ইউনূসের আশা ও আশাভঙ্গের দিনগুলো

২৭৬ পঠিত ... ১৫:০৯, মে ০২, ২০২৬

জুলাই বিপ্লবী ছাত্রছাত্রীদের একান্ত আগ্রহে বুকে পাথর বেঁধে ড. মুহম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বাধ্য হয়েছিল এস্টাবলিশমেন্ট। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নেতা আসিফের বক্তব্যে এরকম ধারণা উঠে এসেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মাইক্রো ক্রেডিটের ধারণা নিয়ে পাশের দেশ ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তান, আফ্রিকা, লাতিন এমেরিকা, এমেরিকায় সফল সব প্রকল্প আমরা দেখেছি। তার সামাজিক ব্যবসা সূত্রটি জার্মানিকে কেন্দ্র করে ইউরোপের দেশে দেশে সাফল্যের মুখ দেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ইউনূসের মাইক্রোক্রেডিট ও সামাজিক ব্যবসার ধারণার শতছিদ্র নিয়ে আলোচনা রয়েছে। পৃথিবীর একমাত্র অণুবীক্ষণ যন্ত্রটি খুব সম্ভবত আমাদের জনপদে রয়েছে।

বাংলাদেশে জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আশি ও নব্বুই দশকের ক্ষমতাকালে ড. ইউনূস প্রতিটি সরকারের সহযোগিতা পেয়েছেন। কিন্তু ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাবার পর ইউটোপিয়ান নাগরিক সমাজের উদ্দীপনায় তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করলে; রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ তার শত্রু হয়ে ওঠে। আমাদের ভিলেজ পলিটিক্সে গ্রামের কোনও শিক্ষক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে চাইলে পঞ্চায়েতের লোকেরা তাকে গালি দিয়ে ভূত ছুটিয়ে দেবার কালচার প্রচলিত রয়েছে। অধ্যাপক ইউনূসের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। স্বয়ং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তার কালচারাল উইং তাকে দেড় দশক ধরে গালাগাল করেছে।

কিন্তু মানুষ যাকে ভয় পায়, তাই তার নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে জুলাই বিপ্লবের পর এতে নেতৃত্বদানকারী তরুণেরা প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করে বসে। অন্যান্য উপদেষ্টার নাম এস্টাবলিশমেন্টের কাছ থেকেই আসে। ড. ইউনূস একটি দুটি নাম এতে যুক্ত করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যাত্রা শুরু করেন।

লিশ বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা হাসিনার নির্দেশে জুলাই বিপ্লবে স্বদেশের মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ায়; আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে কাজ করতে হয়েছে ইউনূস প্রশাসনকে। ভঙ্গুর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে প্রায় প্রতিদিনই প্রতিবিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নানা রং-এর লীগ রাজপথে নেমেছে। আর জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধে বিন্দুমাত্র অনুশোচনাহীন আওয়ামী লীগবর্তী কালচারাল উইং ইউনূসকে গালি দিয়ে ভিলেজ পলিটিক্সের ধারা অব্যাহত রেখেছে।

আওয়ামী লীগের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম এ মোমেন বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, দিল্লি আছে তো আমরা আছি। জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষিতে ভারতে পালিয়ে গিয়ে শেখ হাসিনা ও তার অনুসারীরা সেই ভালোবাসার যৌথ খামারের ধারণাকে প্রতিপাদিত করেছেন। ভারতের প্রয়াত নেতা প্রণব মুখার্জির আত্মজৈবনিকে তিনি এক এগারো ঘটিয়ে হাসিনার শাসনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তৈরির মোহন গল্পটি বলেছেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের আধিকারিক সুজাতা সিং ঢাকায় এসে বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের হস্তক্ষেপের নন্দন নৃত্যের ছবি এঁকে গেছেন। ফলে জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পতনে ভারতের ছায়া উপনিবেশ হারিয়ে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে দেশটির ক্ষমতা-কাঠামো। ভারতের গদি মিডিয়া তখন ইউনূসের মাথায় টুপি পরিয়ে তাকে তা-লে-বা-ন বলে তকমা দেয়। প্রায় এক দশক ধরে হিন্দুত্ববাদী সরকারের ভারত ইউনূসের মতো লিবারেলকে ইসলামপন্থীর তকমা দিলে বিশ্বমিডিয়ায় কৌতুকের সঞ্চার হয়।

