সারা বছর আমরা একই করিডোরে হাঁটি, একই ডাইনিং টেবিলে ভাত খাই, অথচ আমাদের মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য বার্লিন ওয়াল খাড়া হয়া থাকে। আব্বা ড্রয়িংরুমে থাকলে আমরা বেডরুমে ঢুকি, আব্বা টিভি দেখলে আমরা বারান্দায় গিয়া সিগারেট লুকাই। এই যে একটা আজব ক্যাট অ্যান্ড মাউস গেম, এই গেমটার বিরতি আসে কেবল বছরে দুইবার। আর রোজার ইদ হইলো সেই ফাইনাল ম্যাচ, যেখানে সব ইগো আর সব সাইলেন্স হার মাইনা যায়।
নামাজের ময়দানে যখন হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে সাদা পাঞ্জাবি পরা ওই বুড়ো লোকটার সামনাসামনি হওয়া লাগে, তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ড্রাম বিট বাজে। সারা বছর যে লোকটার চোখের দিকে তাকাইয়া কেমন আছেন বলার সাহস হয় না, ইদের নামাজ শেষে তার ঘাম আর সস্তা আতরের তিব্র ঘ্রাণওয়ালা পাঞ্জাবিতে মুখ ঘষার যে তিন সেকেন্ড,ঐটাই হইলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রিকনসিলিয়েশন। ওই তিন সেকেন্ডের কোলাকুলিতেই ডিলিট হয়া যায় সারা বছরের সব আনসেড অভিমান, সব অপ্রাপ্তি আর সব মেকি গাম্ভীর্য। পাঞ্জাবির খসখসে কাপড়টা যখন গালে লাগে, তখন মনে হয় দুনিয়ার সব বড় বড় ফিলোসফি আসলে তুচ্ছ; এই লোকটার কাঁধের হাড়ের অস্তিত্বটাই আমাদের আসল ব্যাকরণ।
নামাজ পইড়া জুতা পায়ে যখন বাপের লগে পাশাপাশি হাঁইটা বাসায় ফিরি, তখন মনে হয় রাস্তাটা যেন শেষ না হয়। বাসায় আইসা ডাইনিং টেবিলে আব্বার লগে বইসা ওই যে প্রথম বাটি সেমাইটা খাওয়া,এর চেয়ে সুন্দর মুহুর্ত আর কিছু হইতে পারে না। আব্বা চামচ দিয়া সেমাই নাড়তে নাড়তে যখন হালকা গলায় জিজ্ঞেস করে, পাঞ্জাবিটা কি টাইট হইছে? ঐ একটা সাধারণ বাক্যের ভেতরেই লুকাইয়া থাকে হাজারটা কবিতা। আমরা বুঝি, এই গম্ভীর লোকটার ভেতরেও একটা বিশাল সমুদ্র আছে, কিন্তু সে কেবল ঢেউ দেখাইতে জানে না।
রোজার ইদ মানে আমাদের কাছে নতুন জামার সুগন্ধ না, ইদ মানে হইলো ওই কড়া মেজাজের লোকটার লগে কয়েক মুহূর্তের লাইগা হইলেও একটা ডিস্ট্যান্সহীন সেলফি তুলবার সুযোগ পাওয়া। যেখানে হাসিটা লৌকিকতার চেয়েও বেশি অর্গানিক। বাপের পকেটে টাকা থাকুক বা না থাকুক, ইদের দিন সে যখন জায়নামাজ বগলে নিয়া হাঁটে, তখন তাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সম্রাট মনে হয়। আর সেই সম্রাটের একমাত্র উত্তরাধিকারী হইলো তার ওই অবাধ্য, উড়নচণ্ডী ছেলেটা, যে কি না কেবল এই একটা দিনেই নিজের বাপের লগে ঠিকঠাক মতন কোলাকুলি করার পারমিশন পায়।



পাঠকের মন্তব্য