ঈদের টেবিলের রান্নাগুলো:আরে এরা কারা কোথা থেকে এলো

১০ পঠিত ... ৮ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে

যেহেতু আমরা বাঙালি, ঈদের দিনের খাবার টেবিলে আমাদের জম্পেশ ভুরিভোজন তো চাই-ই চাই। পোলাও, কোরমা, কাবাব, রোস্ট, বোরহানি, ফালুদা, সেমাই, জর্দা, পায়েস, চটপটি, এসব খাবার তো মাস্ট! এসব খাবার বহুকাল ধরে আমাদের ডাইনিং সাজিয়ে রেখেছে এবং আমাদের দিচ্ছে উৎসবের খাবারের পরিতৃপ্তি। এসব খাবার ছাড়া নিজেদের মুখের রুচি আর অতিথি আপ্যায়ন কোনোটাই পূর্ণাঙ্গতা পায় না। কিন্তু এসব খাবারের বেশিরভাগই অন্যান্য সংস্কৃতি থেকে এসে আমাদের সংস্কৃতিতে মিশেছে। আজকে জানি আমাদের পছন্দের খাবারগুলো কে কোথা থেকে এসেছে।

সেমাই:
সেমাই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের শারিয়া বা ভার্মিসেলি থেকে উদ্ভূত একটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, যা কয়েকশ বছর ধরে বাংলার মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে, বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মিশে গেছে।
ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সেমাই শব্দের মূলে গ্রিক শব্দ সেমিদালিস রয়েছে, যার অর্থ মিহি ময়দা বা সুজি। এই সেমিদালিস শব্দ সংস্কৃত ভাষায় প্রবেশ করে সমিদা রূপ ধারণ করে। সমিদা থেকেই পরবর্তীকালে সেমাই শব্দটি এসেছে।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে সেমাইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না, তবে এটি সে সময়েই মধ্যপ্রাচ্য থেকে এ অঞ্চলে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। অনেকের মতে, এটি আফগান মিষ্টি শীর খুরমা বা উত্তর ভারতের সেভইয়াঁর সঙ্গে সম্পর্কিত।
পুরান ঢাকায় বসবাসকারী অবাঙালি বা আদি ঢাকাইয়ারা প্রথম লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রচলন করেন। আগে বাড়ির মহিলারা ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই ময়দা বা চালের আটা দিয়ে হাতে সেমাই তৈরি করতেন। এখন বাণিজ্যিক উৎপাদন বেশি হলেও, দুধে ভেজানো সেমাই বা জর্দা ছাড়া ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ মনে হয়।

জর্দা:
ঈদের দিনের নাশতার তালিকায় আরেকটি নাম হচ্ছে জর্দা। এটি মূলত এক ধরনের মিষ্টি ভাত, যা সাধারণত বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে খাওয়া হয়।
জর্দা মূলত ফার্সি শব্দ জার্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলুদ, জাফরান বা হলুদ রঙ ব্যবহারের কারণে এই নাম। এটি উত্তর ভারত থেকে উৎপন্ন একটি মুঘল আমলের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন।
মুঘল আমলে, বিশেষ করে সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় একটি মিষ্টি পোলাও হিসেবে এর প্রচলন ছিল। তাঁর অনুরোধে প্রায়ই এই খাবারটি রাজকীয় ভোজসভায় তৈরি করা হতো। জাফরান, ঘি, চিনি ও শুকনো ফল দিয়ে তৈরি এই সুগন্ধি মিষ্টি ভাত দক্ষিণ এশিয়ার বিয়ে, ঈদ ও নানা উৎসবে ঐতিহ্যবাহী খাবার।
ঐতিহ্যগতভাবে জাফরান ব্যবহার হলেও বর্তমানে অনেকেই খাবারের রঙ হলুদ, কমলা, লাল ব্যবহার করেন। এর সঙ্গে এলাচ, কাঠবাদাম, কিশমিশ এবং মাওয়া ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় মিষ্টি ও মোরব্বাও ব্যবহার করা হয়।
বাঙালি সংস্কৃতির বিশেষ ভোজের একটি অংশ হিসেবে এই খাবারটিও যুগ যুগ ধরে জনপ্রিয় হয়ে এসেছে।

চটপটি:
চটপটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মশলাদার খাবার। এটি মূলত সেদ্ধ মটর, আলু, ডিম, মশলা এবং টক পানির মিশ্রণে তৈরি হয়। ধারণা করা হয়, এর উৎপত্তি বাঙালি সংস্কৃতিতেই, যা কম দাম ও সুস্বাদু স্বাদের কারণে শহরাঞ্চলে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। এটি ফুচকার একটি উপজাত বা ভিন্ন রূপ হিসেবেও পরিচিত। তবে বর্তমানে এটি স্ট্রিট ফুড হিসেবেই বেশি জনপ্রিয়।