বিশ্ব পরিমণ্ডলে ড. ইউনূসের পরিচিতি; ভারতের মিডিয়ার আকাশ কুসুম প্রোপাগান্ডাকে পরাজিত করে। ফলে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বুদ্ধিজীবীরা জুলাই বিপ্লবকে ইসলামপন্থিদের বিপ্লব বলে যে তকমা দিয়েছে, তা অকার্যকর হয়ে গেছে ড. ইউনুসের পরিচিতি ও ভাবমূর্তির কারণে।

ড. ইউনূসের প্রশাসনের প্রতিটি দিন কেটেছে ভারতীয় মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি-আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা ডিবাংক করতে আর রাজপথে নানা রং-এর প্রতিবিপ্লব লীগের ছায়ানৃত্য থামাতে।

এস্টাবলিশমেন্ট আওয়ামী লীগের প্রো এস্টাবলিশমেন্ট অংশকে সেনানিবাসে আশ্রয় দিয়েছে। তারা নিরাপদে ভারতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। দেড় দশক ধরে আওয়ামী লীগের হাতে নিঃগৃহীত বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীরা তখন হাসিনার দোসরদের গ্রেফতার করে পুলিশের হাতে দেবার দায়িত্বটি নিজেরা গ্রহণ করেছে। এর ফলে একটি গণ-বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দেড় দশক ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যে শিক্ষকেরা আওয়ামী ক্যাডার হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে শিক্ষকের দায়িত্ব ভুলে, এমনকি জুলাই বিপ্লবে যারা নিজেদের ছাত্রকে দুর্বৃত্ত আখ্যা দিয়ে তাদের জীবন বিপন্ন করেছে, এতদিন ধরে নির্যাতিত ছাত্ররা ঐ দলীয় ক্যাডার শিক্ষকদের পদচ্যুত করেছে।

আওয়ামী লীগের সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট বা প্রাধিকার বোধের জায়গা হচ্ছে; প্রতিপক্ষের লোকেদের শাস্তি বিধানের জন্য ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই’ বলবে, প্রতিপক্ষের শিক্ষক ও সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করবে। কিন্তু নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী তাদের প্রত্যেক অপক্রিয়ার বিরুদ্ধে লাঞ্ছনার প্রতিক্রিয়া নেমে এলে; তখন জাতির বিবেক হিসেবে নেমে আসবে তাদের নির্মূলের রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগী বাম রাজনীতিকদের একটি অংশ। ফলে ‘মব’ বা ‘দঙ্গল’ নামে একটি জারগন মাঠে নিয়ে আসে কোমল বাম বুদ্ধিজীবীরা। তারা ‘জঙ্গি’ শব্দটিও আওয়ামী লীগের ঠোঁটে এনে দিয়েছিলো নব্বুই-এর দশকে। আজ বিএনপির ঠোঁটে যে ‘গুপ্ত’ শব্দের কলকাকলি, এই শব্দটিও তাদের মুখে গুঁজে দিয়েছে নির্মূলের রাজনীতির রূপকার বাম রাজনীতিকদের একটি অংশ। ভোটের রাজনীতিতে যেহেতু শূন্য দশমিক এক সাত শতাংশ জনপ্রিয়তা; তাই পালা করে ক্ষমতাসীন দলকে নির্মূলের জারগন উপহার দিয়ে নিজেদের গুরুত্ব ধরে রাখে এরা।

দেড় দশকের অপকর্মের সময় আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতারাই আশঙ্কা প্রকাশ করতেন, ক্ষমতাচ্যুত হলে পিঠের চামড়া থাকবে না, লাখ লাখ লীগ কর্মী মারা পড়বে। কারণ তারা জানতেন, গুম-ক্রসফায়ার-আয়নাঘর-বে আইনি গ্রেফতারের মাঝ দিয়ে তারা যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন, ক্ষমতা চলে গেলে নির্যাতিতেরা এর প্রতিশোধ নেবে। পৃথিবীর যে কোনও অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের পর ক্ষমতাচ্যুতদের করুণ পরিণতি নেমে আসে। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর শক্তিমত্তা না থাকলেও সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে ইউনূস প্রশাসন সেরকম মাত্রায় প্রতিশোধের কুরুক্ষেত্র ঘটতে দেয়নি।

