একাত্তরে হয়তো আপনার পরিবারে কেউ মারা যায় নাই, কিন্তু...

১৩৮ পঠিত ... ১৬:৩৪, মার্চ ২৫, ২০২৬

একাত্তরে হয়তো আপনার পরিবারে কেউ মারা যায়নি, কিন্তু ডক্টর দীগেন্ত চন্দ্রের পরিবারের আটজন মারা গিয়েছিলেন।
আপনার জানা মতে ১৯৭১ সালে আপনার গ্রামে হয়তো কেউ মারা যায়নি, কিন্তু ভদ্রা নদীর পাড়ের চুকনগরে এক ঘন্টার মধ্যে পনেরো হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
আপনি আপনার শহরে কোন বধ্যভূমি দেখেননি, কিন্তু এক চট্টগ্রাম শহরে ১১৬টা চিহ্নিত বধ্যভূমি আছে।
সেই চট্টগ্রামের ১১৬ বধ্যভূমির একটি বধ্যভূমি হলো পাহাড়তলী বধ্যভূমি। যার কেবল একটি গর্ত থেকে ১,১০০টি মাথার খুলি পাওয়া গিয়েছিল, আর সেই একটি বধ্যভূমিতে এরকম প্রায় একশ গর্ত ছিল।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশনের হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে এখন পর্যন্ত বধ্যভূমি আবিষ্কার হয়েছে ৯৪২টি। এদিকে গণহত্যা, নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র সারা দেশের মাত্র ৩০টি জেলায় গণহত্যার স্পট, বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতন কেন্দ্রের খোঁজ পেয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি।

১৯৭১ সালের গণহত্যার কথা বলছি। একাত্তরে তিরিশ লক্ষ শহিদের প্রমাণ আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নিয়ে চলছি। এটা হাওয়ায় হাওয়ায় চেতনার কথা নয়। এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু আমাদের পপুলেশন গ্রোথ রেটে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। একাত্তরের জনঘাটতির প্রভাব এখনো বাংলাদেশে কাটতে পারেনি।

বাংলাদেশের পপুলেশন গ্রোথ রেটে, অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে লক্ষ্য করলে দেখা যায়:

  • ১৯৫০-১৯৫৫ সালে: ১৪.৬
  • ১৯৫৫-১৯৬০ সালে: ১৫.৩
  • ১৯৬০-১৯৬৫ সালে: ১৫.৩
  • ১৯৬৫-১৯৭০ সালে: ১৫.৭
  • ১৯৭০-১৯৭৫ সালে: ৫.৩ *
  • ১৯৭৫-১৯৮০ সালে: ১৪.২
  • ১৯৮০-১৯৮৫ সালে: ১৪.৫
  • ১৯৮৫-১৯৯০ সালে: ১৪.১

১৯৬৫-১৯৭০ সালে গ্রোথ-রেট ১৫-এর উপরে থাকা একটি দেশের পপুলেশন গ্রোথ রেট হঠাৎ ১৯৭০-১৯৭৫ সালে ৫.৩ হয়ে গেছে! আরেকটু লক্ষ্য করলে দেখবেন ১৯৬৫ সালে আমাদের পপুলেশন গ্রোথ রেট যে ১৫.৭% ছিল, সেটা আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি। অর্থাৎ, তিরিশ লক্ষ শহিদ বেঁচে থাকলে তাদের যে বংশধরদের জন্ম হতো, সেটা তিন প্রজন্ম পরে প্রায় এক কোটি হতো, এবং এই এক কোটি মানুষের ঘাটতি আমাদের পপুলেশন ডাটায় স্পষ্ট।

প্রশ্ন আসতে পারে, এখন তো মানুষের জন্মহার কমে গেছে। ফলে এই ১৫.৭% জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়তো হতো না। কিন্তু এই দাবি নিশ্চয়ই আপনি করবেন না যে ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সালের গ্রোথ রেট কেবল বাচ্চা না নেওয়ার প্রবণতার কারণে ১৫.৭% থেকে ৫.৩%-এ নেমে এসে আবার ১৪.২%-এ উঠে যাবে।

৭১ থেকে ৭৫ সালের ভেতরে আমাদের দেশ বেশ কয়েকটি বড় দুর্যোগের মধ্য দিয়ে গেছে:
১) ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়
২) ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ
৩) যুদ্ধের পর ভারতে থেকে যাওয়া শরণার্থী
৪) রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড
৫) মুক্তিযুদ্ধ

আমাদের দেশের মানুষ যেভাবে শহিদের লিস্ট দাবি করে, পৃথিবীতে এমন কোনো যুদ্ধ কি হয়েছে যেখানে শহিদের লিস্ট করা হয়েছে? পৃথিবীর কোন যুদ্ধে কখনো শহিদের নামের তালিকা তৈরি করা যায় না।