পায়েস:
পায়েস ভারতীয় উপমহাদেশের হাজার বছরের পুরনো একটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন, যা চাল, দুধ ও গুড় বা চিনি দিয়ে তৈরি হয়। সংস্কৃত শব্দ ক্ষীর বা পায়স যার অর্থ দুধ থেকে উৎপন্ন, সেখান থেকেই এর উৎপত্তি।
প্রাচীনকাল থেকেই জন্মদিন, বিবাহ এবং পূজা-পার্বণে পায়েস একটি অবিচ্ছেদ্য ও পবিত্র খাবার হিসেবে পরিবেশিত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে মুসলিম প্রভাব পড়ে এটি আরও পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপ ধারণ করে।
ঐতিহ্যগতভাবে চাল ও দুধের এই মিশ্রণটি সময়ের সঙ্গে অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হয়েছে। এতে এখন কিশমিশ, বাদাম ও এলাচ ব্যবহার করা হয়, যা কাশ্মীরি কায়দার প্রভাব হতে পারে বলে মনে করা হয়।
শুধু চালের পায়েস নয়, এর বিভিন্ন রূপ রয়েছে, যেমন ফিরনি, ক্ষীর এবং ছানার পায়েস।

বিরিয়ানি:
আমাদের ঈদের প্লেট বিরিয়ানি ছাড়া যেন বিরান মরুভূমির মতো লাগে, না হলেই না।
এই বিরিয়ানি ফার্সি শব্দ বিরিয়ান থেকে এসেছে, যার অর্থ রান্নার আগে ভাজা। আবার অনেকে বলেন, এটি বিরিঞ্জ বিরিয়ান শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ভাজা ভাত।
পারস্য বর্তমান ইরানের রান্নাঘর থেকে বিরিয়ানির সূচনা, যেখানে রান্নার আগে চাল ও মাংস ঘি দিয়ে ভেজে নেওয়ার রেওয়াজ ছিল।
মুঘল আমলে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা পায়। মাংস ও সুগন্ধি চালের এই খাবারটি মধ্য এশিয়ার পিলাফ বা পোলাওয়ের একটি বিবর্তিত রূপ বলে মনে করা হয়।
মুঘল সম্রাট হুমায়ুন বা শাহজাহানের আমলে এটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। তৎকালীন আওয়াধের লখনউ নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের হাত ধরে কলকাতার বিরিয়ানিতে আলু ও ডিমের ব্যবহার শুরু হয়।
কাচ্চি, পাক্কি, হায়দ্রাবাদি এবং কলকাতা বিরিয়ানি, এগুলোই এর প্রধান বৈচিত্র্য। বর্তমানে আমাদের দেশে আরও নানা ধরনের বিরিয়ানির প্রচলন দেখা যায়, যেমন আরাবিয়ান খাবসা, আফগানি চিকেন বিরিয়ানি, দম বিরিয়ানি ইত্যাদি। এতে মুরগি, গরু, খাসি সব ধরনের মাংসই ব্যবহার করা হয়।

কাবাব:
ঈদের খাদ্যতালিকায় কাবাব আমাদের অন্যতম প্রিয় আইটেম। কাবাবের ইতিহাস ২০০০ বছরেরও বেশি পুরনো, তাই এটি অন্যতম প্রাচীন রান্না করা খাবার হিসেবে গণ্য করা হয়।
ধারণা করা হয়, তুর্কি সৈন্যরা খোলা আকাশের নিচে তরবারিতে গেঁথে মাংস ভাজা শুরু করলে কাবাবের সূচনা হয়। অনেকে মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের যাযাবর উপজাতিরা আগুনের ওপর মাংস ঝলসানোর পদ্ধতি শুরু করেছিল।
কাবাব শব্দটি প্রাচীন ফার্সি থেকে এসেছে, যার অর্থ ঝলসানো বা পোড়ানো মাংস।
৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তুরস্কে শিকের মতো করে মাংস ঝলসানোর প্রমাণ পাওয়া যায়, যা আধুনিক শিক কাবাবের সূচনা বলে মনে করা হয়।
মুঘল সম্রাটদের হাত ধরে কাবাব ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা পায়। সুলতানি ও মুঘল যুগে এটি নানা রূপ নেয়, যেমন শিক কাবাব, গালাউটি কাবাব, শাম্মি কাবাব।
বর্তমানে আমাদের দেশে কাবাব শুধু মাংসে সীমাবদ্ধ নয়, মুরগি, গরু, মাছ, এমনকি সবজি দিয়েও তৈরি হয়।

বোরহানি:
বোরহানি বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী ও মশলাদার পানীয়, যা মূলত ভারী খাবারের পর হজমে সহায়তার জন্য পান করা হয়।
এর উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ধারণা করা হয়, এটি আরব বা তুর্কি অঞ্চল থেকে উপমহাদেশে এসেছে এবং পরে বাঙালি সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেয়।
মুঘল আমলে এর প্রচলন শুরু হয়েছিল বলেও অনেকে মনে করেন। পুরান ঢাকার বাবুর্চিরা, যেমন বিখ্যাত ফখরুদ্দিন বাবুর্চি, এই পানীয়টিকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
টক দই, পুদিনা পাতা, ধনেপাতা, সরিষা বাটা ও কাঁচা মরিচ দিয়ে এটি তৈরি হয়।
এটি শুধু সুস্বাদু পানীয়ই নয়, বরং দইয়ের প্রোবায়োটিক অণুজীব হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। তাই ঈদ, বিয়ে বা যেকোনো ভোজের শেষে এটি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

আমরা বাঙালিরা মিশ্র জাতি, তাই আমাদের সংস্কৃতিও মিশ্র। তার একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে আমাদের উৎসবের খাদ্যতালিকা। তবে এসব খাদ্যের উৎস যেখানেই হোক না কেন, বাঙালি এগুলোকে নিজেদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে আপন করে নিয়েছে।

১০ পঠিত ... ৮ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top