বিশ্বজুড়ে ঈদুল ফিতর এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দ, ক্ষমা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদের নামাজ, ফিতরা প্রদান, নতুন পোশাক পরিধান, বিশেষ খাবার তৈরি এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে কুশল বিনিময় বিশ্বব্যাপী সাধারণ রীতি। কিন্তু অঞ্চল, দেশ ও জাতিভেদে এই সাধারণ রীতি-প্রথার বাইরেও সবারই নিজস্ব কিছু ঐতিহ্য রয়েছে, যা তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখে। আজ জেনে নেওয়া যাক বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ঈদুল ফিতর পালনের কিছু বিশেষ রীতি।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান:
ঈদের আগের রাতে মেহেদি পরা এবং ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাকে ঈদগাহ, খোলা মাঠ বা মসজিদে ঈদের নামাজ পড়া প্রধান রীতি। এরপর কোলাকুলি, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া এবং সেমাই, পায়েস, পোলাও, কোরমা ও হালিমের মতো সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করা হয়। শিশুদের ঈদি দেওয়ার রেওয়াজও রয়েছে।
মধ্য এশিয়ার দেশগুলো:
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে (উইঘুর অঞ্চল, আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান) ঈদুল ফিতর রমজান ঈদ বা ছোট ঈদ নামে পরিচিত, যা অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয়। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ঈদের নামাজ আদায়, বিশেষ প্রাতঃরাশ (খেজুর ও মিষ্টি), আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাতায়াত এবং ঘরে ঘরে সুস্বাদু খাবারের আতিথেয়তা এই অঞ্চলের প্রধান প্রথা।
ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে পোলাও, কাবাব, শির খুরমা, বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট ও মিষ্টি পরিবেশন করা হয়। বড়রা ছোটদের ‘ঈদি’ বা সালামি দেন। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়ি পরিদর্শন করে ‘ঈদ মোবারক’ বলে আলিঙ্গন করা হয়।
এছাড়া অনেক গ্রামে ঈদের মেলা বসে এবং নৌকা বাইচ, কাবাডি বা স্থানীয় লোকজ খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। পশতুভাষী আফগানরা ঈদুল ফিতরকে ‘কোচনাই আখতার’ বলে। পরিবার-পরিজন একত্রিত হয়ে তারা দিনটি উদযাপন করে।
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া:
এখানে ঈদ লেবারান বা হারি রায়া নামে পরিচিত। এর অন্যতম প্রধান প্রথা হলো মুদিক, যেখানে শহর থেকে মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ফেরেন।
তারা কেটুপাট (পাম পাতায় মোড়ানো চাল) এবং রেনদাং (মসলাদার মাংস) তৈরি করেন এবং ঘরে ঘরে আতিথেয়তা প্রদর্শন করেন।
মালয়েশিয়ায় ওপেন হাউস নামে একটি প্রথা আছে, যেখানে ঈদের দিন সবার জন্য ঘরের দরজা খোলা থাকে এবং সবাই এসে খাওয়া-দাওয়া করে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রথা:
সৌদি আরব:
ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাকে বড় জামাতে নামাজ আদায় করা হয়। ঐতিহ্যবাহী পোশাক থোব ও ঘুতরা পরে সবাই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে। পরিবারের সবাই মুরব্বিদের বাড়িতে জড়ো হন এবং ভুরিভোজের আয়োজন করেন। প্রথা অনুযায়ী, সৌদিতে অভাবীদের বাড়ির দরজায় বেনামে চাল ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য রেখে আসার প্রচলন আছে।
ইরানেও প্রায় একইভাবে ঈদ পালন করা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE):
