১.
রাইত তখন কয়টা হইবো? দুইটা কি তিনটা। পুরা ঢাকা শহর থিকা মাইনষের ঢল নামছে বুড়িগঙ্গার ওইপারে। কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, কালিন্দী আর শুভাড্যা—মাইনষে মাইনষে সয়লাব। কাউর হাতে একটা পোঁটলা, কেউ কোলে নিয়া ছোট বাচ্চাটারে চাপ দিয়া ধইরা আছে যেন কান্দন না আসে। ২৫শে মার্চের হেই কালরাইতের পর থিকা ঢাকা এখন শ্মশান। যে যেমনে পারছে, জান নিয়া নদী পার হইয়া ওপারে আইসা হাঁপ ছাড়ছে। ভাবছে, ওইপারে তো মিলিটারি নাই, ওইখানে যমদূত নাই।
আহমদ সাহেব বারান্দায় বইসা একটা বিড়ি ধরাইছেন। উনার বউ রেনু বেগম ঘরের কোণায় তসবি টিপতাছেন। রেনুর মুখটা শুকনা, চুনকাম করা দেয়ালের মতো সাদা। আহমদ সাহেব নিচু গলায় কইলেন, আরে ডরাও ক্যান? এইখানে তো আর মিলিটারি আইবো না। নদী পার হইয়া আসা তো আর সোজা কাম না।
রেনু বেগম উত্তর দিলেন না। উনার মনে কু ডাকতাছে। অন্ধকার রাইতে নদীর পানি ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করতাছে, ওই শব্দটা উনার কাছে মনে হইতাছে কার যেন ফিসফাস। আকাশে একফালি চাঁদ, কিন্তু সেই চাঁদের আলোয় কোনো মায়া নাই, খালি একটা ঠান্ডা ভয়।
হঠাৎ কইরা ১লা এপ্রিলের হেই গুমোট রাইত শ্যাষ হইয়া যখন ২রা এপ্রিলের ভোর হইবো হইবো করতাছে, ঠিক তখন মিটফোর্ড হাসপাতালের ওইদিক দিয়া একটা আগুনের গোলা আকাশে উঠলো। ফ্লেয়ার গান! নীলচে সাদা আলোয় পুরা আকাশটা একবার জুইলা উইঠা আবার আন্ধার হইয়া গেল।
আহমদ সাহেব বিড়িটা ফালায়া দিয়া খাড়া হইলেন। বুকটা ধড়ফড় করতাছে। কিছু বুঝনের আগেই নদীর দিক থিকা বিকট শব্দ—গুড়ুম! গুড়ুম! গোলার আওয়াজ। তারপর শুরু হইলো মরণ-খেলা। গানবোট থিকা মিলিটারিরা নামতাছে। পিলপিল কইরা নামতাছে। যমদূতরা আইসা পড়ছে।
জিনজিরা বাজারে তখন গানপাউডার ছিটাইয়া আগুন লাগায়া দিছে তারা। দাউদাউ কইরা আগুন জ্বলতাছে। আগুনের লগে মিশা যাইতেছে মাইনষের চিৎকার। সেই চিৎকার কোনো মানুষের গলার শব্দ না, মনে হইতাছে যেন কলিজা ছিঁড়া কেউ আকাশরে ডাকতাছে।
আহমদ সাহেব রেনুর হাত ধইরা কইলেন, রেনু, চলো! পালান লাগবো!
কিন্তু পালাইবো কই? চারদিকে কাঁটাতার আর বাঁশের বেড়া দিয়া ঘিরা ফেলছে মিলিটারিরা। তারা আগে থিকাই ছক কষছে—আইজ কাউরে জ্যান্ত ছাড়বো না। ভোরের আলো ফুটনের আগেই রক্তের লাল রঙে বুড়িগঙ্গার পাড় রঙিন হয়া উঠতে লাগলো। মাইনষের স্বপ্ন, ঢাকা থিকা ভাইগা আসা একটুখানি শান্তি—সব এক নিমেষে ছাই হয়া গেল।
২.
