১.
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখটি ক্যালেন্ডারে খুব সাধারণ ভাবে এসেছিল। কিন্তু বিকেলের দিকে যখন নাতানজ আর ফোর্ডোর আকাশ চিরে প্রথম আগুনের গোল্লাগুলো নামতে শুরু করল, তখন বোঝা গেল দিনটি মোটেও সাধারণ নয়। তেহরানের মানুষ দেখল পশ্চিমের সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাজপাখি আর তার সঙ্গী নীল-সাদা ডানাওয়ালা চিল মিলে আকাশটাকে একদম ছেঁকে ধরেছে। নীল রঙের আকাশটা হুট করেই বারুদের গন্ধে ভারী আর তামাটে হয়ে গেল। শুরু হলো এক অসম আস্ফালন, যাকে সাহেবরা নাম দিল অপারেশন এপিক ফিউরি।
সেদিন নাতানজ আর ফোর্ডোর ইউরেনিয়াম সেন্ট্রিফিউজগুলো যখন ভেঙে চুরমার হচ্ছিল, তখন সেই বিটকেল আওয়াজ কি কেবল ইরানিরাই শুনেছিল? বোধহয় না। সেই শব্দের কম্পন গিয়ে ঠেকল সুদূর ওয়াশিংটন আর জেরুজালেমের অন্দরমহলে। প্রায় ৯০০টি অব্যর্থ নিশানার স্ট্রাইক যখন পারস্যের সামরিক ঘাঁটি আর নেতৃত্বকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছিল, তখন মনে হয়েছিল ক্ষমতার দাপট বুঝি এমনই—এক তুড়িতে সব শেষ করে দেওয়া যায়। খামেনেই সাহেবসহ শীর্ষ কর্তারা যখন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেলেন, তখন সারা দুনিয়া ভাবল, পারস্যের সেই অবাধ্য সিংহ বুঝি এবার চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু মানুষের হিসাব আর প্রকৃতির হিসাব কি সবসময় মেলে? পারস্যের সেই সিংহ ক্ষতবিক্ষত হলো ঠিকই, তার কেশর ছিঁড়ল, রক্তে রঞ্জিত হলো মরুভূমির বালি। কিন্তু মরার আগে সে এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। সে থাবা দিয়ে আটকে দিল হরমুজ প্রণালীর সেই সরু মুখটি, যেখান দিয়ে দুনিয়ার তাবৎ তেলের জাহাজ যাতায়াত করে। আর অমনি দেখা গেল এক জাদুকরী দৃশ্য। তেহরানে বোমা পড়লে কী হবে, তার আঁচ গিয়ে লাগল দুনিয়ার সব মানুষের রান্নাঘরে। ব্যারেল প্রতি তেলের দাম যখন লাফিয়ে লাফিয়ে ১২৬ ডলারে উঠল, তখন বোঝা গেল আধুনিক যুদ্ধ কেবল গোলবারুদ দিয়ে হয় না, তা পেটের ক্ষুধা আর পকেটের টান দিয়েও হয়। আমেরিকা ১৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করে আকাশ জয় করল ঠিকই, কিন্তু মাটির নিচের তেলের চাবিটা রয়ে গেল সেই রক্তাক্ত সিংহের মুঠোতেই। শুরু হলো এক দীর্ঘশ্বাসের লড়াই, যেখানে কারোরই পুরো জেতার উপায় নেই, অথচ হারার ভয়টা সবার সমান।
২.
দুনিয়াটা বড় অদ্ভুত জায়গা। এখানে কেউ যখন জেতে, তখন সে আসলে কতটা জিতেছে তা বোঝা যায় অনেক পরে। আমেরিকা আর ইসরায়েলের সাহেবরা যখন দেখল ইরানের পরমাণু চুল্লিগুলো এখন কেবল পোড়া লোহার স্তূপ, আর তাদের শীর্ষ কমান্ড বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই—তখন হোয়াইট হাউসে নিশ্চয়ই দামী কফি আর জয়ের হাসির বন্যা বয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্প সাহেব বুক ফুলিয়ে বললেন, দেখলে তো, এক ধমকেই কাজ হয়েছে!
