স্পিকার: মাননীয় সদস্য সলিমুল্লাহ খান, কক্সবাজার-০২। আপনার সময় পাঁচ মিনিট।
সলিমুল্লাহ খান: ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার, আমাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু সুযোগ কি আপনি দিয়েছেন? সুযোগ দিয়েছে তো সংবিধান। আমি এমপি, কথা বলা আমার হক, ইংরেজিতে বলে রাইট। কিন্তু সংবিধান নিজে তো অধিকার দিতে পারে না, সেই অধিকার দিয়েছে আসলে জনগণ। তাহলে আমি জনগণকে ধন্যবাদ না দিয়ে আপনাকে কেন দিচ্ছি? আসলে আপনি একজন মুরুব্বি, মুরুব্বিদের সম্মান দিতে হয়। আপনাকে ধন্যবাদ দিলে পাপ হবে না।
আহমদ ছফা ছিলেন উগ্র বদমেজাজি। কিন্তু তিনি প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাককে সম্মান করতেন, স্যার বলতেন। গ্রামসির তত্ত্ব অনুযায়ী তারা ইন্টেলেকচুয়াল। ইন্টেলেকচুয়ালদের সম্মান দিতে হয়। সংসদ সদস্যরা কি ইন্টেলেকচুয়ালের মধ্যে পড়বে? আমাদের অনেক সহকর্মীই তো স্বশিক্ষিত।
আপনি আমাকে বলেছেন মাননীয়, আমিও আপনাকে বললাম মাননীয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে বলি মহামান্য। এগুলো কোথায় আছে যে মাননীয় বা মহামান্য বলতে হবে? আমি বলব না। তারপরেও আপনি আমাকে কথা বলতে দেবেন, কারণ পার্লামেন্টারি ইমিউনিটি। কিন্তু কোর্টে কিন্তু “মাই লর্ড” না বললে ওকালতি করা যায় না। আমি এজন্য ওকালতি করছি না।
যাইহোক, মিস্টার স্পিকার, কিন্তু আপনি কি একাই স্পিকার? আমিও তো স্পিকার। আমরা সবাই স্পিকার। স্পিকার অর্থ কী, মিস্টার স্পিকার? স্পিকার অর্থ বক্তা, যে বক্তব্য দেয় সেই স্পিকার। বক্তব্য তো আমি দিচ্ছি, তাহলে আমিই তো স্পিকার। অন্যরাও দিচ্ছে, তারাও স্পিকার। যে ডিভাইসে সাউন্ড বৃদ্ধি পায় সেটাকেও বলে স্পিকার।
আপনি হচ্ছেন মডারেটর। কিন্তু সংবিধানে আপনাকে মডারেটর বা সঞ্চালক বলেনি, বলেছে স্পিকার। স্পিকার একটা ইংরেজি শব্দ। কিন্তু সংবিধানে স্পিকারের কোনো বাংলা নাম নেই। বাকিদের বাংলা নাম আছে, আপনার আর অ্যাটর্নি জেনারেল ছাড়া। তাহলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার কী হবে? স্পিকারকে কি মাতৃভাষায় সম্বোধন করা যাবে না? অ্যাটর্নি জেনারেলকে মহাউকিল বললে কি ভুল হবে?
ফরাসি ভাষায় স্পিকারকে বলে Président du Parlement। আমরা অনুবাদ করে বলতে পারি সংসদ সভাপতি। সংবিধানে এরকম মাতৃভাষায় সম্বোধন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিষয়টি আমি সালাহউদ্দিন আহমেদকে জানিয়েছি, ১৯৮১ সালে। ওই বছরই প্রফেসর রাজ্জাক সাহেব একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ: স্টেট অব নেশন নামে।
আমি ওই বক্তৃতার একটি সমালোচনা লিখে রাজ্জাক সাহেবকে পড়তে দিয়েছিলাম। সালাহউদ্দিন আহমেদ তখন আমার রুমমেট ছিল মুহসিন হলে। সে তখন থেকেই মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখত। স্বপ্নের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড। কিন্তু এই স্বপ্ন সেই স্বপ্ন নয়, এই স্বপ্ন হচ্ছে অ্যাম্বিশন।
আমার অ্যাম্বিশন ছিল কবি হওয়া। আমরা তখন একই বিভাগের ছাত্র ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। রাষ্ট্রেরও একটি আইন বিভাগ আছে, সেটি হচ্ছে জাতীয় সংসদ। আইন বিভাগকে নিজের সীমার মধ্যে কাজ করতে হবে, বিচার বিভাগ বা নির্বাহী বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। এটিই সেপারেশন অব পাওয়ার, মন্টেস্কু নামের একজন দার্শনিক কথাটি বলেছেন।
দার্শনিক জাঁক লাকাঁ একটি বই লিখেছেন। বইটি বের হয়েছে ______
স্পিকার: মাননীয় সদস্য, আপনার সময় শেষ।
সলিমুল্লাহ খান: সময় কি আসলেই শেষ হয়? আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি অনুযায়ী সময় আপেক্ষিক, এর শুরু বা শেষ নেই। আইনস্টাইন জার্মান ইহুদি ছিলেন। হিটলারের ভয়ে আমেরিকা পালিয়ে যান। পালানোর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতা বুঝিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কবি। অথচ প্লেটো বলেছিলেন, তার রাষ্ট্র থেকে সকল কবিকে উৎখাত করে দেওয়া হবে। কিন্তু জার্মানরা উৎখাত করল একজন বিজ্ঞানী, আইনস্টাইনকে।
আইনস্টাইন একবার জমি বন্ধক রাখার জন্য একজন উকিলের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু উকিল সাহেব অনেক বোঝানোর পরেও ইংলিশ মর্টগেজ জিনিসটা বুঝতে পারেননি। যে ব্যক্তি এত বড় বড় আবিষ্কার করল, সে একটা সিম্পল আইনের ধারা বুঝতে পারল না।
ওদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে পাশ না করেই ফিরে এলেন। আসলে আইন বিষয়টা এত সহজ না।
(অতঃপর মাইক বন্ধ)



পাঠকের মন্তব্য