আজ কি তেলের কোনো ঝামেলা হলো? মাদারীপুর থেকে ঢাকা যাওয়ার জন্য ঠাঁয় দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করছি, কিন্তু বাসের দেখা নেই। আমার সামনে বিশাল এক মনুষ্যপাল অপেক্ষমাণ। চাতকের ন্যায় মাথা ৩০ ডিগ্রি এগিয়ে একটু পরপর দেখছে, গাড়ি আসছে কি না। পরিস্থিতি যা, গাড়ি আসলে যদিও কোনোভাবে লটকে উঠে যেতে পারি, কিন্তু বসার আশা করা কল্পনাতীত।
হঠাৎ যাত্রীদের মাঝে ছুটোছুটি শুরু হলো—গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। ধাক্কাধাক্কির কুফল থেকে সাপে বর পেয়ে দেখি আমি বাসে উঠে গিয়েছি! মনে মনে নিজেকে ধন্য ধন্য করতে করতে দেখি, একদম সামনে এক বিঘতের মতো একটা আড়াআড়ি সিট খালি। চেষ্টা করতেই ওই চিপায় ঢুকে বসে পড়লাম। মনে মনে শাপ-শাপান্ত করলাম তাদের, যারা আমায় ‘মুটকি’ বলে মিচকা হাসত। মোবাইলটা বের করে একটা সেলফি নেওয়ার ইচ্ছা দমন করলাম বাসের পরিস্থিতি বিবেচনায়; মানুষ হয়তো ভাববে, এ নিশ্চয়ই টিকটকার—নইলে এমন সময়ে কেউ সেলফি তোলে!
আমার সিটের পাশে এক মহিলা তার আট-নয় বছরের ছেলেকে নিয়ে বসেছেন। ছেলেটার জুতো কয়েকবার আমার গায়ে লাগল। পিচ্চির মাকে বললাম পা-টা সরিয়ে দিতে, তিনি দিলেনও। কিন্তু এরপর আরও কয়েকবার পা লাগল। খেয়াল করে দেখলাম, পিচ্চি সচেতনভাবেই কাজটা করছে। এবার আর ওর মাকে ডাকলাম না। আমার চেহারা দেখে কেউ কোনোদিন সামনাসামনি প্রোপোজ করেনি, কেউ অ্যাকসেপ্টও করেনি। একবার ভাবলাম, মাস্ক খুলে চেহারাটা দেখাব কি না; থাক, ছোট মানুষ, ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। তাই একটু চোখ বড় করে তাকালাম—মনে হয় কাজ হয়ে যাবে। ঠিকই, পিচ্চি আর পা তুলল না।
যাত্রাবাড়ী নেমে কাজ সেরে আবার বাসে উঠলাম ফিরে যাওয়ার জন্য। টিকিট কেটে উঠে দেখি, বাস খাঁ খাঁ করছে—যাত্রী নেই বললেই চলে। টাকা ফেরত চাইব কি না ভাবছি, এমন সময় কন্ডাকটর বলল, দশ মিনিট! মাত্র দশ মিনিট! আচ্ছা, দশ মিনিট তো এমনিতেই রাস্তায় কত দাঁড়িয়ে থাকি। প্রায় বিশ মিনিটের মাথায় এক মুরুব্বি উঠে আমার পাশে বসলেন। আরেক কন্ডাকটর দেখলাম খুব যত্ন করে মুরুব্বিকে বলছে, আপনে কোন সিটটা চান? আপনাকে সেটাই দেব। এই যে সামনের সিট না? এটাই আপনার, যান। আর কিছু বলবেন না, টাকাটা দেন।
ভাবলাম, আহা! মুরুব্বি মনে হয় পরিচিত কেউ—কী প্রিমিয়াম সার্ভিস! হয়তো ভাড়াও কম রাখছে। হঠাৎ আরেক কন্ডাকটর হাজির, এবং দুইজনের মাঝে তুমুল ঝগড়া শুরু হলো। মুরুব্বির কাছ থেকে ১০০ টাকা ভাড়া বেশি নেওয়া হয়েছে। মুরুব্বি আমার পানে তাকালেন; একটা পজ—মনে হয় রিয়্যাকশন চাইছেন। আমি চোখ দিয়ে ‘বিস্মিত হয়েছি’ লুক দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কাছাকাছি আয়না থাকলে একবার দেখে নেওয়া যেত, এক্সপ্রেশনটা ঠিকমতো হলো কি না!
মুরুব্বি কাকা এবার নিজের পায়ে দাঁড়ালেন। কন্ডাকটরকে ডাকছেন, কিন্তু সে নিচে নেমে গেছে। কাকাও নিচে নামলেন। জানালা দিয়ে দেখলাম, ওনার কাছ থেকে নেওয়া বাড়তি ১০০ টাকা তিনি ফেরত নিয়ে এসেছেন। কাকা এসে সিটে বসে আবার একটা লুক দিলেন, সঙ্গে ভয়েস: দেখেছেন? আমায় কীভাবে ঠকাচ্ছিল? সব দালাল!” ম্যাচিউরড মেয়ে হিসেবে আমাকে তো কিছু একটা বলতেই হয়; আমি মাথা দুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কত দিয়েছিলেন?
— ৫০০! আমি খুলনা যাব। আপনি আমাকে হেল্প করবেন।
— কিন্তু আমি তো মাঝপথে নেমে যাব।
— যতক্ষণ থাকবেন ততক্ষণ আর কী। এই নেন, এটা আমার কার্ড, রাখেন।
— কিন্তু কাকা...
— রাখেন, রাখেন।
প্রায় চল্লিশ মিনিট হতে চলল, কিন্তু ‘দশ মিনিট’ আর শেষ হচ্ছে না। কাকা পানি আনতে টাকা দিলেন সুপারভাইজারকে। পানির বোতল খুলতে গিয়ে কাকা চিৎকার দিলেন—এই? এদিকে আসেন!
সুপারভাইজার বললেন, কী হয়েছে?
— এটা খোলা পানি!
সুপারভাইজার নির্বিকারভাবে বললেন, আসলে আমাদের কন্ডাকটর বোতলটা আনার সময় নিজে খুলে এক ঢোক পানি খাইছে।
কাকা মাইক্রোসেকেন্ডে আমার দিকে তাকালেন। চাপা হাসি কন্ট্রোল করতে না পেরে আমি মুখ ঘুরিয়ে আকাশ দেখতে লাগলাম। কাকার গগনবিদারী স্বগতোক্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে: ভুল করেছি, আমি এই গাড়িতে উঠেই ভুল করেছি, আমি বিশ্বাস করেছি, আর বিশ্বাস করেই ঠকেছি!
সর্বশেষ এই ডায়ালগ শুনেছিলাম একটা টিকটক রিলে—মন চাইল রিলটা আবার খুলে একবার শুনে নিই!



পাঠকের মন্তব্য