আমি হুমায়ূন আজাদ

৩৭ পঠিত ... ৩ ঘন্টা ৪৭ মিনিট আগে

 

আমি যখন জন্মেছিলাম, চারদিকে তখন দেশভাগের অস্থিরতা। ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল। বিক্রমপুরের রাড়িখাল গ্রামের সেই সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আজও আমার নাকে লেগে আছে। আমার নাম রাখা হয়েছিল হুমাইয়ুন কবির। কিন্তু আমি জানতাম, এই কবির পরিচয়ে আমি আটকে থাকব না। আমি হতে চেয়েছিলাম প্রথাবিরোধী, হতে চেয়েছিলাম নিজের মতো। তাই অনেক পরে, ১৯৮৮ সালে আমি নিজেই নিজের নাম বদলে করলাম, হুমায়ূন আজাদ। আমি চেয়েছিলাম আমার নামের সাথে আজাদ বা স্বাধীনতা শব্দটি মিশে থাকুক।

আমার শৈশব কেটেছে পদ্মা মেঘনার অববাহিকায়, যেখানে প্রকৃতি যতটা উদার, সমাজটা ততটাই সংকীর্ণ ছিল। আমি ছাত্র হিসেবে ছিলাম মেধাবী, হয়তো একটু বেশিই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় প্রথম শ্রেণি পাওয়ার পর স্কটল্যান্ডের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ডাক দিল। সেখানে আমি লিঙ্গুইস্টিক্স বা ভাষাতত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ শিখলাম। আমার পিএইচডি থিসিস ছিল Pronominalisation in Bangla। মানুষ যখন প্রেমিকার চোখে চোখ রাখে, আমি তখন শব্দের উৎসে চোখ রাখতাম।

১৯৬৮ সালের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে লতিফা কোহিনূরকে দেখেছিলাম। আমার সহপাঠী, আমার জীবনসঙ্গিনী। ১৯৭৫-এর ১২ অক্টোবর যখন আমরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলাম, আমি জানতাম না এই নারীই হবেন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি আমাকে বলতেন প্রিয় কবি। আমার প্রথম কবিতার বই অলৌকিক ইস্টিমার যখন বের হলো, আমি বুঝেছিলাম আমার ভেতরে এক আজন্ম তৃষ্ণা আছে। সবকিছুকে ভেঙে নতুন করে গড়ার তৃষ্ণা।

আমি কেন লিখতাম? কারণ আমি দেখতাম চারদিকে অন্ধকার। বিশেষ করে নারীদের অবস্থা আমাকে পীড়া দিত। ১৯৯২ সালে আমি লিখলাম নারী। এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হলো যেন! পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থরথর করে কেঁপে উঠল। বইটা নিষিদ্ধ হলো, কিন্তু সত্য কি আর চাপা থাকে? আমি চেয়েছিলাম এ দেশের নারীরা যেন দাসের জীবন ছেড়ে মানুষের মর্যাদা পায়।

অধ্যাপনা ছিল আমার পেশা, কিন্তু লড়াই ছিল আমার নেশা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়াতে পড়াতে আমি লিখলাম  লাল নীল দীপাবলি, কত নদী সরোবর। ছোটদের জন্য লেখা হলেও এগুলো ছিল আসলে বাঙালির হাজার বছরের শেকড় সন্ধানের গল্প।

কিন্তু আমার কলম শুধু নস্টালজিয়ায় আটকে ছিল না। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম এক কালো মেঘ। ধর্মের লেবাস পরে একদল মানুষ এই সুন্দর দেশটাকে গিলে খেতে আসছে। ১৯৭১-এর সেই পরাজিত শকুনরা আবার ডানা ঝাপটাচ্ছে। আমি চুপ থাকতে পারিনি। আমার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল-এ আমি এই ভূখণ্ডের হাহাকারকে ফুটিয়ে তুলেছি। আমি জানতাম, আমি আগ্নেয়গিরির মুখে বসে বাঁশি বাজাচ্ছি। মৌলবাদীরা আমার নাম জপতে শুরু করেছিল ঘৃণার সাথে। তারা আমাকে বলছে নাস্তিক, আর আমি মনে মনে হাসতাম, আমি তো কেবল মানুষ হতে চেয়েছিলাম।

আমি জানতাম না, আমার জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক উপন্যাসটি তখনো লেখা হয়নি। আমি জানতাম না, একটি ফেব্রুয়ারি আমার জন্য অপেক্ষা করছে রক্তভেজা এক রাতের অভিশাপ নিয়ে।