আওয়ামী লীগের দেড় দশকে যেহেতু জামায়াত ও বিএনপির লোকেরা বন্দিজীবন যাপন করেছিল; যে জীবন ছিলো এলেক্স হেইলির রুটসের কুন্তা কিন্তির মতো পায়ে শেকল বাঁধা জীবন, তাই জুলাই বিপ্লবের পর মুক্তি পেয়ে তাদের একাংশকে উন্মত্ত হয়ে উঠতে দেখেছি আমরা। তৌহিদি জনতা নেমে পড়েছে নারীর পোশাক পুলিশি ও ধর্ম পুলিশিতে। আর বিএনপি নেমে পড়েছে চাঁদাবাজিতে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার এক প্রশ্নের উত্তরে ড. ইউনূস বলেছিলেন, পনেরো বছর যেহেতু এরা নির্যাতন সয়েছে, তাই এদের সঙ্গে এত নিষ্ঠুর আমরা হতে চাইনা।

ড. ইউনূসের লক্ষ্য ছিলো রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের সংবিধান দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ঐশ্বরিক ক্ষমতা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঈশ্বর কল্পনা করে এটি লেখায়; একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান, রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার মালিক আর রাষ্ট্রপতির কাজ বিশেষ দিবসে বাণী দেওয়া, সেজেগুঁজে স্মৃতিসৌধে ও শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া আর ঈদের দিন সমাজের বিশিষ্ট লোকদের বঙ্গভবনে ডেকে সেমাই খাওয়ানো। ফলে সংবিধানটিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নেই, নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি হয়ে উঠতে পারেনি এই সংবিধান, বরং বিশেষ ক্ষমতা আইনে নাগরিককে শেকল পরানোর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়েছে ক্ষমতা কাঠামো। প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ঈশ্বরের ভাবমূর্তির মতো করে পাহারা দেবার আদিম ও গ্রাম্য চিন্তা এই সংবিধানকে পঞ্চায়েতের সর্বময় কতৃত্বের রক্ষাকবচ দিয়েছে। এই সংবিধানেই ফ্যাসিজমের রেসিপি আছে। সে এমন এক মধু যে আওয়ামী লীগের পলায়নের পর বিএনপি সেই মধুর স্বাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে আগ্রহী। ফলে সর্বদলীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকগুলোতে বিএনপি নানারকম নোট অফ ডিসেন্ট দিয়ে সংবিধান রক্ষায় ধনুক ভাঙা পণ করেছে।

বাংলাদেশে নাগরিক সভ্যতা বিকশিত না হওয়ায়; রাজনীতি ধর্মের আদলে চর্চা করা হয়। ফলে প্রধানমন্ত্রীকে ঈশ্বর কল্পনা করে; সংবিধানকে কুরান কিংবা গীতা ভেবে; এর পবিত্রতা রক্ষায় জীবনবাজি রাখে রাজনীতির ঈশ্বরের অনুসারীরা। আসলে এসব যে শতবর্ষের ফ্যাসিজমের আদিম লোভ; তা মোটামুটি স্পষ্ট নতুন প্রজন্মের কাছে। ফলে ড. ইউনূসের রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দিয়ে ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে মরিয়া বাংলাদেশ কালের ক্ষমতার বেনিফিশিয়ারি নতুন জমিদার সম্প্রদায়। এ কারণেই ১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারদের দেখানো পথেই নাগরিককে প্রজা করে রাখার সমস্ত কলা কৈবল্য দৃশ্যমান।

ড. ইউনূস যে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার কল্পনা করেছিলেন; তা মিথ অফ সিসিফাসের একটি ভারী পাথর বার বার পাহাড়ের ওপর তোলা ও তা নিচে গড়িয়ে পড়ে যাবার ট্র্যাজেডি হিসেবে রয়ে যায়।

নব্বুইয়ের গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে গণতন্ত্রের পরিবর্তে দেশের মালিকানা দুই দলের মধ্যে ভাগ করে নেবার একটি প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। বেয়াইতন্ত্র, যৌথ ব্যবসা, কারাগারে ভি আই পি বন্দিদের জন্য আরাম আয়েশ, জনসমক্ষে গ্রেফতার করে প্রতিপক্ষকে ফাইভ স্টার হোটেলে রাখা, একই অলিগার্কের ব্যবসা রক্ষায় দ্বিদলীয় উদ্যোগ; এসবের মাঝ দিয়ে যে পলিটিক্যাল কালচার তৈরি হয়েছে, সেখানে ইউনুসের সংস্কারের প্রস্তাব ছিলো দ্বি-দলীয় কৌতুকের বিষয়।

