মে দিবস: যন্ত্র থেকে মানুষ হওয়ার লড়াই

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৩৬ মিনিট আগে

আজ বিলের মেজাজটা খুবই খারাপ। আজ তার অনেক পরিশ্রম হয়েছে, একই সঙ্গে তাকে বড় বড় কিছু ঝক্কিও সামলাতে হয়েছে। আজ হেড অফিস থেকে মালিকের খাস কর্মচারীরা এসেছিল ফ্যাক্টরির বার্ষিক পরিদর্শনে। তাদের নানা ফাইফরমাশে জীবন অতিষ্ঠ তার। নিজের কাজেরই কোনো কমতি নেই তার, ওদিকে এসব ঝামেলা।

বিল এই ফ্যাক্টরির ফ্লোর ম্যানেজার। কী গালভরা শব্দ! কিন্তু তা ওই শব্দেই সীমাবদ্ধ। কাজ তার মজুরের মতো। সারাদিন তাকে ফ্লোরে হেঁটে বেড়াতে হয়। পুরো ফ্লোরে একটিমাত্র চেয়ার আর একটি টেবিল। এগুলো তার জন্যই রাখা। কিন্তু তাতে তার বসার কোনো উপায় নেই। কারণ টেবিলটার ওপর স্তুপীকৃত থাকে ডাই ডাই কাপড়, আর চেয়ারটাকে আর দেখাই যায় না হিসাবের খাতার স্তুপে।

অবশ্য বসার সময়ও তার হয় না। সারাদিন এই বিশাল ফ্লোরে কাজ করা শ’ তিনেক মানুষ কোনো না কোনো ভুল করেই যেতে থাকে, আর তাকে সেগুলো সমাধান করে ফেলতে হয়। কাজ জমিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই। আজকের কাজ এবং আজকের সমস্যা আজকেই সমাধান করতে হবে, নইলে শিপমেন্টে দেরি হবে। সেটা হলেই শিপমেন্ট ক্যানসেল আর ফ্যাক্টরির লস। এই পুরো কর্মকাণ্ডের সম্পূর্ণ দোষ বর্তাবে ফ্লোর ম্যানেজার তথা বিলের ওপর। বিলের মাঝে মাঝে মনে হয়, যখন সে ডিউটি করে তখন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস যদি আপনা থেকেই না চলত, তবে সে মারা পড়ত। কারণ ডিউটি আওয়ারে সে দম ফেলার বা নেওয়ার ফুরসতটুকুও পায় না।

তার ডিউটি আওয়ার প্রায় পনেরো-ষোল ঘণ্টা। ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে সে বাসায় যায়। সে একা মানুষ। এত ক্লান্তি জমিয়ে সে বাসায় যায় যে, অনেকদিন বাসায় গিয়ে বিছানায় একটু বসে আর অবাক হয়, দেখে যখন পরদিন সকালে তার ঘুম ভাঙে। সেই বসা থেকে কখন শুয়েছে, কখন ঘুমিয়েছে, কখন সকাল হয়ে আবার ফ্যাক্টরির ঘণ্টাও বাজতে লেগেছে, সে কিছুই জানে না। মাসের পনেরো-বিশ দিন এভাবেই না খেয়ে-ধুয়েই পার হয়ে যায় তার। মানুষের জীবন নয় তাদের কারখানাবাসীদের, যন্ত্রের জীবন।

পাশের বাড়িতে বিলের ছোটবেলার বন্ধু টম থাকে তার মাকে নিয়ে। বিলকে নিজের আরেকটা ছেলেই মনে করেন টমের মা। বিলও আন্ট পার্কার বলতে অজ্ঞান। প্রতিদিন সকালের নাশতা তাদের বাসাতেই করতে হয় বিলকে। নয়তো আন্ট ছাড়েন না।

তাদের এই এলাকায় যারা বাস করে তারা হতদরিদ্র। সবাই প্রায় কারখানা শ্রমিক। তাদের দৈনন্দিন কাজের ঘণ্টার তুলনায় মজুরি শূন্য প্রায় বলা চলে। যাদের জাতে থাকা মানুষরা তাদের মানুষ বলেই মনে করে না, তাই তাদের জীবন প্রায় পশুর মতো। সদাই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তবুও আন্ট তাকে নাশতা না খাইয়ে ছাড়েন না। বলেন,

এখন তোকে না খাইয়ে রেখে মরলে পরে তোর মাকে কী জবাব দেব রে আমি, ছোড়া? তার চেয়ে হোমওয়ার্ক করে যাওয়া ভালো, যাতে তোর মা কিছু উল্টোপাল্টা বললেই মুখে ঝামা ঘষে দিতে পারি।

আন্ট পার্কার আর তার মা ছিলেন শৈশবের বান্ধবী। মা ওপারে চলে গেছেন, তবু বিল আন্ট পার্কারের জন্য কখনোই মায়ের অভাব বোধ করে না।

আজ টমদের বাসায় ঢুকেই বিল যথারীতি ‘আন্ট’ বলে চেঁচিয়ে ডাকল। কিন্তু আজ সারা বাড়িতে কোনো শব্দ নেই। বিল একে একে ঘর দুটো ঘুরে দেখল, কেউ নেই। বাইরে বেরিয়ে ছোট্ট পলিনাকে খেলতে দেখে ডেকে জিজ্ঞেস করল সে জানে কিনা টমরা কোথায় গেছে। পলিনা যা বলল, তাতে বিলের মাথায় যেন বজ্রপাত।

কাল রাতে আন্ট পার্কারের স্ট্রোক হয়েছে। টম তাকে নিয়ে মধ্যরাতে পাশের শহরের হাসপাতালে গেছে। বিলের সঙ্গে দেখা হলে বলতে বলে গেছে।

বিল জান হাতে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ালো। গিয়ে দেখে টম মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। চিকিৎসায় প্রচুর টাকার দরকার। টম থাকল মায়ের কাছে। বিল ফিরে এসে ফ্যাক্টরির হেডের সঙ্গে দেখা করতে গেল। তাকে জানাল তার এবং টমের জন্য কিছু টাকা আর ছুটি দরকার। হেড তেড়ে মারতে এলেন। জানালেন, দান-সদকা-খয়রাত করতে তিনি বসেননি এখানে। কাজ হবে, বেতন পাবে। ছুটি-ফুটি মিলবে না। মগের মুল্লুক পেয়েছে সব।

বিলকে কাজে লেগে যেতে হলো। সে একে একে কাজ সারছে আর চিন্তা করছে কীভাবে টাকা ও ছুটি দুটোই ম্যানেজ করা যায়। ফ্লোরে ঘুরে বেড়াতে লাগল বিল। তার কাছে জন, টিম, স্যাভান্না, রনি, মায়া, সারা সবাই একে একে আন্ট পার্কারের কথা জিজ্ঞেস করছে। এই সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা একে অপরের ব্যাপারে খুবই সহানুভূতিশীল। কিন্তু তাদের কিছু করার ক্ষমতা খুবই সীমিত। কারণ না আছে তাদের হাতে সময়, না আছে অর্থ। তারা শুধু সহানুভূতিই প্রকাশ করতে পারে। বিল সবাইকেই বলল আন্ট পার্কারের অবস্থা ভালো নয়, টাকা চাই। ফ্যাক্টরি হেড কী বলেছে তাও জানাল। পরে সকলে বলল, সবার হাতে যা কিছু আছে, তা তারা বিলের কাছে দিয়ে দেবে আন্ট পার্কারের জন্য। বিল রাজি হলো।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৩৬ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top