উৎসবের আমেজে ঘর সাজানো হয় এবং পরিবারগুলো একসাথে প্রচুর পরিমাণে ‘মামুল’ (খেজুরের পেস্ট ভরা কুকি) তৈরি করে।
ইরাক:
এখানে ক্লাইচা (খেজুর, বাদাম ও চিনি দিয়ে তৈরি বিস্কুট) তৈরির প্রথা প্রচলিত।
তুরস্ক:
ঈদকে এখানে রামাজান বায়রাম বা শেকের বায়রাম (চিনির উৎসব) বলা হয়। এ সময় বিশেষ মিষ্টি বাকলাভা খাওয়ার রীতি আছে। ছোটরা বড়দের হাতে চুমু খেয়ে শুভেচ্ছা জানায় এবং বিনিময়ে উপহার বা অর্থ পায়। বয়স্করা শিশুদের ঈদিয়া (টাকা) দেন।
আফ্রিকা:
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ঈদুল ফিতর অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে, সামাজিক মেলবন্ধন এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের মাধ্যমে উদযাপিত হয়। সকালে বিশাল জামাতে ঈদের নামাজ, নতুন পোশাক পরিধান, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো, বিশেষ খাবার খাওয়া এবং গরিবদের মধ্যে ফিতরা ও খাবার বিতরণ এখানকার মূল রীতি।
পূর্ব আফ্রিকা (কেনিয়া, তানজানিয়া, জাঞ্জিবার):
এ অঞ্চলে ঈদ উদযাপনে ‘মাউলিদি’ শোভাযাত্রা ভিন্নমাত্রা যোগ করে, যেখানে মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে ইসলামী কবিতা পাঠ করে। সুয়াহিলি সংস্কৃতিতে নারীরা নতুন পোশাক ও হাতে মেহেদি পরেন। সামুদ্রিক মাছ, নারকেল ও আম দিয়ে তৈরি বিশেষ খাবারের প্রচলন রয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকা (নাইজেরিয়া, সেনেগাল, মালি):
নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী দুর্বার উৎসব হয়, যেখানে ঘোড়ায় চড়ে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন করা হয়। সেনেগালে থিয়েবুদিয়েন (মাছ ও ভাতের বিশেষ খাবার) পরিবেশন করা হয়।
উত্তর ও দক্ষিণ আফ্রিকা:
দক্ষিণ আফ্রিকায় ঈদের দিন নামাজ শেষে সবাই কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। স্থানীয় ধনী ও ব্যবসায়ীদের সহায়তায় অভাবী মানুষের মধ্যে ঈদের খাবার বিতরণ করা হয়।
মিশর:
মিশরীয়রা ঈদে রঙিন বাতি ও লণ্ঠন দিয়ে ঘর সাজায়। সকালে নামাজ পড়ে তারা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যায়। কাহক (পাউডার চিনিযুক্ত বিস্কুট) ঈদের অন্যতম প্রধান খাবার।
আফ্রিকার এই উৎসবগুলো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং বর্ণিল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, নাচ-গান এবং সামূহিক ভোজের মাধ্যমে ফুটে ওঠে।
ইউরোপ ও আমেরিকা:
ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ঈদুল ফিতর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। মুসলিমরা ভোরে স্থানীয় মসজিদ বা বড় খোলা জায়গায় ঈদের নামাজ আদায় করেন। তারা নতুন বা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন এবং নারীরা হাতে মেহেদি লাগান।
এরপর কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করা হয়। দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে বিরিয়ানি জনপ্রিয়। বড়রা ছোটদের ‘ঈদ সালামি’ দেন।
যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় ঈদ অনেকটা এশীয় আমেজে পালিত হয়। আইসল্যান্ডে বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা একসাথে নামাজ পড়ে নিজেদের খাবার ভাগাভাগি করেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় একইভাবে ঈদ উদযাপিত হয়।
যদিও ইউরোপ ও আমেরিকার বেশিরভাগ দেশে এটি সরকারি ছুটির দিন নয়, তবুও কমিউনিটিগুলোর কাছে এটি অন্যতম বড় সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব।



পাঠকের মন্তব্য