হাসিনার পতনের পর; বাংলাদেশ শাসন বিএনপির অনিবার্য এনটাইটেলমেন্ট, সেই দেশের মালিকানার অভিব্যক্তি ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বিএনপির প্রতিনিধির দেহ ভঙ্গিমায় লক্ষণীয় ছিলো। তাদের ভঙ্গিটা এরকম, কেন সময় নষ্ট করছেন, নির্বাচন দিয়ে আপনি যান, বাকিটা আমরা বুঝে নেবো। প্রায় প্রতিদিনই রাষ্ট্রক্ষমতার পাওনাদারের ভঙ্গিতে বিএনপি নেতারা ইউনুসের কাছে বা মিডিয়ায় উদ্ভাসিত হতেন। ফলে বাধ্য হয়ে তাকে লন্ডনে যেতে হয়;তারেক রহমানের কাছে। মি. রহমানই নির্বাচনের তারিখ ঠিক করে দেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বাংলাদেশে নতুন কোনও রাজনৈতিক দল গড়ে উঠতে দেয়নি। জামায়াতকে তারা রেখেছে পাঞ্চিং ব্যাগ হিসেবে। আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শৌর্য দেখাতে জামায়াতকে প্রয়োজন, কারণ সে না থাকলে কাকে সে রাজাকার বলে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে চাইবে। আর জামায়াতকে রাজাকার বলা গেলে; এমনকি ভিন্নমত পোষণকারী লিবারেলদেরও রাজাকার তকমা দেওয়া যায়। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোকানটি ঝাড়ামোছা করে; যে জামায়াতের মন্ত্রীর গাড়িতে তারা বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিয়েছিলো ২০০১-০৬ শাসনামলে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান যে জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন, তাকে ‘গুপ্ত’ ‘রাজাকার’ ডেকে ও ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবার কথা বলে’ লোকজ লিবারেল সোসাইটির হার্ট থ্রব হয়ে পড়ে বিএনপি। এই লোকজ লিবারেল সমাজ বিএনপিকে আগে রাজাকার ডেকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে চাইতো। জামায়াত দলটা কলেবরে আরো বড়ো হয়ে গেলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আর লোকজ লিবারেেলর মুখে মুখে প্রতিদিন বিজ্ঞাপিত হয়ে।

ইউনূস প্রশাসনের উপদেষ্টারা সবাই ক্লিন শেভড, একজন নারী উপদেষ্টা বলেছেন, আমরা জামায়াতকে মেইনস্ট্রিম হতে দিইনি। অথচ ইউনূস প্রশাসনকে জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক তকমা দিয়ে ট্যাবুর রাজনীতিতে ক্রমে ক্রমে দুর্বল করে ফেলা হয়। ভারতের গদি মিডিয়ার ন্যারেটিভকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে বিএনপি, পতিত আওয়ামী লীগ ও নির্মূলের রাজনীতির কারিগর বামপন্থিদের একাংশ।

ইউনূসের শাসনামলটি তাই টেস্ট ক্রিকেটের ব্যাটসম্যানের মতো প্রোপাগান্ডার বল ঠেকানোর খেলা হয়েছে মাত্র। এটা প্রমাণিত হয়েছে, রাষ্ট্র সংস্কার করে প্রধানমন্ত্রীর ঐশ্বরিক ক্ষমতা মানুষের স্তরে নামিয়ে আনতে চাইলে, অর্থনৈতিক সংস্কার করে ব্যাংক ডাকাতি কমাতে চাইলে, দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে চাইলে, রাষ্ট্র কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন কমাতে চাইলে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি কালচার আর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দলদাস নিয়োগ বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে চাইলে, দেশ-লুণ্ঠন ও পরভোজী কালচারের সম্মিলিত শক্তি একযোগে উগ্র ইসলামপন্থি তকমা দিয়ে জামায়াত ট্যাবুর কুইক স্যান্ডে ফেলে দেবে; আজন্ম লিবারেল লাইফ স্টাইল ধরে রাখা মানুষদের। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদ এই বুনো শিকারের মুখে পড়েছেন।

