সানসেট ক্লজ: মেয়াদ শেষে মায়া বাতিল

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে

দেখেন ভাই, দুনিয়াটা এখন অনেকটা ওই প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম গ্লাসের মতো। খেলেন আর ফেলে দিলেন। আগে মানুষ প্রেমে পড়লে ভাবত, জন্মান্তর টাইপ কিছু একটা হবে। মানে এই জন্মে না হলে পরের জন্মে দেখা হবে। আর এখনকার পোলাপাইন? এরা হইলো মারাত্মক ক্যালকুলেটিভ। এরা এখন সানসেট ক্লজ নিয়া ঘুরতেছে। মানে সম্পর্কের গায়ে একটা সিল মেরে রাখা, বেস্ট বিফোর সিক্স মান্থস।

ঘটনাটা সিম্পল। দুইজন মানুষ একসাথে বসবে, চা খাবে, ল্যাদ খাবে। কিন্তু তাদের পকেটে থাকবে একটা অদৃশ্য স্টপওয়াচ। তারা আগেভাগেই ফয়সালা করে নেবে, দেখো ভাই/বোন, আমরা আগামী তিন মাস বা ছয় মাস একসাথে রিকশায় ঘুরব, ফুচকা খাব, একে অপরের ইনবক্সে হার্ট ইমোজি পাঠাব। কিন্তু ক্যালেন্ডারের অমুক তারিখে গোধূলি বেলায় সূর্য যখন টুপ করে ডুববে, আমাদের এই সিনক্রোনাইজেশনও তখন অফ হয়ে যাবে। এরপর তুমি তোমার রাস্তায়, আমি আমার রাস্তায়। নো কান্নাকাটি, নো ব্লক-আনব্লক গেম, নো রাতের বেলা মদ্যপ অবস্থায় ফোন দিয়া পুরান কাসুন্দি ঘাঁটা।

কেন এই কারবার? কারণ মানুষ এখন ইমোশনাল ইনভেস্টমেন্টে ডর পায়। সে চায় না কারো পিছে দুই বছর সময় নষ্ট কইরা শেষে গিয়া শুনুক, আসলে আমাদের না ঠিক মিলছে না।

তাই তারা আগেভাগেই একটা ট্রায়াল পিরিয়ড সেট করে। অনেকটা ফ্রি সাবস্ক্রিপশনের মতো। ভালো লাগলে পরের মাসে টাকা কাটবে, না লাগলে মেয়াদের আগেই ক্যানসেল।

এটা এক অর্থে স্বচ্ছতা। আপনি জানেন আপনি কতটুকু ডুববেন। কিন্তু এই যে মেপে মেপে মায়া করা, এটা কি আসলেই সম্ভব? মায়া কি মিউনিসিপ্যালিটির পানির কল যে টাইম শেষ হইলে পানি আসা বন্ধ হইয়া যাবে? নাকি ওই মেয়াদের শেষ দিনে সূর্য ডোবার সাথে সাথে কলিজার ভেতর এক ধরণের চিনচিনে হাহাকার জমা হবে, যার কোনো ক্লজ বা শর্ত থাকে না?

পুনশ্চ:

এই যে আমরা ডিসাইড করলাম, আগামী ছয় মাস আমরা একে অপরের ছায়া হইয়া থাকব, তারপর সূর্যাস্ত হইলে ছায়া মিলায়া যাবে, এটা শুনতে যতটা কুল, প্র্যাকটিক্যালি ততটাই পেইনফুল। মানুষ তো আসলে লোহা-লক্কড় না যে পিরিয়ড শেষ হইলে জং ধইরা যাবে। সমস্যাটা বাধে ওই মেয়াদের শেষ সপ্তাহে।

যখন আপনি জানেন আর মাত্র সাতটা দিন আপনি এই চেনা মানুষটার ঘ্রাণ পাবেন, তখন ওই সাত দিন কি আপনি প্রেম করবেন নাকি ক্যালেন্ডারের পাতা গুনবেন? প্রতিটা চুমুর সময় আপনার মনে হবে, এটার ভ্যালিডিটি আর কতক্ষণ? প্রতিটা ঝগড়ার সময় আপনার মনে হবে,দূর! আর তো কয়েকদিন, এখন আর মিটমাট কইরা কী হবে! এই যে একটা ইনস্ট্যান্ট মোক্ষ পাওয়ার চেষ্টা, এটা করতে গিয়া মানুষ আসলে মুহূর্তগুলারে জ্যান্ত কবর দিয়া দিতেছে।

সুবিধাটা কী?
সুবিধা হইলো ওই যে ক্লিন ব্রেকআপ। আপনার কলিজাটা কেউ ছিঁড়া নিয়া ফুটবল খেলল না। আপনি জানেন আপনার লিমিট কতটুকু। মধ্যবিত্ত ভীরুতা নিয়া যারা বাঁচে, তাদের জন্য এটা একটা চমৎকার সেফটি নেট। আপনার ইমোশনাল ডাটা লস হইলো না, টাইম অপচয় হইলো না। বিজনেস ডিলের মতো হ্যান্ডশেক করলেন আর চইলা গেলেন।

অসুবিধাটা কই?
অসুবিধা হইলো ওই সূর্যাস্তের পর। ওই যে নির্দিষ্ট দিনটা পার হইয়া গেল, চুক্তির কাগজটা ছিঁড়া ফেললেন, তারপর যখন একলা রাতে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকাইয়া থাকবেন, তখন ওই ক্লজ কিন্তু আপনারে সঙ্গ দিবে না। তখন মনে হবে, যেই মায়া মেপে মেপে করা যায়, সেইটা কি আদৌ মায়া ছিল? নাকি দুইটা মানুষ টাইম পাস করার জন্য একটা সিস্টেম বানাইয়া নিছিল?

মানুষের মন হইলো এক বিচিত্র জঙ্গল। আপনি যদি আগে থাইকা ঠিক করেন জঙ্গলে মাত্র এক মাইল হাঁটবেন, তবে আপনি কোনোদিন বাঘের দেখা পাবেন না, হরিণও দেখবেন না, দেখবেন শুধু রাস্তার ধারের ঘাস। এই সানসেট ক্লজ দিয়া প্রেম হয় না ভাই, বড়জোর একটা সিভিল এগ্রিমেন্ট হয়।

শেষ কথা হইলো, সূর্য তো প্রতিদিন ডোবে, আবার কাল ওঠে। কিন্তু এই চুক্তিবদ্ধ প্রেমে একবার সূর্য ডুবলে সেটা আর কাল সকালে ওঠার কোনো গ্যারান্টি থাকে না। আমরা আসলে রিস্ক নিতে ভুইলা গেছি। আমরা চাই সব কিছু প্যাকেটজাত, একদম ঝকঝকে। কিন্তু ভুলে যাই যে, আসল মায়াটা ওই অগোছালো আর শর্তহীন অংকের মধ্যেই থাকে।

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top