আজ বিলের মেজাজটা খুবই খারাপ। আজ তার অনেক পরিশ্রম হয়েছে, একই সাথে তাকে বড় বড় কিছু ঝক্কিও সামলাতে হয়েছে।আজ হেডঅফিস থেকে মালিকের খাস কর্মচারিরা এসেছিলো ফ্যাক্টরির বার্ষিক পরিদর্শন করতে। তাদের নানা ফাই-ফরমাশে জীবন অতিষ্ট তার। নিজের কাজেরই কোন কমতি নেই তার, ওদিকে এসব ঝামেলা।
বিল এই ফ্যাক্টরির ফ্লোর ম্যানেজার। কি গালভরা শব্দ! কিন্তু তা ঐ শব্দতেই সীমাবদ্ধ। কাজ তার মজুরের মত। সারাদিন তাকে ফ্লোরে হেটে বেড়াতে হয়। তাদের পুরো ফ্লোরে একটিমাত্র চেয়ার আর একটি টেবিল। এগুলো তার জন্যই রাখা। কিন্তু তাতে তার বসার কোন উপায় নেই। কারন টেবিলটার ওপরে স্তুপীকৃত থাকে ডাই ডাই কাপড় আর চেয়ারটাকে আর দেখাই যায় না হিসাবের খাতার স্তুপে!
অবশ্য বসার সময়ও তার হয় না। সারাদিন এই বিশাল ফ্লোরে কাজ করা শ'তিনেক মানুষ কোন না কোন ভুল করেই যেতে থাকে আর তাকে সেগুলো সমাধান করে ফেলতে হয়। কাজ জমিয়ে রাখার কোন উপায় নেই, আজকের কাজ এবং আজকের সমস্যা আজকেই সমাধান করতে হবে নইলে শিপমেন্টে দেরি হবে। সেটা হলেই শিপমেন্ট ক্যান্সেল আর ফ্যাক্টরির লস। এই পুরো কর্মকান্ডের সম্পুর্ন দোষ বর্তাবে ফ্লোর ম্যানেজার তথা বিলের ওপর। বিলের মাঝে মাঝে মনে হয় যখন সে ডিউটি করে তখন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস যদি আপনা থেকেই না চলত, তবে সে মারা পড়ত কারন ডিউটি আওয়ারে সে দম ফেলার বা নেয়ার ফুরসতটুকুও পায় না।
তার ডিউটি আওয়ার প্রায় পনেরো-ষোল ঘন্টা। ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে সে বাসায় যায়। সে একা মানুষ। এত ক্লান্তি জমিয়ে সে বাসায় যায় যে অনেকদিন বাসায় গিয়ে বিছানায় একটু বসে আর অবাক হয় দেখে যখন পরদিন সকালে তার ঘুম ভাঙে। সেই বসা থেকে কখন শুয়েছে, কখন ঘুমিয়েছে, কখন সকাল হয়ে আবার ফ্যাক্টরির ঘন্টাও বাজতে লেগেছে সে কিছুই জানে না। মাসের পনেরো-বিশদিন এভাবেই না খেয়ে-ধুয়েই পার হয়ে যায় তার। মানুষের জীবন নয় তাদের কারখানাবাসীদের, যন্ত্রের জীবন।
পাশের বাড়িতে বিলের ছোটবেলার বন্ধু টম থাকে তার মাকে নিয়ে। বিলকে নিজের আরেকটা ছেলেই মনে করেন টমের মা। বিলও আন্ট পার্কার বলতে অজ্ঞান। প্রতিদিন সকালের নাশতা তাদের বাসাতেই করতে হয় বিলকে। নয়তো আন্ট ছাড়েন না।
তাদের এই এলাকায় যারা বাস করে তারা হতদরিদ্র। সবাই প্রায় কারখানা শ্রমিক। তাদের দৈনন্দিন কাজের ঘন্টার তুলনায় মজুরি শুন্য প্রায় বলা চলে। জাতে থাকা মানুষেরা তাদের মানুষ বলেই মনে করে না, তাই তাদের জীবন প্রায় পশুর। সদাই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তবুও আন্ট তাকে নাশতা না খাইয়ে ছাড়েন না। বলেন,
