শুরুটা ছিল এক্কেরে সাদামাটা।একখান খেজুর আর দুই ঢোক পানি। সপ্তম শতাব্দীতে আরব সওদাগররা যখন সিলেটে পা রাখলো, তখন ইফতার মানে ছিল আধ্যাত্মিক আর দিল ঠান্ডা করা এক প্রশান্তির নাম। ইবনে বতুতা মনে হয় স্বপ্নেও ভাবেন নাই যে হজরত শাহজালাল (র.)-এর সেই সাদামাটা দুধ-ভাতের ইফতারি কয়েকশ বছর পরে বেসনের তপ্ত সাগরে ডুব দিয়া বেগুনি হইয়া আত্মপ্রকাশ করবো। তখনকার দিনে বাঙালির ইফতারি ছিল খাঁটি দেশি:খই, চিঁড়া আর ভিজানো চালের মিলনমেলা। ওইখানে কোনো ঝাঁজ ছিল না, এসিডিটির ডর-ভয়ও ছিল না। কিন্তু শান্তি কি আর বাঙালির কপালে সয়? তাই আমরা ইতিহাসের পাতার মইধ্যে নজর দিয়া নিজেদের পাতে তুইল্লা নিলাম রাজকীয় তেল-মসলার সব মরণঘাতী অস্ত্রশস্ত্র।
তেরো শতকের দিকে যখন সুলতান আর মুঘলদের ঘোড়াগুলা বাংলায় চিঁহি চিঁহি ডাক ছাইড়া ঢুকলো, লগে নিয়া আইলো পারস্যের সেই খুশবুদার রান্নার আমেজ। ঢাকার গলিতে শাহ সুজার হাত ধইরা কদম রাখলো খোরাসানি পোলাও আর হালিম। যে হালিম ছিল আরবের হরিসা, বাঙালি ওটারে ডাইল আর তেরো পদের মসলা মিশাইয়া বানাইয়া ফেললো এক থকথকে অমৃত; যা না খাইলে এখনকার দিনে রোজাটা কেমন জানি অসম্পূর্ণ থাইকা যায়। জিলাপি আইলো সেই দূর পারস্য থাইকা, প্যাঁচানো ভাগ্যের মতন বাঙালির কড়াইতে হাবুডুবু খাইলো। আর চকবাজারের সেই জগতখ্যাত বাদশাহি বাজার? সেইখানে বাকরখানি আর নানখাতাইয়ের রাজত্ব চলতো এমনভাবে, দেইখা মনে হইতো ওগুলা ইফতারি না, যুদ্ধের রসদ তৈয়ার হইতাছে!
এরপরে আইলো ব্রিটিশ আমল। লম্বা-চওড়া আফগান কাবুলিওয়ালারা ঝোলা ভইরা শুধু কিশমিশ আনে নাই, লগে আনলো ছোলা বা কাবুলি চানা। বাঙালি সেই সেদ্ধ ছোলাটারে পেঁয়াজ-মরিচ-তেল দিয়া এমন কষানো কষাইলো যে, হেইডা মুড়ির লগে এক্কেবারে সারাজীবনের লটরপটর জীবনসঙ্গিনী হইয়া গেল। এরপরে উত্তর ভারত থাইকা আইলো পাকোড়া। বাঙালি ওস্তাদরা বেগুনরে স্লাইস কইরা বেসনের মইধ্যে চুবাইয়া বানাইয়া ফেললো বেগুনি।আসলে এইডারে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য ঘোষণা করা উচিত। আলু পর্তুগিজদের হাত ধইরাই আমাগো ডেরায় ঢুকলো, বাঙালি ওরেও ছাড়লো না; মসলা দিয়া চটকায়ে বানাইয়া ফেললো আলুর চপ। পেঁয়াজু হইয়া উঠলো ফালাফেলের এক্কেবারে খালাতো-তুতো বাঙালি ভাই। এইভাবে সেই সাদামাটা ইফতারি আস্তে আস্তে পাল্টায়া হইয়া গেল এক বিরাট ডিপ ফ্রাইড উৎসব।
আজকের দিনে বাঙালির ইফতারের প্লেট মানেই হইলো এক ভয়ানক এবং জম্পেশ স্বাদের কুরুক্ষেত্র। একদিকে মুঘল আমলের হালিম-কাবাব, অন্যদিকে ব্রিটিশ আমলের চপ-কাটলেট, আর তার উপরে আধুনিক গ্লোবালাইজেশনের আশীর্বাদ নিয়া আসা চিকেন ফ্রাই আর প্রন টেম্পুরা। আগেকার দিনে মানুষ রোজা রাখতো শরীর হালকা করতে, আর এখন ইফতারি করার পরে মাইনসে নড়াচড়া করার মুরোদ হারাইয়া ফেলে, সোজাসুজি চইলা যায় ফুড কোমায়। ইতিহাস সাক্ষী আছে,আমরা ইবাদত আর সংস্কৃতির সেতুবন্ধনটা বানাইছি তেলের ওপর দিয়া। মুঘলরা গত হইছে ঠিকই, কিন্তু এই অগ্নিদগ্ধ স্বাদ বাঙালির রসনা আর পাকস্থলীর ওপর রাজত্ব করবো যুগ যুগ ধইরা।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পাচাস বারাস পাহলে; হেকিম হাবিবুর রহমান, দ্য ডেইলি স্টার, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড



পাঠকের মন্তব্য