১
আকাশে বিশাল একটা চাঁদ উঠেছে। বৈশাখী পূর্ণিমার চাঁদ। এই চাঁদের একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে, মানুষকে উদাস করে দেওয়া। কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদের ছাদে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যুবক। তাঁর নাম সিদ্ধার্থ। তাঁর চারদিকের জীবনটা রূপকথার মতো। সোনার থালায় খাবার আসে, নূপুরের নিক্বণে রাত কাটে। বাবা তাঁর জন্য তিনটি আলাদা প্রাসাদ বানিয়ে দিয়েছেন; শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষার জন্য। দুঃখ যেন তাঁকে ছুঁতে না পারে, সেই জন্য প্রাসাদের চারদিকে লোহার দেয়াল।
সিদ্ধার্থের মনে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল। তিনি ভাবছিলেন, এই যে রাজত্ব, এই যে মখমলের বিছানা, এসবই কি সব? নাকি এর বাইরেও অন্য কিছু আছে?
তিনি লুকিয়ে বাইরে গিয়েছিলেন কয়েকবার। গিয়েই যা দেখলেন, তাতে তাঁর মগজ ওলটপালট হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, মানুষ বুড়ো হয়, শরীরে চামড়া ঝুলে যায়। মানুষ অসুস্থ হয়, ব্যথায় নীল হয়ে কাতরায়। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য, মানুষ মারা যায়। চারজন মানুষ একটি কফিন নিয়ে যাচ্ছে, পেছন পেছন স্বজনেরা কাঁদছে।
সিদ্ধার্থের মাথায় একটা প্রশ্ন আটকে গেল। জন্ম নিলেই কি মরতে হবে? এই যে জরা, এই যে জরাগ্রস্ত জীবন, এ থেকে কি মুক্তির কোনো উপায় নেই?
পূর্ণিমার সেই মায়াবী জ্যোৎস্নায় তিনি যখন নিজের ঘরে ফিরলেন, দেখলেন তাঁর স্ত্রী যশোধরা আর শিশুপুত্র রাহুল অঘোরে ঘুমাচ্ছে। কী সুন্দর এক মায়া! কিন্তু সিদ্ধার্থ জানতেন, এই মায়া আসলে এক ধরনের মরীচিকা। তিনি আলতো করে মায়া ছিন্ন করলেন। মধ্যরাতে ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশ্যে।
তিনি কোনো মাজার বা মন্দিরে যাওয়ার জন্য বের হননি। তিনি বের হয়েছিলেন মানুষের যন্ত্রণার লজিক খুঁজতে। আকাশে তখন চাঁদটা হাসছে। এই হাসিতে কোনো বিদ্রূপ নেই, আছে এক গভীর রহস্য। সিদ্ধার্থ জানতেন, আজ থেকে তিনি আর রাজকুমার নন। আজ থেকে তিনি একজন যাযাবর, যার কোনো ঘর নেই, আছে শুধু এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন।
মানুষটা ঘর ছাড়লেন ঠিকই, কিন্তু আসলে তিনি ফিরছিলেন নিজের ঘরের দিকে। যে ঘরের দরজা খুললে দেখা যায় জগত-ব্রহ্মাণ্ডের সব সত্য। অদ্ভুত সেই রাত, আর অদ্ভুত সেই মানুষ! পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় তিনি হারিয়ে গেলেন এক অনির্দিষ্ট গন্তব্যে, যেখানে কোনো রাজত্ব নেই, আছে শুধু নিজেকে চেনার এক কঠিন সাধনা।
২
বুদ্ধগয়া বলে একটি জায়গা আছে। সেখানে একটি বিশাল অশ্বত্থ গাছ। সিদ্ধার্থ সেই গাছের নিচে গিয়ে বসলেন। তাঁর শরীর তখন কঙ্কালের মতো। ছয় বছর তিনি না খেয়ে, রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সত্য খুঁজেছেন। শেষে বুঝলেন, শরীরকে কষ্ট দিয়ে আসলে লাভ নেই। শরীর তো স্রেফ একটা খোলস। আসল খেলাটা চলছে মগজের ভেতর।
আকাশে সেদিনও ঠিক আজকের মতোই মায়াবী এক পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল। সিদ্ধার্থ ধ্যানে বসলেন। চারদিকে গভীর নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে তাঁর মনে কত রকমের চিন্তা আসতে লাগল, কত মায়া, কত তৃষ্ণা! কিন্তু তিনি নড়লেন না। তিনি বুঝতে চাইলেন, মানুষের এই যে মন, এত ছটফট করে কেন? এত কেন চায়?
ভোরের আলো যখন গাছের পাতায় এসে পড়ল, সিদ্ধার্থের মুখে তখন এক অপার্থিব হাসি। তিনি পেয়ে গেছেন সেই প্রশ্নের উত্তর। তিনি বুঝলেন, মানুষ আসলে নিজের ইচ্ছার জালে নিজেই বন্দি। এই চাওয়া বা তৃষ্ণা যখন শেষ হয়ে যায়, তখনই মানুষ হয় মুক্ত। সিদ্ধার্থ তখন আর রাজকুমার সিদ্ধার্থ নন; তিনি হয়ে গেছেন বুদ্ধ, অর্থাৎ এক জাগ্রত মানুষ।
বাকি জীবনটা তিনি স্রেফ মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ালেন। কারো হাতে মিরাকল তুলে দিলেন না, বরং শিখিয়ে দিলেন কীভাবে নিজেকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে করুণা করতে হয়। তিনি বলতেন, তুমি নিজেই নিজের প্রদীপ হয়ে জ্বলো। এর চেয়ে বড় সত্য আর কী হতে পারে?
আশি বছর বয়স যখন হলো, সেই একই বৈশাখী পূর্ণিমার দিন তিনি এসে থামলেন কুশীনগরে। শরীরটা ক্লান্ত। তিনি জানতেন, তাঁর সময় শেষ হয়ে আসছে। এক জোড়া শালগাছের নিচে তাঁর বিছানা পাতা হলো। চারদিকে তাঁর শিষ্যরা কাঁদছে, বিশেষ করে আনন্দ। আনন্দের চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে।
বুদ্ধ খুব শান্ত গলায় বললেন, আনন্দ, কেঁদো না। সবকিছুই নশ্বর। যে জন্মেছে, তাকে মরতে হবে, এটাই তো মহাজাগতিক নিয়ম। তুমি বরং নিজের মুক্তির জন্য চেষ্টা করো।
পূর্ণিমার সেই হলুদ জোছনা যখন শালবনের ওপর এসে পড়ল, বুদ্ধ তখন খুব ধীরে চোখ বুজলেন। কোনো হাহাকার নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। একটি প্রদীপের তেল ফুরিয়ে গেলে যেমন সে শান্ত হয়ে নিভে যায়, তিনিও তেমনি নিভে গেলেন।
মানুষটা চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেলেন এক অদ্ভুত শান্তি। যে শান্তিতে ঈশ্বর নেই, কিন্তু মানুষ আছে। যে শান্তিতে মৃত্যু মানে ভয় নয়, বরং এক অনন্ত প্রশান্তি। সেই একই চাঁদের আলো আজও পৃথিবীতে পড়ে, আর মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনের সার্থকতা আসলে নিজেকে চেনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।



পাঠকের মন্তব্য