আজ ঈদের দিন। সারাদিনব্যাপী সারা দেশে নানা ধরনের বৈচিত্রময় উৎসবের ঘনঘটা। আমরা সাংবাদিকেরা সারা দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি এই উৎসবের আমেজ কভার করার আশায়। সেইরকমই কিছুর খোঁজে যাচ্ছিলাম পুরান ঢাকার পথ ধরে। হঠাৎ আমাকে ছেঁকে ধরল কিছু মশা। তাদের দাবি, ঈদের দিনে তাদের জীবন বৈচিত্র্যের কিছু চিত্র মানুষের নাক বরাবর তুলে ধরতে হবে। তারা মশা হলেও মানুষ না? তাদের কি কোনো সম্মান-মর্যাদা নেই?
মশার বিনবিনানিতে বিরক্ত হয়ে তাদের ঈদীয় সাক্ষাৎকার নিয়ে নিলাম। চলুন, মানবসমাজ ও মশাদের ঈদের দিনের জীবনযাপন শুনে আসি।
সাংবাদিক:
আসসালামু আলাইকুম। ঈদের দিনে আমাদের সঙ্গে আছেন পুরান ঢাকার বিখ্যাত ঢাকাইয়া কুট্টি মশা-মশারাফ মিয়া ওরফে মশা মিয়া। কেমন আছেন? ঈদ কেমন যাচ্ছে?
মশা মিয়া:
ওয়ালাইকুম সালাম ভাই। আপনি কেমন আছেন? ঈদ তো জমজমাট যাচ্ছে। উৎসবের আনন্দ লাগছে। মানুষ সেমাই খাচ্ছে, আমরা রক্তের সেমাই খাচ্ছি। সবাই খুশি!
সাংবাদিক:
ঈদের দিন আপনাদের স্পেশাল মেনু কী?
মশা মিয়া:
ঈদের মজা ভাই শুরু হয় চাঁদ রাত থেকে। মানুষ খুশিতে নানা কাজ করে রান্না, গান, নাচ, ঘুরে বেড়ায়। আর আমরা বিশাল ফাঁক পেয়ে যাই। মনের সুখে রক্ত চুষি। মানুষ টের পায় কম, তাই আরামে খাই। আবার ঈদের দিন সকালে নামাজের পর মানুষ আসে খুশিতে। তখনও আমরা বলি, এই যে ভাইজান, একটু রক্ত দেন, মনে করুন ঈদ সালামি।
সাংবাদিক:
ঈদের ভুরিভোজ কেমন হয়?
মশা মিয়া:
আহ হায় হায়! দুপুরে মানুষ গরু, খাসি, কাবাব খেয়ে ঘুম দেয়। আমরা তখন দল বানিয়ে হান্দায়া যাই।
একজন বলে, এইটা আমার পা।
আরেকজন বলে, হাতটা আমার।
আমি বলি, ঘাড়টা কেউ নিস না, এটা আমার ফেভারিট।
বুঝলেন ভাই, ঘাড়ের রক্তটা আবার আমার মিডায় লাগে।
আমরা পুরান ঢাকার মশা। আমাদের আরামের শেষ নাই। সাতদিন ধরে খাওয়া চলবে গরু, খাসি, মুরগী, ভেড়া, উট, দুম্বা কিছুই বাদ যাবে না। হেরাও খাবে, আমরাও খাব। হেরা খাবে কব্জি ডুবিয়ে, আমরা খাব শুঁড় হান্দায়া।
সাংবাদিক:
কিন্তু মানুষ তো থাপ্পড় মারে।
মশা মিয়া:
এইটাই সমস্যা ভাই। গেছে বছর ঈদের দিন আমি এক ব্যাডার গালে বেসেছি। ভাবছি ঈদের ফার্স্ট কামড় এরে দিয়ে শুরু করি। হঠাৎ ঠাস! আমার চান্দি ঘুরে গেল। ঘুরা মাথা নিয়ে আমি উড়ে গিয়ে বলি, এইটা কী ভাই! ঈদের সালাম না বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মানুষ বুঝেনি, জান নিয়ে টানাটানি একরকম।
সাংবাদিক:
এবার ঈদের পুরো দিন আপনার প্ল্যান কী?
মশা মিয়া:
প্ল্যান আছিল একদম বিশাল, কমপ্লিট প্যালান।
- সকাল: নামাজের পর মানুষ ক্লান্ত, হালকা নাশতা।
- দুপুর: ভুরিভোজের পর গভীর ঘুম, ফুল বুফে।
- রাত: ছাদে আড্ডা, ডেজার্ট কামড়।
- বাকি সারাদিন ঘুরতে ফিরতে টুকিটাকি স্ন্যাকস তো আছেই।
সাংবাদিক:
কোন সমস্যা বোধ করেন?
মশা মিয়া:
সমস্যা একটাই, মানুষ এখন খুব চালাক। আমি এক বাসায় ঢুকি, দেখি কী অবস্থা।
একদিকে কয়েল, আরেকদিকে স্প্রে, মশা মারার ইলেক্ট্রিক ব্যাট, উপরে মশারি।
আমি ভাবলাম, এইটা তো দেহি বাসা না, মশাগো জন্য মিলিটারি ট্রেনিং ক্যাম্প বানায়া রাখছে।
দিন দিন আমাদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে আমরা ফাস্ট লার্নার। কোভিডের পর থেকে নিজেরা ট্রেনিং দিয়ে এক্কেরে কমব্যাট বানিয়েছি।
সাংবাদিক:
আচ্ছা, তো আমরা…
মশা মিয়া:
আরে সাংবাদিক, হালায় তো দেখি বেকুব। ওই মিয়া পরিবার-পরিজন জিজ্ঞেস করবেন না? ডিরিম কি জিজ্ঞেস করবেন না? জিজ্ঞেস করুন মিয়া।
সাংবাদিক:
সরি, সরি। আচ্ছা আপনার পরিবার-পরিজন কেমন?
মশা মিয়া:
হেইডা ভাই, বিশাল ট্র্যাজিক। আমার বিশাল পরিবার ছিল। অনেক ভাই-বোন, চাচা-চাচি, দাদা-দাদি সবাই একসাথে থাকতাম। কোভিডের পর সব মারা সাফ হয়ে গেছে। আরও ডেংগুর সময়ে আমরা যেমন মানুষ মারি, তেমন আমরাও মরি। এখন আমরা পরিবারে আছি চারজন, আব্বা মশা, আম্মা মশি, ছেলে মশু মানে আমি, আর আমার বোন মেয়ে মশি। আমাদের সঙ্গে থাকে এক প্রতিবেশী চাচা মশা।
সাংবাদিক:
আপনার স্বপ্ন কী?
মশা মিয়া:
আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতিকে একটু কামড়াইতে মনে চায়। রক্ত খেয়ে দেখতে মন চায় কেমন লাগে।
সাংবাদিক:
শেষে দর্শকদের জন্য কিছু বলবেন?
মশা মিয়া:
হ্যাঁ, কমু না কি।
ঈদ মোবারক। সেমাই খান, কাবাব খান… কিন্তু একটু রক্তও দান করুন। মশা সমাজ কৃতজ্ঞ থাকবে। আর মশা মারার জন্য এতো কিছু আইন নেই।



পাঠকের মন্তব্য