মুক্তিযুদ্ধে যে তিরিশ লক্ষাধিক মানুষ শহিদ হয়েছে, এটা প্রমাণিত সত্য। এই সত্য নিয়ে আমরা চলি। কেউ ভুল বললেই যেমন নিউটনের সূত্র ভুল হয় না, ঠিক তেমনি কেউ ‘বিতর্ক আছে’ বললেও তিরিশ লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগ ম্লান হয় না।

একাত্তরের মাঝামাঝি সময় থেকেই মিলিয়নের উপর মানুষের হত্যাকাণ্ডের কথা বিভিন্ন মিডিয়ায় আসতে থাকে। মাওলানা ভাসানী একাত্তরের মে মাসে দশ লক্ষ মানুষ হত্যাকাণ্ডের কথা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর খালেদ মোশাররফ কানাডার গ্রানাডা টিভিকে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ইতিমধ্যে দশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।”

কবি আসাদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় লিখেছেন ‘বারবারা বিডলারকে’, সেখানে তিনি লিখছেন:
‘তোমাদের কাগজে নিশ্চয়ই
ইয়াহিয়া খাঁর ছবি ছাপা হয়—
বিবেকের বোতামগুলো খুলে হৃদয় দিয়ে দেখো;
ওটা একটা জল্লাদের ছবি।
পনেরোলক্ষ নিরস্ত্র লোককে ঠাণ্ডা মাথায় সে হত্যা করেছে…’

যুদ্ধের সময় শহিদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছিল। বিদেশি কিছু পত্রিকা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শহিদের সংখ্যা নিয়ে লিখেছে:
১) Times, ৭ এপ্রিল: নিহতের সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়েছে এবং বাড়ছে
২) Newsweek, ২৮ এপ্রিল: নিহত ৭ লাখ
৩) The Baltimore Sun, ১৪ মে: ৫ লাখ
৪) The Momento, Caracas, ১৩ জুন: ৫–১০ লাখ
৫) Kairan International, ২৮ জুলাই: ৫ লাখ
৬) Wall Street Journal, ২৩ জুলাই: প্রায় ১০ লাখ
৭) Times, সেপ্টেম্বর: প্রায় ১০ লাখ
৮) The Hampstead and Highgate Express, ১ অক্টোবর ১৯৭১: শহিদের সংখ্যা ২০ লাখ

এসব ফিগার যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের। ডিসেম্বরের আগে পূর্ণ খবর পাওয়া অসম্ভব ছিল।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর ও ১৯৭২ সালের জানুয়ারির পত্রিকায় (বঙ্গবন্ধু দেশে আসার আগে) প্রকাশিত তথ্যও একই কথা বলছে। যেমন:

  • ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: তিরিশ লক্ষ শহিদের কথা বলা হয়।
  • ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১, দৈনিক পূর্বদেশ: ‘ইয়াহইয়া জান্তার ফাঁসি দাও’, প্রকাশিত প্রবন্ধে লেখা: ‘বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখ নিরীহ মানুষ ও দু’শতাধিক বুদ্ধিজীবিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’
  • ৩ জানুয়ারি ১৯৭২, প্রাভদা (রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র) লিখেছে ৩০ লক্ষ শহিদের বিষয়টি।
  • ৪ জানুয়ারি ১৯৭২, Morning News: “Over 30 lakh persons were killed throughout Bangladesh by the Pakistani occupation forces during the last nine months.”
  • ৫ জানুয়ারি ১৯৭২, দৈনিক অবজারভার: “Pak Army killed over 30 Lakh people.”
  • ৬ জানুয়ারি ১৯৭২, দৈনিক বাংলা: ‘জল্লাদের বিচার করতে হবে’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধ।

তথ্য প্রমাণ স্পষ্ট যে, তিরিশ লক্ষ শহিদ কোনো স্বপ্ন বা ভুল উচ্চারণের ফল নয়, বরং বাস্তবসম্মত পরিসংখ্যান।