ইসরায়েলও ভাবল, আপদ বিদায় হয়েছে, এবার অন্তত কয়েক বছর নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে। হিজবুল্লাহর সেই ভয়ংকর গর্জনও তখন বেশ মিইয়ে এসেছে। একেই বলে ট্যাকটিক্যাল ভিক্টরি—অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে আপনি দাপুটে জয় পেয়েছেন।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই জয়ের আনন্দটা ঠিক কতক্ষণ টিকল? আমেরিকা যখন দেখল তাদের পকেট থেকে মাত্র ১২ দিনে সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে গেছে, আর তাদের তেলের পাম্পগুলোতে মানুষের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, তখন হাসিটা একটু ফিকে হয়ে এল। সাহেবরা ভুলে গিয়েছিল যে, দুনিয়াটা এখন একটা সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই সুতোটা হলো তেল। তেলের দাম যখন আকাশ ছুঁল, তখন খোদ আমেরিকার সাধারণ মানুষই তাদের নেতার দিকে আঙুল তুলে বলতে শুরু করল, আমাদের শান্তি চাই না, সস্তা তেল দাও!
১৫ জন আমেরিকান সেনার কফিন যখন ফিরে এল, তখন বোঝা গেল কোনো জয়ই আসলে রক্তপাতহীন নয়। তারা ইরানকে বছর তিনেক পিছিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজেরাও এক বিশাল অর্থনৈতিক গর্তে পা দিয়েছে। আপনি সাপের মাথা থেঁতলে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু লেজের ঝাপটায় নিজের ঘরের আসবাবপত্র সব ভেঙে চুরমার করে ফেলেছেন।
৩.
মরুভূমির সেই সিংহের শরীর এখন ক্ষতবিক্ষত। হাজার হাজার মানুষের রক্তে পারস্যের ধূলিকণা কাদা হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি নেই, পরমাণু স্বপ্নগুলো ধুলোয় মিশে গেছে আর অর্থনীতির অবস্থা সেই তালি দেওয়া কাঁথার মতো—যা দিয়ে শীত তো দূরের কথা, লজ্জা নিবারণ করাই দায়। সাধারণ মানুষেরা যখন একেকটি লাশের পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে, তখন বাইরের দুনিয়া দেখেছে কেবল হাজার হাজার সংখ্যার মৃত্যু। ইরানের জন্য এই ক্ষতি অপূরণীয়। তারা সামরিকভাবে পঙ্গু হয়েছে, বছরের পর বছর পিছিয়ে গেছে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে। একেই বলে সামরিক বিপর্যয়।
কিন্তু এই গল্পের শেষটা বড় বিচিত্র। সব হারিয়েও ইরান যখন আলোচনার টেবিলে বসল, তখন দেখা গেল তাদের চোখে কোনো পরাজয়ের গ্লানি নেই। তারা বুক ফুলিয়ে বলছে, আমরা তো টিকে গেছি!
খামেনেই সাহেব নেই তো কী হয়েছে, নতুন নেতৃত্ব ঠিকই রাতারাতি দাঁড়িয়ে গেছে। তারা দুনিয়াকে দেখিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালীর চাবি দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি টিপে ধরতে পারে। এখন তারা যখন পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আলোচনার টেবিলে বসবে, তখন তাদের হাতে তাসের অভাব নেই। তারা বলবে, আমাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নাও, তবেই দুনিয়া সস্তায় তেল পাবে।
দিনশেষে এই যুদ্ধের ফলাফল কী দাঁড়াল? বড় বড় গোল্লা। আমেরিকা-ইসরায়েল জিতেছে বলে আনন্দ করছে, অথচ তাদের পকেট ফাঁকা। ইরান হেরেছে বলে শোক করছে, অথচ তাদের রাজনীতির ভিত আবার শক্ত হয়েছে। মাঝখান থেকে লাভ হলো কার? ওই যে তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়া আর সৌদির পকেটে কিছু বাড়তি কাঞ্চন ঢুকল। সাধারণ মানুষ যেমন আগে মারা পড়ত, এবারও তাই হলো। জয়ী আসলে কেউ নয়। এই যুদ্ধবিরতি যেন এক পশলা বৃষ্টির পর রোদের দেখা পাওয়া—সবাই একটু জিরিয়ে নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আকাশের কোণে মেঘের ঘনঘটা এখনো কাটেনি। পৃথিবীটা আবার সেই পুরনো নিয়মে চলতে শুরু করল, যেন কিছুই হয়নি। কেবল কিছু শূন্য কোল আর কিছু ভাঙা ঘর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইল।
গল্পটা এখানেই শেষ। পৃথিবীটা এখন কেবলই একটি ভাঙা চেরাগ, যা কেউ ঘষলেই আগুন বের হয়, কিন্তু শান্তি আর আসে না।



পাঠকের মন্তব্য