এখন তোকে না খাইয়ে রেখে মরলে পরে তোর মা কে কি জবাব দেব রে আমি ছোড়া? তার চেয়ে হোমওয়ার্ক করে যাওয়া ভালো। যাতে তোর মা কিছু উল্টোপাল্টা বললেই মুখে ঝামা ঘষে দিতে পারি।
আন্ট পার্কার আর তার মা ছিলো শিশুকালের বান্ধবী। মা ওপারে চলে গেছেন তবু বিল আন্ট পার্কারের জন্য কখনোই মায়ের অভাব বোধ করে না।
আজ টমদের বাসায় ঢুকেই বিল যথারীতি 'আন্ট' বলে চেঁচিয়ে ডাকল। কিন্তু আজ সারাবাড়িতে কোন শব্দ নেই। বিল একে একে ঘরদুটো ঘুরে দেখল। কেউ নেই। বাইরে বেরিয়ে ছোট্ট পলিনাকে খেলতে দেখে ডেকে জিজ্ঞেস করল সে জানে কিনা টমরা গেছে কোথায়। পলিনা যা বলল তাতে বিলের মাথায় বজ্রপাত! কাল রাতে আন্ট পার্কারের স্ট্রোক হয়েছে। টম তাকে নিয়ে মধ্যরাতে হাসপাতালে গেছে পাশের শহরে। বিলের সাথে দেখা হলে ওকে বলতে বলে গেছে।
বিল জান হাতে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ুলো। গিয়ে দেখে টম মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। প্রচুর টাকার দরকার চিকিৎসায়। টম থাকলো মায়ের কাছে। বিল ফিরে এসে ফ্যাক্টরির হেডের সাথে দেখা করতে গেল। তাকে জানালো তার এবং টমের বেশ কিছু টাকা আর ছুটি দরকার। হেড তেড়ে মারতে এলেন। জানালেন দান-সদকা-খয়রাত করতেই তিনি বসেননি এখানে। কাজ হবে, বেতন পাবে। ছুটি-ফুটি মিলবে না। মগের মুল্লুক পেয়েছে সব!
বিলকে কাজে লেগে যেতে হল। সে একেক করে কাজ সারছে আর চিন্তা করছে কিভাবে টাকা ও ছুটি দুটোই ম্যানেজ করা যায়। ফ্লোরে ঘুরে বেড়াতে লাগলো বিল। তার কাছে জন, টিম, স্যাভান্না, রনি, মায়া, সারা সবাই একে একে আন্ট পার্কারের কথা জিজ্ঞেস করছে। এই সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা একে অপরের ব্যাপারে খুবই সহানুভূতিশীল । কিন্তু তাদের কিছু করার ক্ষমতা খুবই সীমিত। কারন না আছে তাদের হাতে সময় আর না আছে তাদের কাছে অর্থ। তারা শুধু সহানুভূতিই প্রকাশ করতে পারে। বিল সবাইকেই বলল আন্ট পার্কারের অবস্থা ভালো নয়। টাকা চাই। ফ্যাক্টরিহেড কি বলেছে তাও জানালো। পরে সকলে বলল, সবার হাতে যা কিছু আছে তা তারা বিলের কাছে দিয়ে দেবে আন্ট পার্কারের জন্য। বিল রাজি হল।
কিন্তু দুপুর হতে না হতেই টম তার মায়ের লাশ নিয়ে ফিরে এলো। চলে গেছেন আন্ট পার্কার। বিলকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে টম। বিলেরও চোখের পানির কমতি নেই। সবাই বেরিয়ে এসে বাইরে দাড়িয়ে আছে। ফ্যাক্টরিহেড এসে দেখে সবাইকে ধমকে কাজে পাঠিয়ে দিল। বিলকেও কাজে যাবার জন্য ধমক দিতেই বিল ঘুসি মেরে বসলো তার ইমিডিয়েট বসকে। হেড বিলকে পদচ্যুত করল।
বিল ঠিক করল আর নয়। মানুষের জীবন যাপন করতে হলে তাদের নিজেদের অধিকার আদায় করতে হবে। সেজন্য দরকার হলে আন্দোলন করতে হবে। শুধু সে একা নয়, সবাই আছে তার সাথে। আর নয়!
