সত্যজিৎ রায় ও ‘পথের পাঁচালী’: স্বপ্ন থেকে বিশ্বজয়

৩৯ পঠিত ... ৭ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে

 

১৯৪৪ সাল। কলকাতার ব্যস্ত মেসবাড়িতে এক দীর্ঘদেহী যুবক বসে আছেন। হাতে তুলি আর কলম। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’-র ছোটদের সংস্করণের জন্য তিনি ছবি আঁকছেন। আঁকতে আঁকতেই যুবকটি হঠাৎ থমকে যান। বইয়ের পাতা থেকে যেন অপুর শৈশব আর দুর্গার চঞ্চলতা বেরিয়ে এসে ঘরজুড়ে ছোটাছুটি শুরু করে। তখনই মনের গহীন কোণে একটা স্বপ্নের বীজ বোনা হয়ে যায়। নাম তার— সিনেমা।

সময়টা ১৯৫০। সেই যুবক, সত্যজিৎ, তখন সস্ত্রীক লন্ডনের জাহাজে। বিলেত যাওয়ার দীর্ঘ যাত্রায় সমুদ্রের নোনা হাওয়া আর ঢেউয়ের তালে তালে জাহাজের ডেক-এ বসে তিনি ডায়েরি খুললেন। কোনো প্রথাগত সংলাপ নয়, কোনো জটিল ছক নয়; বরং একটার পর একটা স্কেচ আঁকতে শুরু করলেন। ট্রেনের হুইসেল, কাশফুলের দোলা, আর বুনো ঝোপের আড়ালে এক বৃদ্ধার মুখ।

জাহাজ যখন লন্ডন বন্দরে পৌঁছালো, সত্যজিতের ব্যাগে তখন একটি নীল ডায়েরি—যাতে ধরা আছে আগামীর এক মহাকাব্য। কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন। বিলেত থেকে ফিরে কলকাতায় এসে তিনি যখন নামী প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে লাগলেন, সবাই মুখ ফিরিয়ে নিল।

এতে তো মারপিট নেই, নাচ-গান নেই, নায়ক-নায়িকা নেই! এ তো স্রেফ গাঁয়ের মানুষের হাহাকার। এ ছবি কে দেখবে রায় মশাই?

একজন তো হেসেই উড়িয়ে দিলেন। বললেন, বৃষ্টির দৃশ্য যদি তুলতেই হয়, তবে তো স্টুডিওতে জলের পাইপ লাগানো যায়, গ্রামে গিয়ে কাদা মাখার দরকার কী? সত্যজিৎ সেদিন মুচকি হেসেছিলেন। তিনি জানতেন, কৃত্রিম বৃষ্টির জল আর আকাশের অঝোর ধারার মধ্যে যে পার্থক্য, সেটাই হবে এই ছবির প্রাণ।

পকেটে টাকা নেই, কিন্তু জেদ আছে আকাশছোঁয়া। অবশেষে স্ত্রী বিজয়া রায়ের গয়না আর নিজের জমানো কয়েকটা টাকা সম্বল করে ১৯৫২ সালের এক শরতের সকালে সত্যজিৎ রওনা দিলেন গ্রামের পথে। সাথে একদল তরুণ তুর্কি, যাঁদের অধিকাংশেরই আগে কখনো সিনেমা বানানোর অভিজ্ঞতা ছিল না। শুরু হলো এক অসম লড়াইয়ের মহড়া।

১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর। বীরভূমের পালসিট গ্রামের সেই রেললাইনের ধারের মাঠ। শুরু হলো শুটিং। কিন্তু নিয়তি যেন বারবার পরীক্ষা নিচ্ছিল এই আনাড়ি দলটির। প্রথম দিনেই ঘটল এক অভাবনীয় কাণ্ড।

অপু আর দুর্গা ট্রেনের শব্দ শুনে কাশফুলের বনের ভেতর দিয়ে দৌড়াচ্ছে—এমন দৃশ্য খানিকটা নেওয়ার পর সূর্য ডুবে গেল। সত্যজিৎ ভাবলেন, বাকিটা পরের সপ্তাহে এসে নেওয়া যাবে। কিন্তু এক সপ্তাহ পর সেখানে ফিরে গিয়ে সবার চক্ষু চড়কগাছ! দিগন্তজোড়া সেই সাদা কাশফুল আর একটিও অবশিষ্ট নেই। একদল গরু এসে পরম তৃপ্তিতে পুরো মাঠের কাশফুল খেয়ে সাবাড় করে দিয়েছে! প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় ছবির শুটিং থমকে গেল পাক্কা দুই বছরের জন্য। আবার যখন কাশফুল ফুটল, তখন শুরু হলো সেই অসমাপ্ত দৃশ্যের কাজ।

কিন্তু বাধার পাহাড় সেখানেই শেষ নয়। মাঝপথে পকেট পুরোপুরি শূন্য। প্রযোজক হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। সত্যজিৎ তখন মরিয়া। একে একে স্ত্রীর হাতের বালা, গলার হার বন্ধক পড়ল। তবুও টাকা কুলোয় না। শুটিং বন্ধ হয়ে রইল দীর্ঘ দেড় বছর। সত্যজিৎ পরে এক আড্ডায় বলেছিলেন, সেই সময়টা ছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা। তিনটি জিনিসের ওপর তখন ছবির ভবিষ্যৎ ঝুলে ছিল:

১. অপুর গলার স্বর যেন বদলে না যায় (বয়স বাড়লে যা স্বাভাবিক)।

২. দুর্গা যেন হঠাৎ লম্বা হয়ে না যায়।

৩. আর সেই বয়স্কা বৃদ্ধা, চুনীবালা দেবী যেন মারা না যান।

মজার ব্যাপার হলো, প্রকৃতি আর মানুষ—সবাই যেন সেদিন সেই তরুণ শিল্পীর পক্ষ নিয়েছিল। অদ্ভুত এক নিয়মে দেড় বছর পর অপু-দুর্গার চেহারায় কোনো বদল এল না।

অবশেষে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু সরকারি লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে সিনেমার জন্য টাকা দেওয়া তো সহজ নয়! বুদ্ধি খাটিয়ে সেই টাকা বরাদ্দ করা হলো Pathways to the Village বা রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে। রেকর্ড খাতায় লেখা হলো গ্রামের রাস্তা তৈরির কাজ চলছে, অথচ সেই টাকায় আসলে তৈরি হচ্ছিল বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক রাজপথ।

টাকা এলো ঠিকই, কিন্তু সত্যজিতের জেদ ছিল অন্যখানে। তিনি স্টুডিওর কৃত্রিম আলো প্রত্যাখ্যান করে সুব্রত মিত্রকে দিয়ে উদ্ভাবন করালেন ‘বাউন্স লাইটিং’। দিনের আলোয় আয়না আর কাপড় ব্যবহার করে তৈরি হলো এমন এক স্নিগ্ধতা, যা আগে কেউ দেখেনি। টাকার অভাবে যখন পুরো ইউনিট দিশেহারা, তখন রবি শঙ্কর এলেন আবহ সংগীত করতে। হাতে সময় নেই, মাত্র ১১ ঘণ্টার এক ম্যারাথন সেশনে সেতারের সেই অমর সুরটি সৃষ্টি হলো, যা শুনলে আজও মানুষের বুক হু হু করে ওঠে।

শুটিং শেষ হলো ঠিকই, কিন্তু সত্যজিতের বিশ্রাম নেওয়ার জো নেই। নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট (MoMA) থেকে আমন্ত্রণ এসেছে—ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার করতে হবে সেখানেই। হাতে সময় মাত্র কয়েক দিন। অথচ ছবির প্রথম প্রিন্ট তখনও ল্যাবরেটরিতে।

সেই শেষ রাতটির কথা ভাবলে আজও রোমাঞ্চ জাগে। সত্যজিৎ আর তাঁর সহযোগীরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে ল্যাবে পড়ে রইলেন। রাতভর কাজ শেষে যখন একদম প্রথম প্রিন্টটি হাতে এল, তখন ভোরের আলো ফুটছে। সেই কাঁচা প্রিন্ট নিয়েই সত্যজিৎ ছুটলেন এয়ারপোর্টের দিকে। এক মুহূর্ত দেরি হলেই হয়তো ইতিহাসটা অন্যরকম হতো।

নিউইয়র্কের সেই অন্ধকার সিনেমা হলে যখন পর্দা উঠল, দর্শকরা থমকে গেলেন। নিস্তব্ধ হলে কেবল রবি শঙ্করের সেতারের সুর আর গ্রামবাংলার বাতাসের শব্দ। সিনেমার শেষে যখন আলো জ্বলল, দেখা গেল বিদেশের সেই অভিজাত দর্শকদের অনেকের চোখ ভেজা। তাঁরা স্রেফ একটি সিনেমা দেখেননি, তাঁরা দেখেছিলেন এক জননীর হাহাকার, এক কিশোরের বিস্ময় আর এক বৃদ্ধার একাকীত্ব।

১৯৫৫ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যখন ছবিটি দেখানো হলো, জুরি মেম্বাররা অভিভূত হয়ে নতুন এক পুরস্কারের নাম ঘোষণা করলেন— "বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট"। একজন সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইনার রাতারাতি হয়ে উঠলেন বিশ্ববরেণ্য নির্মাতা।

ফিরে আসার পর সত্যজিৎ এক অদ্ভুত সত্য জানতে পারলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নথিপত্রে এই ছবির খরচ এখনও রাস্তা উন্নয়ন খাতেই লেখা ছিল। আমলারা হয়তো তখন জানতেন না, এই ছবি বাংলার মাটির কোনো মেঠো পথ নয়, বরং বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন এক রাজপথ তৈরি করেছে, যা দিয়ে পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে বাঙালি পৌঁছে গেছে অস্কারের মঞ্চ পর্যন্ত।

আজও যখন বৃষ্টির শব্দে অপুর সেই দৌড় কিংবা রেললাইনের ধারে ট্রেনের কালো ধোঁয়া দেখা যায়, তখন বোঝা যায়—শিল্পের জন্য টাকার চেয়েও বড় প্রয়োজন হলো অদম্য জেদ। সেই জেদের নামই ছিল 'পথের পাঁচালী', আর তার রূপকারের নাম সত্যজিৎ রায়।

৩৯ পঠিত ... ৭ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top