ঈদ: তখন আর এখন

পঠিত ... ৩ ঘন্টা ০ মিনিট আগে

মানুষটা, মুহাম্মদ (সা.), মদিনায় আইসা সব কেমন উল্টাপাল্টা কইরা দিলেন। আগের ওই জমকালো উৎসব, পারস্য থেইকা আসা নাচ-গান সবই তার কাছে কেমন ফ্যাকাশে লাগলো। তিনি আনসারদের দিকে চাইয়া একডা মায়া মায়া হাসি দিয়া কইলেন, তোমাগো ওই পুরান দুইদিন থাক, আমি তোমাগো নতুন দুইটা সহজ দিন দেই। ব্যাস, ওইখান থেইকাই নতুন কাহিনি শুরু।

৬২৪ সালের ওই প্রথম রমজান শেষ হইলে মদিনার আকাশডা মনে হয় একটু বেশি নীল আছিল। কোনো রাজকীয় গেইট নাই, আতশবাজি নাই। এক কোণায় খোলা মাঠ, ওরাই কয় মুসাল্লা। ঈদের নামাজে আজান ইকামত নাই, কিন্তু সবাই নিয়ম মাফিক আইসা কাতার বাইন্ধা দাঁড়াইলো। ধুলা মাখা পা, গায়ে নতুন কাপড়ের গন্ধ, আর পকেটে কয়েকটা খেজুর। মজার ব্যাপার হইলো, ওই খেজুর বেজোড় সংখ্যায় খাওয়া হইত, এক, তিন, পাঁচ, এইডা আসলে নবীর সুন্নাহ, তাই মানুষও ওইভাবেই ফলো করতো।

নামাজ শেষ কইরা ফেরার টাইমেও এক কাণ্ড, যেই রাস্তা দিয়া আইছে ওই রাস্তা দিয়া না, অন্য রাস্তা দিয়া ফিরতো। এইটার পেছনে নানা ব্যাখ্যা আছে, বেশি মানুষের সাথে দেখা করা, দুই রাস্তা যেন এই দিনের সাক্ষী থাকে, এইরকম কথা বলা হয়। মনে হয় রাস্তাঘাটকেও জানানো লাগবো, আজ আনন্দের দিন।

আরেকটা সুন্দর দৃশ্য আছিল, এক ঘরের কোণায় দুইডা মাইয়া গান গাইতাছে, পুরান যুদ্ধের কাহিনি। ওই সময়ের কড়া মেজাজের আবু বকর (রা.) ঢুইকা রাগ কইরা আগুন। কিন্তু নবী (সা.) চাদর মুড়ি দিয়া শুইয়া মৃদুস্বরে কইলেন, আরে গাইতে দাও, আজ ওদের আনন্দের দিন।

ওই সময় ঈদ মানে ছিল না বিশাল খাওয়া দাওয়া বা রাজকীয় কিছু। একমুঠো খেজুর, একটু রোদ, আর একডা সোজা সরল আনন্দ। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, নামাজের আগে গরিবের হাতে খাবার দিয়া দেয়, একদম গ্রামের বৃষ্টির পরের শান্ত বিকেলের মতো।

পরে যখন এই ঈদ খিলাফতের ভেতরে ছড়াইল, তখন আস্তে আস্তে বদলাইতে শুরু করলো। উমাইয়াদের সময় রাজধানী গেল দামেস্কে। ঈদ তখন শুধু পাড়ার উৎসব না, বড় সাম্রাজ্যের অনুষ্ঠান। খলিফারা রেশমি কাপড় পইরা আসে, রাজকোষ থেইকা টাকা খাবার বিলি হয়। পারস্য আর বাইজান্টাইন কালচারের প্রভাব আইসা খাবার আর পোশাকে নতুন আভিজাত্য আইলো।

তারপর আব্বাসীয় আমলে বাগদাদে ঈদের জৌলুস আরও বাড়লো। হারুন আল-রশিদ এর টাইমে প্রাসাদে বিশাল ভোজ, সাধারণ মানুষ থেইকা বড় লোক সবাইর জন্য দরজা খোলা। মশাল আর বাতির আলোয় শহর ঝলমল করতো। খলিফা নিজে চাঁদ দেখতো, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা বোনাস পাইতো, রাস্তায় মিছিল হইতো। ঈদের নামাজ তখন ইবাদতের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বও বহন করতো।

অটোমানরা আইসা এই ঈদরে একেবারে শাহী রূপ দিছে। সুলতানের প্রাসাদে বাজনা বাজে, বাকলাভার গন্ধ চারদিকে ছড়ায়। বাংলায় মুঘলরা আইসা ঢাকায় আর মুর্শিদাবাদে ঈদে নতুন মজা যোগ করলো। ঈদগাহে নামাজের পর মেলা বসতো, নবাব হাতির পিঠে চড়তো। সেমাই, বিরিয়ানি, ফিরনি এইসব খাবার তখন জনপ্রিয় হইলো। ঢাকার টুপি আর আতর ছাড়া ঈদ যেন জমতোই না।

আর এখনকার সময়টা তো আরও আলাদা। এখন ঈদ মানেই টিভিতে অনুষ্ঠান, শপিং মলে ঘুরাঘুরি। আগের ওই দুইটা রাস্তার বদলে এখন আমরা মলের ভিতরে ঘুরতে থাকি। চাঁদ দেখা নিয়াও এখন ডিজিটাল আলোচনা চলে। আগে মানুষ বাড়ি বাড়ি যাইতো, এখন মোবাইলে ঈদ মোবারক পাঠায়।

এই বড় বড় মল, লাইটিং, আর সোশ্যাল মিডিয়ার ছবির ভিড়ে ওই মদিনার ধুলামাখা রোদ আর কয়েকটা বেজোড় খেজুরের গল্পটা এখন অনেক দূরের মনে হয়। জৌলুস অনেক বাড়ছে, কিন্তু ওই সরল আনন্দটা আগের মতো আছে কিনা, এইটা মনে হয় চুপচাপ বসে ভাবলেই বোঝা যায়।

পঠিত ... ৩ ঘন্টা ০ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top