আকবর বাদশার খাজনা থেইকা রমনার পান্তা-ইলিশ: বাঙালির বৈশাখী দাস্তান

৯২ পঠিত ... ০০:৫৩, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

 

সে এক এলাহি কাণ্ড! দিনটা ঠিক কবে ছিল আজ আর কারও মনে নেই, তবে দৃশ্যটা কল্পনা করা যায়। দিল্লির মসনদে বসে আছেন সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর। সম্রাটের মেজাজ আজ খুব একটা সুবিধার নয়। বৈশাখ মাস চলছে, বাইরে প্রচণ্ড রোদ, কিন্তু সম্রাটের কপালে দুশ্চিন্তার ঘাম।

সমস্যার নাম হচ্ছে চাঁদ।

মোগল দরবারে তখন খাজনা আদায় হয় হিজরি সন অনুযায়ী। হিজরি হলো চাঁদের হিসাব। চাঁদ বাবাজি তো আর ঘড়ি ধরে চলেন না, প্রতি বছর ১০-১১ দিন করে এগিয়ে আসেন। এদিকে বাংলার কৃষক খাজনা দেবে কী করে? মাঠের ধান তখনো কাঁচা, পাকতে আরও দেরি। কিন্তু হিজরি ক্যালেন্ডার বলছে— 'খাজনা দাও!'

কৃষক পড়ে গেল মহাবিপদে। ধান না কাটলে টাকা আসবে কোত্থেকে? আবার সময়মতো খাজনা না দিলে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী এসে পিঠের চামড়া তুলে নেবে। সম্রাটের কানে খবর গেল— বাংলা মুলুকে ঘোরতর অশান্তি। কৃষি আর ক্যালেন্ডারের মধ্যে কোনো মিল নেই।

সম্রাট ডাকলেন তাঁর প্রিয় নবরত্নের একজনকে। নাম তাঁর আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী। মানুষটা অদ্ভূত। দিনরাত আকাশের তারা আর গণিত নিয়ে পড়ে থাকেন। সম্রাট বললেন, সিরাজী সাহেব, এমন কিছু একটা করুন যাতে আকাশের চাঁদ আর বাংলার ধান— এই দুইয়ের মধ্যে একটা সন্ধি হয়।

সিরাজী সাহেব মুচকি হাসলেন। তিনি জানতেন, কাজটা কঠিন। একদিকে হিজরির পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে সূর্যের হিসেবে ঋতুগুলোকে বেঁধে ফেলতে হবে। তিনি তখন পারস্যের সৌর পঞ্জিকা আর ভারতের প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে বসলেন। ঘচাঘচ খাতা কলম চলল।

তিনি দেখলেন, সূর্য যখন মেষ রাশিতে প্রবেশ করে, বাংলার প্রকৃতিতে তখন নতুন প্রাণের স্পন্দন জাগে। তিনি সেই সময়টাকেই ধরলেন বছরের শুরু হিসেবে।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের এক তপ্ত দুপুরে সিরাজী সাহেব সম্রাটকে গিয়ে বললেন, জাঁহাপনা, তৈরি হয়ে গেছে। এটার নাম দিলাম ফসলি সন। এখন থেকে কৃষক যখন ঘরে ধান তুলবে, ক্যালেন্ডারেও তখনই বছর ঘুরবে। কারো কোনো অভিযোগ থাকবে না।

আকবর অত্যন্ত খুশি হলেন। তবে মজার ব্যাপার কী জানেন? এই সন যখন চালু হলো, তখন হিজরি ছিল ৯৬৩। সম্রাট বললেন, নতুন সনের বয়স এক থেকে শুরু করার দরকার নেই, হিজরি যত— বাংলা সনের বয়সও তত থেকেই শুরু হোক।

ব্যস, সেই দিন থেকেই ৯৬৩ বছর বয়স নিয়ে জন্ম নিল আমাদের প্রিয় বঙ্গাব্দ। যে জন্মানোর আগেই ৯৬৩ বছরের বুড়ো!

বঙ্গাব্দ তো চালু হলো, কিন্তু উৎসবটা শুরু হলো কীভাবে? সেই গল্পটা আরও মজার।

মোগল আমলে চৈত্র মাসের শেষ দিনটাকে বলা হতো 'পুণ্যাহ'। দিনটা আদতে পুণ্য করার দিন কি না তা নিয়ে তর্ক হতে পারে, তবে কৃষকদের জন্য দিনটা ছিল রীতিমতো অগ্নিপরীক্ষা। সারা বছরের সব বকেয়া খাজনা ওই দিন শোধ করতে হতো। জমিদার বাড়িতে তখন সাজ সাজ রব। নায়েব মশাই বিশাল এক লাল রঙের খাতা নিয়ে বসেছেন। সেই খাতার নাম হালখাতা।

চারপাশে একটা থমথমে উত্তেজনা। গরিব কৃষক তার শেষ সম্বলটুকু নিয়ে জমিদারের সেরেস্তায় হাজির হচ্ছে। মনে ভয়— যদি সব শোধ না হয়? যদি জমিটা হাতছাড়া হয়ে যায়?

কিন্তু বৈশাখের প্রথম সকালে দৃশ্যপট এক নিমেষে বদলে যেত। সম্রাট আকবর এবং পরবর্তী সুবাদাররা একটা অদ্ভুত নিয়ম চালু করলেন। বছরের প্রথম দিন কেউ কাউকে কটু কথা বলবে না। চৈত্র সংক্রান্তিতে সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে ফেলার পর, পহেলা বৈশাখের সকালে জমিদাররা প্রজাদের আপ্যায়ন করতেন।

কী দিয়ে আপ্যায়ন? এক হাড়ি রসগোল্লা আর মুচমুচে জিলাপি!