আন্তর্জাতিক গবেষণা, থিসিস, এনসাইক্লোপিডিয়া, ডিকশনারিও এ তথ্য নিশ্চিত করে। যেমন:
১) Encyclopedia Americana (২০০৩): বাংলাদেশ অধ্যায়ে ১৯৭১ সালে মৃত মানুষের সংখ্যা তিরিশ লক্ষ উল্লেখ।
২) Samantha Power, “A Problem from Hell: America and the Age of Genocide”: ১৯৭১ সালে শহিদের সংখ্যা ৩০ লক্ষ উল্লেখ।
৩) Guinness Book of World Records: বাংলাদেশের গণহত্যা ২০শ শতকের শীর্ষ ৫টির মধ্যে।
৪) লিও কুপার, “Genocide”: ১৯৭১ সালের বাংলাদেশী নিহত ৩০ লক্ষ উল্লেখ।
৫) Dr. Ted Robert Gurr ও Dr. Barbara Harff, “Towards Empirical Theory of Genocides and Politicides”: ১২,৫০,০০০–৩০,০০,০০০ নিহত।
৬) Dr. Rudolf Joseph Rummel, “Statistics of Democide”: সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ৩০,০৩,০০০ নিহত।

মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা তিরিশ লাখ হলে, তৎকালীন মোট জনগোষ্ঠীর ৪% শহিদ হতে হয়েছে। একাত্তরে পাঁচজনের পরিবার ধরে হিসাব করলে, সংখ্যাটি ০.১৬। অনেকেই বলে, “আমার পরিবারে তো কেউ শহিদ হয়নি।” তারা ভুলে যাচ্ছেন, এখন সালটা ১৯৭১ নয়, ২০১৫, একাত্তরের দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্ম আপনি। একাত্তরে বিশটি পরিবারের মধ্যে একজন শহিদ খুঁজে পাওয়া মানে এখনকার ১০০–২০০ পরিবারের মধ্যে একজন খুঁজে পাওয়ার সমান।

পৃথিবীর যুদ্ধে বেসামরিক মৃত্যুর কোনো নাম ধরে তালিকা রাখা হয় না। কারণ এটি করা সম্ভব নয়। যুদ্ধ একটি অস্বাভাবিক অবস্থা, এটি রোড ট্র্যাফিক অ্যাকসিডেন্ট, সার্কাস, কনসার্ট বা ফুটবল স্টেডিয়াম নয়। এসময় তথ্য সংগ্রহের সমস্যা ছাড়াও অনেকে দেশ ত্যাগ করে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, বা পরোক্ষভাবে নিহত হয়। হত্যাকারীরাও মৃতদেহ লুকিয়ে রাখে। তাই যুদ্ধে নিহতের পরিসংখ্যান সবসময় একটি সংখ্যা; নামসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়।

তবে আমাদের কাছে অসম্পূর্ণ জেলা-ওয়ারি নিহত তালিকা আছে। যেখানে অর্ধ-পূর্ণ হিসেবে ১৮টি জেলায় সাড়ে বারো লাখ মানুষের কথা বলা যায়। এছাড়া শরণার্থী শিবিরে ১০ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অনুমান করেছে যুদ্ধের প্রভাবে আরও ৫–৭ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে মারা গেছে।

তুলনামূলক জনসংখ্যা বিচার করলে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণহত্যার সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের গণহত্যা মোটেও অবিশ্বাস্য নয়। উদাহরণ:

  • কম্বোডিয়া, খেমার রুজ: ২৬০ দিনে ২১% মানুষ হত্যা।
  • রুয়ান্ডা: ১০০ দিনে ২০% জনসংখ্যা গণহত্যা।
  • চীনের নানকিং মাসাকার: ১ মাসে ৩ লাখ মানুষ হত্যা।
  • আর্মেনিয়া: ৪৩ লাখের মধ্যে ১৫ লাখ মৃত্যু।
  • নাইজেরিয়া: ৩৫,০০০ সৈনিক ৩০ লাখ মানুষ হত্যা।

সাড়ে সাত কোটি জনগণের দেশে ৯২,০০০ পাকি সৈনিক ও দুই লাখ রাজাকার দিয়ে ৩০ লাখ নিহত, মোট জনসংখ্যার ৪% মানুষ হত্যা—মোটেও অবিশ্বাস্য নয়।

যদি বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ভালোভাবে লক্ষ্য করা হয়, তখন দেখা যাবে মুক্তিযুদ্ধে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতিসংঘে লিপিবদ্ধ। যে কোন দেশের সাথে “Demographics” শব্দটি জুড়ে দিলে পৃথক তথ্য পাওয়া যায়, যেমন “Demographics of Bangladesh”।

আমি আমার ‘ত্রিশ লক্ষ শহিদ: বাহুল্য নাকি বাস্তবতা’ গ্রন্থে এমন অনেক দেশের জনসংখ্যার ওঠাপড়া থেকে দুর্যোগ ও গণহত্যা শনাক্ত করার চেষ্টা করেছি। উপরোক্ত আলোচনা তাতে বিস্তারিতভাবে আলাপ করা হয়েছে।

১৩৮ পঠিত ... ১৬:৩৪, মার্চ ২৫, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top