নীলক্ষেতের মোড়ে তখন দুই-একটা জোনাকি উড়তাছিল কি না কে জানে, কিন্তু জলপাই রঙের ট্রাকগুলা যখন গরজায়া জগন্নাথ হলের গেটে ব্রেক কষল, তখন ঘড়ির কাঁটা ১১টা ছুঁইছুঁই। শহরজুড়া কারফিউ, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা ফাটায়া দিল বুটের আওয়াজ আর রাইফেলের খটখটানি। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, যারে সবাই জি. সি. দেব নামেই চেনে, হয়তো তখনো পড়ার টেবিলে বইসা ‘আদর্শবাদ ও প্রগতি’র কোনো প্যাঁচাল মিলাইতাছিলেন। সত্তর ছুঁইছুঁই এই মানুষটার নিজের কোনো সন্তান আছিল না, কিন্তু এক মুসলিম মেয়ে রোকেয়ারে দত্তক নিয়া তিনি প্রমাণ করছিলেন, দর্শন খালি বইয়ের পাতায় থাকে না, ওটা যাপন করতে হয়।
রাত বাড়ার লগে লগে হলের চারপাশটা নরক হয়া উঠল। ২৬ মার্চ ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে, যখন পাখিরাও জাগে নাই, ড. দেবের কোয়ার্টারের দরজায় পড়ল পৈশাচিক বাড়ি। বাইরে থেইকা ভাইসা আইল সেই কুখ্যাত চিল্লাচিল্লি, কাঁহা হ্যায় মালাউন? দরওয়াজা খোল!
দরজাটা যখন ভাইঙ্গা উনার ওপর পড়ল, সাদা মনের এই বুড়া প্রফেসর সামলাইতে পারলেন না। এক ঘাতক রাইফেলের বাঁট দিয়া উনার মাথায় দিল এক বাড়ি, অন্যজন সরাসরি বুক লক্ষ্য কইরা চালাল তপ্ত সীসা। ড. দেব হয়তো শেষবারের মতো উনার সেই চেনা মায়াময় চোখে ঘাতকদের পানে চাইছিলেন। একদম ঝিমায়া যাওয়া গলায় তিনি জিগাইছিলেন, কী চাও, বাবা? এই একটা কথার মাঝেই লুকায়া ছিল কত বছরের মানবিকতা। কিন্তু সেই মরণজয়ী প্রশ্নের উত্তর আইল আরও কয়েক রাউন্ড গুলিতে। দুইটা মাথায়, বাকিগুলা বুকে। উনার নিথর লাশটা যখন টানতে টানতে জগন্নাথ হলের মাঠে নিয়া যাওয়া হইতেছিল, ঘাতকরা উনার জামাই মোহাম্মদ আলীরেও ছাড়ল না। রোকেয়া সুলতানা পাথর হয়া এক কোণায় পইড়া রইলেন, বাঁইচা থাকলেন খালি এই আজরাইলি কারবার দেখার সাক্ষী হইতে। মাঠের এক কোণে পইড়া রইল দর্শনের সেই বিশাল বটগাছ, যার ছায়ায় কত শত ছাত্র মাথা উঁচা কইরা খাড়াইতে শিখছিল।
শহরের অন্য মাথায় যখন আগুনের লেলিহান শিখা আসমান ছুঁইতাছে, তখন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ আবাসের চারপাশটা একদম থমথমে। ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, যিনি ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাসে সুইনবার্ন বা ব্রিজেসের নাটকের কিসসা দিয়া ছাত্রদের পাগল কইরা রাখতেন, তিনি তখন ঘরের ভেতর হয়তো কোনো ট্র্যাজেডির শেষ দৃশ্যটা কল্পনাও করতে পারেন নাই। রাত বাড়ার লগে লগে জলপাই রঙের ট্রাকগুলা যখন ধুলা উড়াইয়া ঢুকল, তখন প্রকৃতিও যেন জবান হারায়া ফেলছিল।
পর্দা উঠল ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য নাটকের। পাকিস্তানি ঘাতক দল ড. গুহঠাকুরতার বাসার সামনে আইসা খাড়াইল। একদম শৌখিন আর ভদ্র এই মানুষটারে উনার প্রিয় ঘর থেইকা হ্যাঁচকা টানে বের কইরা আনা হইলো বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে। শহীদ মিনারের একদম কাছে, যেখানে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি এখনো জ্যান্ত, সেখানেই তাঁরে তাক কইরা চালানো হইলো এলোপাথাড়ি গুলি। পিঠে আর শরীরে বিঁইধা রইল তপ্ত সীসা।
একই লগে পাশের বিল্ডিংয়ে চলল আরেক নারকীয় তাণ্ডব। পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর এ. এন. এম. মনিরুজ্জামান আর উনার পরিবারের লোকজন তখন সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে অসহায় হয়া খাড়ায়া। ঘাতকদের মেশিনগান থেইকা ছিটকায়া আসা বুলেট নিমেষেই থামায়া দিল একটা মেধাবী পরিবাররে। সহকারী হাউস টিউটর অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যরে উনার নিজের রুমেই জান দিতে হইলো, যিনি ছাত্রদের আগলায়া রাখার চেষ্টা করছিলেন শেষ সময় পর্যন্ত।
ড. গুহঠাকুরতা কিন্তু তখনো হার মানেন নাই। মারাত্মক জখম অবস্থায়, অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি পইড়া ছিলেন সেই বিভীষিকাময় ময়দানে। ২৭ মার্চ যখন তাঁরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়া যাওয়া হইলো, হাসপাতাল তখন নিজেই এক ধ্বংসস্তূপ। ডাক্তার নাই, ওষুধ নাই, খালি চারদিকে হাহাকার আর লাশের গন্ধ। টানা তিন দিন মউতের লগে পাঞ্জা লইড়া, রক্তক্ষরণে নীল হয়া ৩০ মার্চ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন। ঢাকা মেডিকেলের অদূরে একটা গাছের নিচে নামছাড়া এক কবরে শায়িত হইলেন ইংরেজি সাহিত্যের এই দিকপাল।
সেই কালরাতে জগন্নাথ হলের মাঠটা খালি একটা মাঠ আছিল না, ওটা হয়া গেছিল একটা কসাইখানা। ছাত্রদের লাইনে খাড়া করায়া যখন ব্রাশফায়ার করা হইতেছিল, তখন ঘাতকরা দাঁত কেলানি দিয়া হাসতাছিল এই ভাইবা যে, মাথাগুলা কাইটা দিলেই বাঙালি জাতি চিরদিনের লাইগা পঙ্গু হয়া যাইব। হেরা বুঝতে পারে নাই, ড. দেবের শেষ প্রশ্ন ‘কী চাও, বাবা?’ কিম্বা ড. গুহঠাকুরতার রক্তে ভেজা সেই ঘাস থেইকাই জন্ম নিবে এক অপরাজেয় বাংলাদেশ।



পাঠকের মন্তব্য