ভোর হইছে ঠিকই, কিন্তু সেই ভোরে কোনো পাখি ডাকে নাই। ডাকছে খালি স্টেনগান আর থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। আহমদ সাহেব রেনুর হাত ধইরা দৌঁড়াইতেছিলেন মান্দাইল রোডের দিকে। পিছে তাকাওনের সাহস নাই, তাকালেই দেখা যায় আগুনের কুণ্ডলী। ঘরবাড়ি সব পুইড়া ছাই হইয়া দিতাছে। মানুষ দিক-বিদিক জ্ঞান হারায়া দৌঁড়াইতাছে, কিন্তু লুকাইবো কই? যমদূতরা তো যমের মতো চারদিকে ঘেরাও দিয়া দাঁড়াইয়া আছে।
হঠাৎ সামনে দেখ্লেন একদল মিলিটারিরে। আহমদ সাহেব রেনুরে নিয়া একটা ঝোপের চিপায় বইসা পড়লেন। নিশ্বাস বন্ধ কইরা দুইজনে পইড়া রইছেন। একটু দূরেই পুকুরপাড়। মিলিটারিরা চিৎকার কইরা কইতাছে, ইধার আও! সাব ইধার আও!
মাইনষেরে লাইন ধরাইয়া দাঁড় করানো হইতাছে। আহমদ সাহেব দেখলেন, উনাদেরই পরিচিত কলিমুদ্দিন কাকা, উনার পোলাপান—সবগুলারে এক সারিতে দাঁড় করাইছে। এক মিলিটারী অফিসার পান চিবাইতে চিবাইতে কী যেন একটা ইশারা করলো। আর অমনি—তাতাতাতাতা! ব্রাশফায়ার।
এক সেকেন্ডে সব শ্যাষ। কলিমুদ্দিন কাকা কোনো শব্দ করার সুযোগও পাইলেন না, সটান পুকুরে গিয়া পড়লেন। পুকুরের পানি ঘোলা ছিল, এক নিমিষেই সেই পানি টকটকা লাল হইয়া গেল। আহমদ সাহেব রেনুর মুখটা নিজের হাতের তালু দিয়া চাইপা ধইরা রাখছেন, রেনু যেন চিৎকার দিয়া না ওঠে। রেনুর চোখ দিয়া দরদর কইরা পানি পড়তাছে, কিন্তু শব্দ নাই। শব্দ করলেই মরণ।
একটু দূরেই একটা আর্তনাদ শোনা গেল। কালিন্দীর এক বাড়িতে কিছু মেয়েছেলে লুকাইয়া ছিল। মিলিটারিরা দরজা ভাইঙ্গা ভিতরে ঢুকলো। তারপর যা হইলো, সেইটা কোনো মানুষ সহ্য করতে পারবো না। আকাশ-বাতাস ভাইরা গেল কান্দনের শব্দে। আহমদ সাহেব মনে মনে ভাবতাছেন, ভগবান কি ঘুমায়ে গেছেন? এই মাসুম মানুষগুলার ওপর এই জুলুম কি কেউ থামাইবো না?
মিলিটারিরা পাড়ায় পাড়ায় গানপাউডার ছিটাইয়া দিতাছে। একটা জলজ্যান্ত এলাকা চোখের সামনে নরক হইয়া গেল। কেউ পুকুরে নাইমা নাক ডুবাইয়া পইড়া আছে, কেউ ধানের ক্ষেতের ভিতর কাদা মাখায়া পইড়া রইছে জ্যান্ত লাশের মতো। দুপুর হইয়া আসছে, রোদটা কড়া হইয়া উঠতেছে, কিন্তু মানুষের গায়ের রক্তে ভেজা মাটি আর শুকাইতাছে না। মাটি যেন সব রক্ত শুষে নিতে নিতে ক্লান্ত হইয়া গেছে।
আহমদ সাহেবের কপালে ঘাম জমছে। উনার হাত থরথর কইরা কাঁপতাছে। রেনু বিড়বিড় কইরা কী যেন বলতাছে, হয়তো কোনো দোয়াকলাম। হঠাৎ ঝোপের ঠিক ওপারেই ভারী বুটের আওয়াজ শোনা গেল। মচমচ কইরা শুকনা পাতা মাড়াইয়া যমদূতরা আগাইয়া আসতাছে।
৩.