সেসময় বিলের কর্মক্ষেত্র শিকাগো শিল্পায়নের অন্যতম কেন্দ্র। গড়ে দেড় ডলারের বিনিময়ে সপ্তাহে ছয়দিন চৌদ্দ-ষোল ঘন্টা কলুর বলদের মত পরিশ্রম করা বিলের মত হাজার হাজার মানুষগুলো যেন পাগল হয়ে গেল। তারা শুধু শ্রমিক থেকে মানুষ হবার দাবি জানাল।
আমেরিকার শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, উইসকনসিন এবং বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে ওঠে সংঘবদ্ধ আন্দোলন। ১৮৮৪ সালের অক্টোবরে আমেরিকার ‘ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস এন্ড লেবার ইউনিয়নস’ এর এক বৈঠকে ৮ ঘণ্টা কাজের সময় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর আমেরিকার বিভিন্ন লেবার ইউনিয়নের সম্মতিক্রমে ১৮৮৬ সালের মে মাসের ১ তারিখে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। দাবি ছিল একটাই, দৈনিক ৮ ঘন্টার বেশি কাজ আর নয়।
ধর্মঘটের বিপক্ষে মালিকপক্ষ আন্দোলনকে মোকাবেলা করতে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের গ্রেফতার করে। এ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রমিকদের উপর নির্যাতন করতে থাকে। মালিকপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া ১৪-১৬ ঘণ্টা কাজের বেড়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে প্রাণপণ লড়াই করে শ্রমিকরা। ১৯৮৬ সালের মে মাসের ১-৩ তারিখ পর্যন্ত এই আন্দোলন চলমান ছিল।
এরপর শিকাগোর বিক্ষোভরত শ্রমিকদের উপর চড়াও হয় পুলিশরা। শিকাগোর ম্যাককরমিক হারভেস্টিং মেশিন কোম্পানির সামনে পুলিশ গুলি চালায় শ্রমিকদের উপর। শত শত শ্রমিক আহত হয়, নিহত হয় দুই জন। এই হতাহতের কারণে শ্রমিকরাও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এর পরের দিন হাজার হাজর শ্রমিকরা আন্দোলনের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে শিকাগোর 'হেমার্কেট স্কয়ারে' সমবেত হন।
সেদিন সাতজন পুলিশ ও চারজন শ্রমিক নিহত হয়।শতাধিক শ্রমিক হতাহত হয়। ইতিহাসে এই দিনটির নাম হয় 'হে মার্কেট স্কয়ার ম্যাসাকার'।
এরপর মার্কিন সরকার শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সাতজনকে মৃত্যুদন্ড আর একজনকে পনেরো বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
যদিও আমেরিকার সরকার এই ঘটনার কোনো স্বীকৃতি দেয়নি এবং শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজের দাবিকেও গুরুত্ব দেয়নি। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে আমেরিকা আটঘণ্টা কাজের দাবিকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। ১৯১৭ সালে দ্বিতীয় নিকোলাসের পতনের চারদিন পর আমেরিকা সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে ‘দিনে আট কর্মঘণ্টা’র স্বীকৃতি দেয়।
১৯১৭ সালের পর থেকেই সোভিয়েত ক্ষমতাবলয়ে থাকা দেশগুলোতে মে মাসের ১ তারিখে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বেশ জাকজমকতার সঙ্গে পালন করা শুরু হয়। সোভিয়েত পতনের পরে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক দেশেই এখন আর মে দিবস পালন না করা হলেও আজও বিশ্বের আশিটি দেশে এই দিন সরকারি ছুটি হিসেবে চিহ্নিত।
সেদিন আমাদের গল্পের বিলের মত আরও যাদের আত্মত্যাগে এই দিবসটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- অগাস্ট স্পাইজ, অ্যালবার্ট পার্সন্স, অ্যাডলফ ফিশার, জর্জ এঙ্গেল এবং লুই লিং।
তাদের এই আত্মত্যাগকে স্মরণ করেই ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১লা মে-কে 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার পরও আজও আমরা আমাদের দেশের শ্রমিকদের কষ্টের গল্প অহরহই শুনে থাকি। তাই এই মহান দিনে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তিই হোক আমাদের একান্ত কাম্য।



পাঠকের মন্তব্য