ব্যাপারটা কল্পনা করুন— কাল যার ভয়ে কৃষকের বুক দুরুদুরু করছিল, আজ সেই নায়েব মশাই তাকে হাসিমুখে বরণ করে নিচ্ছেন। মাটির সানকিতে করে দেওয়া হচ্ছে বাতাসা আর মিষ্টি। গ্রামের দোকানিরা তাদের পুরনো হিসাবের খাতাটা লাল কাপড়ে মুড়ে সিন্দুকে তুলে রাখতেন। বের হতো ঝকঝকে নতুন খাতা। দোকানের সামনে টাঙানো হতো নতুন আমপাতা।

সেই সময় থেকেই একটা প্রবাদ চালু হলো— পুরনো যত গ্লানি, মুছে যাক। আসলে গ্লানি মোছার চেয়েও বড় ছিল মানুষের সাথে মানুষের সংযোগ। মুদি দোকানি থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী, সবাই এই দিনে কাস্টমারকে মিষ্টি খাওয়াতেন। যেন মিষ্টির রসে বছরের সব তিক্ততা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।

তবে পহেলা বৈশাখের আসল মজাটা ছিল গ্রামের মেলায়। নদীর ধারে বা বটতলায় বসত সেই মেলা। নাগরদোলা ঘুরছে, মাটির পুতুল বিক্রি হচ্ছে, আর বাতাসের গন্ধে মিশে আছে কদমা-বাতাসার ঘ্রাণ। বাড়ির ছোট ছেলেটা হয়তো তার বাবার কাছে বায়না ধরেছে একটা মাটির বাঁশির জন্য। বাবা পকেট হাতড়ে দেখছেন খাজনা দেওয়ার পর আর কয়টা আনা বাকি আছে।

হয়তো শেষ পর্যন্ত সেই মাটির বাঁশিটা কেনা হতো। ছেলেটা পরম আনন্দে বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে মেলা থেকে ফিরত। এই আনন্দটাই আসলে পহেলা বৈশাখ। এটা কেবল খাজনা আদায়ের দিন ছিল না, এটা ছিল সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার একটা অদ্ভুত সুন্দর অজুহাত।

ইতিহাসের ধুলোবালি ঝেড়ে আমরা এখন এসে দাঁড়িয়েছি বিংশ শতাব্দীতে। ঢাকার রমনার বটমূল। ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগেই একদল মানুষ শুভ্র বসনে গান ধরছে— এসো হে বৈশাখ। মোগল আমলের সেই খাজনা আদায়ের উৎসব এখন হয়ে উঠেছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের লড়াই।

কিন্তু একটা বড় খটকা আছে। পান্তা আর ইলিশ এল কোত্থেকে?

গ্রামের কৃষক পান্তা খেত অভাবের কারণে। রাতে বেঁচে যাওয়া ভাতে পানি দিয়ে রাখা হতো যেন পচে না যায়। সকালে সেই ঠান্ডা পান্তা খেয়ে তারা লাঙল কাঁধে মাঠে যেত। সেখানে ইলিশের কোনো বালাই ছিল না, ছিল হয়তো একটা পোড়া শুকনো মরিচ আর এক চিমটি লবণ।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার একদল শৌখিন মানুষ ভাবলেন, বৈশাখ উদযাপনে একটু 'গ্রাম্য ভাব' আনা দরকার। ১৯৮৩ সালে রমনার বটমূলে কয়েকজন বন্ধু মিলে শখ করে পান্তা আর ইলিশ ভাজা নিয়ে বসলেন। ব্যস! বাঙালি দেখল— আরে, এ তো চমৎকার আইডিয়া!

ধীরে ধীরে মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খাওয়াটা হয়ে গেল আভিজাত্যের প্রতীক। বৈশাখের সকালে সেই গরিবের খাবার এখন ডাইনিং টেবিলের মহার্ঘ্য বস্তু।
এরই মধ্যে ১৯৮৯ সালে শুরু হলো আরেক এলাহি কাণ্ড— মঙ্গল শোভাযাত্রা।

চারুকলার ছাত্ররা ভাবল, চারদিকে এত অশান্তি, চলো আমরা বিশাল বিশাল হাতি, ঘোড়া আর মুখোশ নিয়ে রাস্তায় নামি। অমঙ্গলকে তাড়াই। সেই যে শুরু হলো, তারপর থেকে বৈশাখ মানেই রঙের মেলা। ইউনেস্কো পর্যন্ত একদিন হাততালি দিয়ে বলে উঠল, সাবাস বাঙালি! তোমাদের এই উৎসব তো বিশ্বঐতিহ্য।

আজকের পহেলা বৈশাখ মানে লাল-সাদা শাড়ি, কপালে টিপ, আর চারদিকে মানুষের সমুদ্র। মুঘল সম্রাট আকবর কি কখনো ভেবেছিলেন তাঁর সেই খাজনা আদায়ের ফসলি সন একদিন বাঙালির প্রাণের মেলা হয়ে যাবে? আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী হয়তো জানতেন না তাঁর গণনা করা পঞ্জিকা একদিন কয়েক কোটি মানুষের ক্যালেন্ডারে জায়গা করে নেবে।

বৈশাখের তপ্ত দুপুরে যখন ধুলো ওড়ে, আর রমনার বটমূলে বাঁশির সুর বাজে, তখন মনে হয়— ইতিহাস আসলে কোনো মরা বইয়ের পাতা নয়। ইতিহাস হলো জ্যান্ত মানুষের বেঁচে থাকার আনন্দ।

পুরনো সব দুঃখ টুঃখ ভুলে গিয়ে একবার না হয় মন খুলে হাসুন। কারণ দিনশেষে বছরটা তো নতুন!

শুভ নববর্ষ!

৯২ পঠিত ... ০০:৫৩, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top