ভারী বুটের আওয়াজটা একদম কানের কাছে চইলা আইছে। আহমদ সাহেব রেনুর হাতটা এমন জোরে ধইরা রাখছেন যে উনার নিজের আঙুল নীল হয়া গেছে। ঝোপের ওপারে খাড়ায়ে থাকা মিলিটারী লোকটা পকেট থিকা একটা বিড়ি বাইর করলো। দিয়াশলাইয়ের কাঠির খসখস শব্দটা এই নিঝুম দুপুরে বজ্রপাতের মতো শোনাইলো। আহমদ সাহেব চোখ বন্ধ কইরা ফেললেন। মনে মনে ভাবলেন—আইজ বুঝি সব শ্যাষ। কিন্তু আজব বিষয়, লোকটা বিড়ি ধরাইয়া থুতু ফালাইয়া উল্টা দিকে হাঁটা ধরলো। যমদূত আইসা চইলা গেল, অথচ টেরও পাইলো না দুইটা জ্যান্ত প্রাণ তার পায়ের তলে পইড়া আছে।
দুপুর গড়ায়ে যখন আড়াইটা-তিনটা বাজে, তখন গোলাগুলির আওয়াজ হঠাৎ কইরা থাইমা গেল। চারিদিকের বাতাসে কেবল পোড়া মাংসের গন্ধ আর মানুষের গুমরে কাঁদার শব্দ। মিলিটারিরা গানবোটে কইরা আবার নদীর ওপারে ফিইরা যাইতেছে—যেন একটা বড় কাম শেষ কইরা তারা দুপুরের ভাত খাইতে চলল।
আহমদ সাহেব রেনুরে নিয়া আস্তে কইরা ঝোপ থিকা বাইর হইলেন। যা দেখলেন, সেই দৃশ্য দেখার জন্য কোনো মানুষ আগে থিকা প্রস্তুত থাকে না। মাঠের পর মাঠ কেবল লাশ আর লাশ। মনু মিয়ার ঢালে শয়ে শয়ে মানুষ পইড়া আছে। কেউ কারো বাপরে খুজতাছে, কেউ তার ছোট কোলের বাচ্চাটারে ডাইকা ডাইকা পাগল হয়া যাইতাছে। পুকুরের পানিতে লাশের সারি ভাইসা আছে, যেন শাপলা ফুলের মতো ফুটে রইছে রক্তমাখা দেহগুলা।
রেনু বেগম থরথর কইরা কাঁপতে কাঁপতে একটা পোড়া ঘরের সামনে গিয়া বইসা পড়লেন। উনার আর কথা বলার শক্তি নাই। কবি নির্মলেন্দু গুণের মতো হাজারো মানুষ দেখলো, কেমনে একটা সাজানো এলাকা শ্মশান হয়া যায়। কেউ দেখলো দৌড়ানি দেওয়া মানুষের কল্লা গোলার আঘাতে উইড়া গেছে, কিন্তু দেহটা আরো দুই কদম আগাইয়া গিয়া ধপাস কইরা পড়লো।
পরদিন রেডিও-টেলিভিশনে খুব গালভরা বুলি ছাড়লো পাকিস্তানিরা—দষ্কৃতিকারীদের খতম করা হইছে। আহা রে! এই মাসুম মানুষগুলা নাকি দষ্কৃতিকারী! আহমদ সাহেব একটা লম্বা নিশ্বাস ফালাইলেন। উনার বুকটা খালি খালি লাগতাছে। জিনজিরা, কালিন্দী আর শুভাড্যা—এই তিনটা ইউনিয়ন আইজ শুধু রক্তে ভিজা মাটি না, এইটা একটা ইতিহাস হয়া রইলো।
হাজার হাজার প্রাণ গেল, বুড়িগঙ্গার পানি লাল হইলো, কিন্তু এই মাটির মানুষেরা শেষ পর্যন্ত মাথা নোয়াইলো না। জিনজিরার এই ধূলিকণায় আইজও হয়তো সেইসব শহীদদের দীর্ঘশ্বাস মিশা আছে। যারা মুক্তির স্বপ্ন নিয়া ওপারে গেছিল, কিন্তু ফিরলো লাশ হয়া। আমরা হয়তো ভুলি নাই, কিন্তু সময় সব কিছু কেমন জানি ঝাপসা কইরা দেয়। শুধু এই ২রা এপ্রিল আইলে জিনজিরার আকাশ-বাতাস যেন আবার সেই পুরনো ব্যথায় কাইন্দা ওঠে।



পাঠকের মন্তব্য