ড ইউনুসের অর্থ উপদেষ্টা ভঙ্গুর অর্থনীতি জোড়া লাগাতে বেশ খানিকটা সফল হয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন। নৌ উপদেষ্টা শৃঙ্খলা ফিরিয়েছেন নৌ চলাচলে। আবার কিছু কিছু উপদেষ্টা কাজের চেয়ে কথা বেশি বলেছেন। খুব সম্ভবত কালচারাল উইং-এর সমালোচনার মুখে যোগ্য একজন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পালটে অপেক্ষাকৃত দুর্বল একজন উপদেষ্টা নিয়োগে বাধ্য করা ছিলো ইউনূসকে দুর্বল করে দেবার কৌশলী রেসিপি। ওদিকে দেড় দশক ধরে হাসিনার পছন্দে গড়া আমলাতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন আনলেও; ইউনূস প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি, ‘বিএনপি’ তো ক্ষমতায় আসবেই, সুতরাং ইউনুসের কথা শুনে কাজ নেই এরকম আনউইলিং হর্স কাজ করেছে প্রশাসনের অন্দরে। ২০০৮-এর নির্বাচনে বেশিরভাগ জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ প্রধান ‘আওয়ামী লীগের ঘোড়া হয়ে দৌড়েছিলো। নির্বাচনের পরদিন ভোরে প্রতিবেশী দেশ প্রথম ফুলের তোড়া নিয়ে ছুটে গিয়েছিলো শেখ হাসিনার কাছে। আর ২০২৬-এর নির্বাচনের আগেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসে মোদির চিঠিতে বিএনপির নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ দেখার আগ্রহ ব্যক্ত করেছিল। ফলে নির্বাচনের আগেই সিভিল মিলিটারি বুরোক্র্যাসির কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুধভাত হয়ে গিয়েছিলো। নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিএনপির অভিষেকের লক্ষ্যে একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

ড. ইউনূসকে ঘিরে উপদেষ্টাদের একটা ক্ষুদ্র উপবৃত্ত তৈরি হয়েছিল। যারা পররাষ্ট্র বিষয়াদি সামাল দিতে অনেকটা অকার্যকর হয়েছেন। ঘুরে ফিরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হেজিমনি তাদের বরণ করতে হয়েছে। পররাষ্ট্র সম্পর্কের সব ডিম এমেরিকা ও ভারতের ঝুড়িতে না রেখে চীন-পাকিস্তান-তুরস্কের ঝুড়িতে কিছু ডিম রাখতে গিয়ে ভারতের রুদ্ররোষে পড়তে হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার মাঝ দিয়ে ভারতের একটা অধিকার বোধ রয়েছে বাংলাদেশের ওপর। দিল্লি মনে করে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়াদি সে দেখবে। শেখ হাসিনার দেড় দশকে দিল্লি এই মুরুব্বিয়ানা উপভোগ করেছে। অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কীরকম সম্পর্ক হবে, তা নির্ধারণ করেছে দিল্লির সাউথ ব্লক। ভারত তার শত্রু রাষ্ট্র চীন, মুসলমান রাষ্ট্র বলে অত্যন্ত অপছন্দনীয় পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ইউনূস প্রশাসনের সম্পর্ক উন্নয়নে এত ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে যে, ভারতের সেনাপ্রধান হুমকি দিয়ে বসেন, ইউনুসের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নয়, নতুন সরকার আসুক। ইউনুসের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে দিল্লিতে যেতে হয়েছে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মানভঞ্জন করতে। ইউনুসের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এই বাস্তবতা জানতেন বলে, সবসময় ভারত প্রসঙ্গে অত্যন্ত কোমল ভঙ্গিতে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের এস্টাবলিশমেন্ট, মিডিয়া, কালচারাল সোসাইটি মুক্তিযুদ্ধের ধাত্রী মাতা হিসেবে ভারতকে গভীরভাবে ভক্তি করে। লেখালেখি ও বাকসক্রিয়তায় তারা ভারতের তৈরি করা অভিধানের শব্দ ব্যবহার করে দিল্লিকে আশ্বস্ত করে প্রায় প্রতিদিন। বিএনপিকে ক্ষমতায় আসার আগেই ভারতের অভিধানের শব্দ ব্যবহার করে সিগন্যালিং করতে হয়েছে যে, তারা ভারতের এঁকে দেওয়া লক্ষ্মণরেখার মাঝেই আছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও জুলাই বিপ্লবীদের ভারতের আগ্রাসন বিরোধী মনোভাবকে অনুসরণ করে ইউনূস সরকার বেশ বিপদে পড়েছে। দেশের মতমোড়ল ভারতীয় মডেলের আলোকিত সমাজ এ কারণে ইউনুসের প্রতি তিক্ত হয়ে পড়েছে। ভারত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, হিন্দু সম্প্রদায়-এর অভিভাবক হিসেবে মাঝে মধ্যে ধমক দেবে, জুলাই বিপ্লবে মানবতাবিরোধী অপরাধী হাসিনাকে আশ্রয় দেবে, সেটাই তো নিয়ম। ইউনূস কেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে কথা বলবেন বা হাসিনাকে বিচারের জন্য ফেরত চাইবেন। ড. ইউনূস ও তার কিছু উপদেষ্টার সার্বভৌম চিন্তাকে বাংলাদেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত আলোকিত সমাজ, ব্যবসায়ী, সিভিল-মিলিটারি বুরোক্র্যাসির সিনিয়র পর্যায়ের লোকেরা ও ডিপস্টেট ভারত প্রভুর প্রতি বেয়াদবি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেটা বুঝেই ইউনূস প্রশাসনের যারা নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকারে পদ-পদবি চান, তারা সমঝে চলেছেন। ইউনুসের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত, তারা ঢাকার ভারত ভক্ত কালচারাল সাব সোসাইটিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন। ফলে, এ সমাজে টিকে থাকার জন্য তারা শত বছরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ঐতিহ্যকে মেনে নিয়ে লীগের অনুপস্থিতিতে কালচারাল সোসাইটির মন্দের ভালো অপশন বিএনপির কাছে সুদৃষ্টি চেয়েছেন। মহাপরাক্রমশালী প্রতিবেশীকে চটানো তাদের ঘাট হয়েছে। জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই চলে না। আগ্রাসনবিরোধী কালচারাল মুভমেন্টের নেতা হাদি নিহত হবার ঘটনা জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াইয়ের পরিণতি। এ কারণে ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পরিষদের শেষ সাত মাস ছিলো নেমেসিসের কাছে আত্মসমর্পণের। বাংলাদেশের নিয়তি ভারতের কালচারাল ছায়া উপনিবেশ হয়ে থাকা; এই ট্র্যাজিক সত্যটি পুনর্বার ধরা দিয়েছে ইউনুসের আশা ও আশা ভঙ্গের দিনগুলোতে।

আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজমের বছরগুলোতে বিএনপি-জামায়াত নির্যাতন ও নিগ্রহের মুখে কোনভাবেই ফ্যাসিস্টের পতন ঘটাতে পারেনি। কিন্তু জুলাই বিপ্লবী জেনজি’রা ২০১৮-র নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পথ ধরে ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টের পতন ঘটিয়েছে। ফলে এই আন্দোলনের তরুণদের প্রথমে ভালোবাসলেও পরে ধীরে ধীরে বিএনপি এদের দুধভাতে পরিণত করার চেষ্টা করে। তারা দেখেছে, একাত্তর ও নব্বুই-এ তরুণেরা রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র এনে দিলে; প্রবীণেরা তাদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে নতুন জমিদারি গড়েছেন। একে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রুপ দিতে পরিবারতন্ত্রের উষ্ণতায় দারা-পুত্র-পরিবার নিয়ে সুখের সংসারে মজেছেন। চব্বিশের বিপ্লবটিতে এর বেশ খানিকটা অন্যথা হয়েছে। ইউনুসের উপদেষ্টা পরিষদে তিনজন বিপ্লবী তরুণ যোগ দিয়েছিলো। তখন বাংলাদেশের কালচারাল উইংটি এই তরুণদের গান্ধা করে দেবার শতাব্দী পুরোনো ভিলেজ পলিটিক্স শুরু করে। ইউনূস কেন মাহফুজকে ব্রেণ বিহাইন্ড দ্য রেভোলিউশান বললেন, এই বিপ্লবকে মেটিকিউলাস কেন বললেন; সারাজীবনে প্রথমবার এ শব্দটি শুনেছেন যে কালচারাল মামা; তিনিও এ শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন। পরিবারতন্ত্রের নেপো বেবি এসে বললো, হাঁসের মাংস খাবো আমরা, ওয়েস্টিনে যাবো আমরা, আসিফ কেন হাঁসের মাংস খেতে ওয়েস্টিনে যাবে। নেপো বেবির সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট লক্ষ্য করুন। বাংলাদেশে গদি মিডিয়ার সাংবাদিকেরা নাহিদ কেন এতো মোটা হলো বলে; ফেসবুকে তাদের কলতলার সখিদের হাসির রোল এনে দিলো। এরা আসলে আওয়ামী লীগের পতনে নিজেদের গণভবনের পিঠাপুলির আসর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিক্ষুদ্ধ। শেখ হাসিনার ‘প্রশ্ন নয় প্রশংসা করতে এসেছি’র আসরে তেলাঞ্জলি দিতে না পেরে এতো রাগান্বিত গদি মিডিয়ার সাংবাদিক যে, দুধভাতে উৎপাত এই জুলাই বিপ্লবীদের পারলে জল দিয়ে জ্যান্ত গিলে খায় এরা। আর বিএনপির বুকে চিনচিনে আশংকা, লীগের পতনে দেশের একচ্ছত্র মালিক তারা; এই ছেলেগুলোকে দেখে তাই আবদুল্লাহ উপন্যাসের পীরের ভঙ্গিতে প্রডিজি চাইল্ডের উদ্দেশ্যে বলে, এক ঘরমে দো পীর যাও বাছা শো রাহো। ভারতীয় মিডিয়া এই জুলাই বিপ্লবীদের মাথায় ফটোশপ করে জিন্না টুপি পরিয়ে বাংলাদেশ আবার পূর্ব পাকিস্তান হয়ে গেলো বলে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে থাকে। এই জুলাই বিপ্লবীদের প্রতি স্নেহ থাকার অপরাধে ইউনূসকে ফটোশপে দাড়ি লাগিয়ে জিন্না টুপি পরিয়েছে তারা। ড. ইউনূস মিডিয়ার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, ভারতীয় মিডিয়া আমাকে তালেবান বলে; আমি মনে হয় বাসায় দাড়ি খুলে এখানে এসেছি।

