আ... আ... আ... আই লাভ ইউ: এক গ্লোবাল সাপ্লাই

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে

শুরুটা ধরেন সেই ধূসর সময়ের, যখন মানুষের হাতে স্মার্টফোন ছিল না; ছিল ধারালো তলোয়ার আর ভারী বর্ম। তখন ভালোবাসা ছিল একটা গোপন ইবাদতের মতো। ইউরোপের দিকে তাকালে দেখবেন, তখন চলছে কোর্টলি লাভ-এর জমানা। কবিরা প্রেমিকার চুল আর চোখের বর্ণনা লিখতে লিখতে দিস্তা দিস্তা কাগজ শেষ করে ফেলতেন, কিন্তু সরাসরি ওই ‘আই লাভ ইউ’ টাইপ ডিরেক্ট হিট করার সাহস কারও ছিল না। কেন ছিল না? কারণ তখন প্রেম মানে ছিল একটা দূরত্ব, একটা হাহাকার। আপনি জানালার নিচে দাঁড়িয়ে গিটার বাজাবেন, প্রেমিকা ওপর থেকে একটা রুমাল ফেলে দেবে। বাস, ওটাতেই আপনার জীবন ধন্য। ওই লাভ শব্দটা তখনও এত সস্তা হয়ে যায়নি যে হাটে-ঘাটে বিলি করবেন। ওটা ছিল একটা গাম্ভীর্যের চাদর।

এরপর সময় গড়াল। জাহাজ ভাসল সাগরে, এক দেশের ভাষা গিয়ে মিশল অন্য দেশে। ইংরেজি ভাষার ওই ‘আই’ মানে আমি, ‘লাভ’ মানে ভালোবাসা আর ‘ইউ’ মানে তুমি। এই তিনটা খণ্ড যখন জোড়া লাগল, তখন তৈরি হলো একটা ভয়ংকর সরল রেখা। আগেকার মানুষ যেখানে দশ বছর অপেক্ষা করত একটা সম্মতির জন্য, সেখানে এই বাক্যটা এসে সব সহজ করে দিল। যেন একটা জাদুর চাবি, তালা খুললে জান্নাত, না খুললে আদালত। কিন্তু আসল মজাটা শুরু হলো যখন এই পশ্চিমা শব্দগুলো আমাদের এই তপ্ত বাংলার মাটিতে পা রাখল। আমাদের এখানে তো আবার পরোক্ষতার কারবার বেশি। আমরা ‘ভালোবাসি’ বলার চেয়ে “একসাথে বৃষ্টিতে ভিজবি?” বলাটাকে বেশি যুৎসই মনে করতাম।

পুনশ্চ: এই যে আমরা এখন কথায় কথায় আই লাভ ইউ বলি, এটা আসলে একটা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের অংশ। হলিউড আর পপ মিউজিক এসে আমাদের শেখাল যে ভালোবাসা মানেই হলো বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে বলা। আগেকার দিনে মানুষ যেখানে চোখের ভাষায় মহাকাব্য লিখে ফেলত, এখন সেখানে স্টিকার আর ইমোজিতে সব সয়লাব। ১৯৬০-এর দশকে যখন ‘মেক লাভ, নট ওয়ার’ স্লোগানটা উঠল, তখন থেকে এই শব্দটা হয়ে গেল একটা প্রতিবাদের ভাষা, আবার একই সঙ্গে একটা ক্লান্তির আশ্রয়।

এখনকার কারবারটা দেখেন, পৃথিবীর একেক কোণে একেক স্বাদ। ফরাসিরা যখন ‘জ্য তেম’ বলে, তখন মনে হয় যেন গ্লাসে করে দামি কোনো পানীয় ঢালছে। স্প্যানিশদের ‘তে আমো’ শুনলে মনে হয় কোনো তেজি ঘোড়া মরুভূমি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আবার উল্টো দিকে তাকান, ওই যে জাপানিরা, তারা ‘আইশিতেরু’ বলতে গেলে এখনও দশবার আকাশ-পাতাল ভাবে। কারণ তারা জানে, শব্দ যখন বেশি খরচ হয়ে যায়, তখন তার ওজন কমে যায়। অতিরিক্ত বয়ান মানেই হলো অনুভূতির অপচয়।

এই যে বাংলা ভাষায় আমরা আমি তোমাকে ভালোবাসি বলি, এর মধ্যে একটা অদ্ভুত মায়া আছে। এটা অনেকটা আমাদের ভাতের থালার মতো, খুবই সাধারণ কিন্তু অতি প্রয়োজনীয়। এখনকার জমানায় কেউ ‘আই লাভ ইউ’ বলে টেক্সট পাঠালে অপরপক্ষ যখন ‘সারাংহে’ বা ‘তি আমো’ বলে রিপ্লাই দেয়, তখন বোঝা যায় পৃথিবীটা আসলে একটা গোল গোলকধাঁধা। আমরা সবাই আসলে একই অনুভূতির আলাদা আলাদা অনুবাদ খুঁজছি।

শেষে কথা একটাই, এই তিনটা শব্দ আসলে একটা আয়না। আপনি যখন কাউকে এটা বলেন, আপনি আসলে নিজের ভেতরের শূন্যতাটাকেই তার সামনে মেলে ধরেন। কেউ এটা দিয়ে ঘর বাঁধে, কেউ বা স্রেফ সময় কাটায়। তবে মনে রাখবেন, শব্দটা ইংরেজি হোক বা হিব্রু, ওই যে হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানি, ওটার কোনো অনুবাদ হয় না। ওটা আদিম, ওটা অকৃত্রিম। মায়া কাটানো সহজ, কিন্তু মায়ার বয়ান লেখা খুব কঠিন ভাই!

ঘটনা আপাতত এখানেই ইতি। প্রেম চলুক, শব্দ বেঁচে থাকুক!

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top