বিদেশিনী, যাকে আগে থেকেই চিনতেন কবি

পঠিত ... ২ ঘন্টা ২৯ মিনিট আগে

 

দ্যাখেন, সব চেনা জিনিসের মধ্যেই একটা ক্লান্তি আছে। পরিচিত গলি, প্রতিদিনের ডাল-ভাত আর চেনা মানুষের ভিড়ে মন যখন একটু হাপিয়ে ওঠে, তখন মানুষ একটা অচেনার নেশায় পড়ে। ১৮৯৫ সালের কথা, শিলাইদহে বসে ৩৪ বছরের এক যুবক ঠিক এই নেশাতেই পড়েছিলেন। না, কোনো রক্ত-মাংসের মানসী তখন তার সামনে ছিল না। ছিল শুধু একটা সুর আর ছোটবেলায় শোনা আবছা একটা লাইন, তোমায় বিদেশিনী সাজিয়ে কে দিলে! ওই এক লাইনেই তার মগজের ভেতর কে যেন স্ক্র্যাচ কাটছিল।

সুর ভাঁজতে ভাঁজতে হুট করে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী। কী অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, তাই না? যাকে কোনোদিন চোখে দেখেননি, যার ঠিকানাও জানা নেই, তাকেই কি না অবলীলায় বলে দিচ্ছেন চিনি! আসলে এই চিনি মানে তো ভোটার আইডির পরিচয় না, এ হলো আত্মার এক সিগন্যাল। কবি কল্পনা করলেন এক সিন্ধুপারের নারী, যে শারদ প্রাতে কিংবা মাধবী রাতে হৃদয়ের একদম মাঝখানে এসে উঁকি দেয়। গানটা যখন লেখা হচ্ছে, তখন ওটা ছিল কেবলই এক আকাশকুসুম কল্পনা আর মিউজিকের কারসাজি। সুরের জাদুতে একটা কাল্পনিক চরিত্রকে তিনি জ্যান্ত করে তুললেন। তখন কে জানত, এই গানের লিরিকগুলো আসলে একটা অগ্রিম বুকিং? মহাকাল যে পর্দার আড়ালে হাসছে, সেটা কবির কল্পনাতেও ছিল না।

গল্পের পরের চ্যাপ্টারটা কিন্তু একদম সিনেমার মতো, কোনো চিত্রনাট্যকারও হয়তো এমন করে লিখতে পারতেন না। গান লেখার প্রায় ৩০ বছর কেটে গেছে।

১৯২৪ সাল।
সেই যুবক এখন বিশ্বকবি, সাদা দাড়ি আর ঋষির মতো চেহারায় এক জ্যান্ত মিথ। শরীরটা একটু বিগড়ে যাওয়ায় আর্জেন্টিনা গিয়ে আটকা পড়লেন। সেখানেই সিন ধরা দিল সেই বিদেশিন, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো।

কী এক অদ্ভুত কারবার দেখেন! ৩০ বছর আগে গানে কবি লিখেছিলেন, ভুবন ভ্রমিয়া শেষে, আমি এসেছি নূতন দেশে, আমি অতিথি তোমারি দ্বারে। সেই কাল্পনিক লিরিক একদম থরে থরে মিলে গেল ওকাম্পোর বাড়ির ড্রয়িংরুমে। ওকাম্পো ছিলেন কবির অন্ধ ভক্ত, আর কবি তাকে আদর করে নাম দিলেন বিজয়া। তাদের সেই সম্পর্কটা ছিল শরীরের ঊর্ধ্বে, এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক কানেকশন। অনেকে একে প্ল্যাটোনিক প্রেম বলে তকমা দেয়, কিন্তু ব্যাপারটা ছিল আরও নিবিড়। রবীন্দ্রনাথ তার পূরবী কাব্যগ্রন্থটা এই বিদেশিনীকেই উৎসর্গ করে দিলেন।

আসলে প্রকৃতি মাঝে মাঝে এমন রসিকতা করে; কবি আগে কল্পনা দিয়ে একটা ছাঁচ বানিয়ে রেখেছিলেন, আর তিন দশক পর নিয়তি সেই ছাঁচে ওকাম্পোকে বসিয়ে কবির সামনে হাজির করল। গানটা আর শুধু গান থাকল না, হয়ে গেল এক জীবন্ত ভবিষ্যৎবাণী। ওই যে বললেন না, চিনি গো চিনি তোমারে, সেই চেনার বৃত্তটা যেন ওকাম্পোর সান্নিধ্যে এসে পূর্ণতা পেল। একটা গান কীভাবে কয়েক হাজার মাইল দূরের কোনো মানুষের ভাগ্যরেখার সাথে মিলে যায়, সেটা ভাবলে আজও মাথার তার ছিঁড়ে যাওয়ার জোগাড় হয়।

পঠিত ... ২ ঘন্টা ২৯ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top