেখাতে না পারায়; আরবি ও ফারসি শব্দ ঢুকে পড়েছে শ্লোগানে।
ভুতুম: আমাদের জওহরলাল ইউনিভার্সিটির টিচারস অলসো ফেইলড আস। ওখানেও ইনকিলাব জিন্দাবাদ ও আজাদি জিন্দাবাদ শ্লোগান দেয়। সংস্কৃত শ্লোগান জয় শ্রীরাম দিতে চায় না কেউ।
অমল: কষ্ট হয়, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে গেল।
ভুতুম: বিপদের মুহূর্তে আপনাকে সাহস জোগাল কারা!
অমল: দইওয়ালা বলল, ভয় পাবেন না; আপনাকে আমি নীলক্ষেত, খিলক্ষেত ও কচুক্ষেতের ওপারে শ্যামলী নদী ও পাঁচমুড়া পাহাড় দেখাতে নিয়ে যাব। সেখানে লাল সুড়কি বেছানো পথে প্রহরীরা আপনাকে ঝরনার জল এনে দেবে।
ভুতুম: আর কেউ কি অভয় দিয়েছিল!
অমল: জানালার কাছে ফকির এসে বলেছিল, আপনি শুধু সংবিধান বুকে করে শুয়ে থাকুন। আজ যে ফকির কাল সে রাজা হবে। তখন আপনাকে আমরা ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার খেলায় নিয়ে যাব।
ভুতুম: কোনদিন সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছিলেন?
অমল: সুদর্শন বলে আমার একটা আলাদা গর্ব ছিল; নিজের ছবির দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি জীবনের ষাটটি বসন্ত। মানে বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই ছবি তোলা আর সে ছবি দেখা আমার শখ। অথচ পিসেমশাই মাধব দত্ত আমার ঘরের ছবিটা জোর করে নিয়ে গেল। বকা দিয়ে বলল, এত নার্সিসিজম তোমার শরীরের জন্য ভালো নয়।
ভুতুম: দ্বিতীয় কষ্ট কি ছিল!
অমল: আমি শিশুকাল থেকে খেলার ভক্ত। অথচ এ পাড়ার ছেলেদের খেলা জেতার খবরে শুভেচ্ছা জানানো বন্ধ করতে আমার জানালাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
ভুতুম: আপনার পাড়ার ছেলেরা তো খেলাতেই জেতেনি।
অমল: আমার শুভেচ্ছা জানানোর জানালা বন্ধ না করলে, ওরা ঠিকই জিতত!
ভুতুম: আপনি অভিযোগ করেছেন, পিসেমশাই আপনাকে খেলতে নেয়নি।
অমল: আমাকে বলত খোলা বাতাস আমার শরীরের জন্য খারাপ। এমনকি আমাকে পুজোর প্যান্ডেলে যেতে দেয়নি। আমড়া কাঠের ঢেঁকির পাড়ে হাঁটতে দেয়নি।
ভুতুম: এখন কেমন আছেন!
অমল: ভালো লাগছে, রহস্যময় লাগছে। সেই ফকির এখন রাজা হয়েছে, সেই প্রহরী আমাকে স্যালুট দিয়েছে। আমড়া কাঠের ঢেঁকিরা এখন আমার ইন্টারভিউ নিতে আসে। ছালের কণ্ঠ আমার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। সেই অন্তর্জলী যাত্রার বুড়োটির মতো তারুণ্য জাগছে মনে। কাউকে বলতে ইচ্ছা করছে, দেখেছ ললিতা আমি কি সুন্দর!
ভুতুম: আপনি থাকছেন স্যার!
অমল: ঝড় তুলতে এসে ঝড়ে পড়ে গিয়েছিলাম। এখন সুযোগ পেলে আবার ভাবনা নগরীতে ঝড় তুলতে চাই!
ভুতুম: কোনো আক্ষেপ কি রয়ে গেল!
অমল: বুবু আমাকে তার চরণধুলি নিতে দেননি। আমি প্রহরীর কাছে অভিমান করে বলেছি, বুবু যাওয়ার আগে আমাকে একটিবার তার চরণধুলি নিতে দিলে না কেন!



পাঠকের মন্তব্য