আমি যখন পাক সার জমিন সাদ বাদ লিখতে শুরু করি, আমি জানতাম আমি নিজের মৃত্যুপরোয়ানায় সই করছি। ২০০৩ সালের ইত্তেফাকের ঈদ সংখ্যায় যখন এর কিয়দংশ বের হলো, চারদিকে যেন নরক নেমে এল। মৌলবাদীদের আস্ফালন, রাজপথে মিছিল, সংসদে আমাকে নিষিদ্ধ করার দাবি। সবই আমি শুনছিলাম। জামায়াত নেতা সাঈদী আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করছিলেন। কিন্তু আমি তো আপস করতে শিখিনি। আমি চেয়েছিলাম এই ভণ্ডামির মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে, যেখানে ধর্মের নাম করে একাত্তরের ঘাতকরা আবার আসীন হচ্ছে ক্ষমতার দোরগোড়ায়।

২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। বইমেলা ছিল আমার প্রাণের জায়গা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও গিয়েছিলাম বাংলা একাডেমিতে। বইয়ের ঘ্রাণ আর পাঠকদের ভালোবাসায় আমি ভুলে গিয়েছিলাম বাইরের সেই হিংস্র অন্ধকারকে। রাত তখন প্রায় ৯টা। বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের টিএসসির মোড়ে আসতেই পৃথিবীটা থমকে গেল।

দুজন ছায়ামূর্তি আচমকা সামনে এল। হাতে ধারালো চাপাতি। প্রথম কোপটা যখন আমার মুখে আর চোয়ালে পড়ল, আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, একটি বই কি তবে মানুষের প্রাণের চেয়েও ভয়ংকর? তারা আমাকে নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল। বারবার কোপানো হলো আমাকে, রক্তে ভিজে গেল প্রিয় ক্যাম্পাসের মাটি। আমি কোমায় চলে গেলাম। কিন্তু মৃত্যু কি এতই সহজ? ঢাকা আর ব্যাংককের হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমি লড়াই করলাম। যমরাজকে ফিরে যেতে হলো সেবার। ফিরে এসে আমি আবার চিৎকার করে বললাম, মৌলবাদী শক্তি আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমার কলম থামবে না।

শরীরটা আর আগের মতো ছিল না। ভাঙা চোয়াল আর ক্ষতবিক্ষত হাত নিয়ে আমি দেশ ছাড়লাম। জার্মানির মিউনিখে গেলাম পিইএন সেন্টারের ফেলোশিপ নিয়ে। ২০০৪ সালের আগস্ট মাস। মিউনিখের আকাশটা সেদিন কি খুব মেঘলা ছিল? ১২ আগস্ট সকালে আমাকে পাওয়া গেল নিথর অবস্থায়। ডাক্তাররা বললেন ‘হার্ট ফেইলিওর’। কিন্তু আমার আত্মা জানত, সেই ফেব্রুয়ারির ক্ষতগুলো আমার হৃদপিণ্ডকে কুরে কুরে খেয়েছিল। তারা আমাকে সরাসরি মারতে না পারলেও, তিলে তিলে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছিল।

লোকে বলে আমি চলে গেছি। কিন্তু আমি কি আসলেও গেছি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আমার চেয়ারটা হয়তো শূন্য, কিন্তু আমার প্রবচনগুচ্ছ আজও যুবকদের কানে বাজছে। আমি বলেছিলাম, এদেশে সবকিছু ভেঙে পড়ছে। আজও কি চারদিকে সেই ভাঙার শব্দ পান না?

আমি ছিলাম অ্যাগনস্টিক, বিশ্বাস করতাম কেবল মানবতায়। আমার তিন সন্তান। স্মিতা, মৌলি আর অনন্য। তাদের চোখে আমি বেঁচে আছি। লতিফা কোহিনূরের স্মৃতির পাতায় আমি আজও সেই প্রিয় কবি। আমার কোনো ধর্ম ছিল না, ছিল কেবল সত্য বলার এক দুর্নিবার সাহস।

আজকের তরুণরা যখন মৌলবাদের বিরুদ্ধে মিছিলে দাঁড়ায় কিংবা মুক্তচিন্তার চর্চায় কলম ধরে, তখন আমি অনুভব করি আমার পুনর্জন্ম হয়েছে। আমার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই প্রিয় বাংলায় আমি কোনোদিন হার মানতে আসিনি। আমি আছি, আমি থাকব। শব্দে, গানে এবং প্রতিটি বিদ্রোহী মানুষের মগজে।

৩৭ পঠিত ... ৩ ঘন্টা ৪৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top