আওয়ামী লীগ আমলের গুম-ক্রসফায়ার-জুলাই হত্যাযজ্ঞ-সীমান্ত হত্যাকান্ড নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রামাণ্যচিত্র বানিয়ে; ও দ্রুততার সঙ্গে জুলাই জাদুঘর নির্মাণ করে পতিত আওয়ামী লীগ ও কালচারাল ফ্যাসিস্টদের চক্ষুশূল হয়েছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা সরোয়ার ফারুকী। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ছিলেন নিয়মিত আক্রমণের লক্ষ্য। উপদেষ্টা রেজওয়ানা-ফরিদা ও শারমিন মুর্শিদ অকথ্য সাইবার বুলি সয়েছেন। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানই যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ; দৃশ্যত এরকম মনে হয়েছে।

অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে শৃংখলায় ফিরিয়ে আনা, দেশের রিজার্ভকে শীর্ণ দশা থেকে স্বাস্থ্যবান করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, জ্বালানি সংকট হতে না দেয়া, ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ করে তোলা; ইউনূস প্রশাসনের এসব সুব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের জীবন বেশ খানিকটা স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু এরা তো ফেসবুকে লেখে না কিংবা উপসম্পাদকীয় বা টকশোতে ন্যারেটিভ তৈরি করে না। যারা বয়ান তৈরি করে, তারা হয় আওয়ামী লীগের পতনে হতাশ, অথবা বিএনপির আগমনের অপেক্ষায় অস্থির। আর রয়েছে পা পূজক সম্প্রদায়। যারা হাসিনার পা চলে যাবার পর তারেক রহমানের পা পূজায় ব্যস্ত সমস্ত।

আওয়ামী লীগ আমলে কিছু হিন্দুধর্মীয় নাগরিক সরকারি দলের নেতা হিসেবে গণবিরোধী কর্মকাণ্ড করেছিলো; শেখ হাসিনা কিছু হিন্দু পুলিশ ও প্রশাসককে দিয়ে নাগরিক নিগ্রহের কাজ করিয়েছেন; বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদির ‘অখণ্ড ভারত’ কল্পনায় বিভ্রান্ত কিছু হিন্দুধর্মাবলম্বী ফেসবুকে মুসলমান মানেই জঙ্গি ও রাজাকার তকমা দিয়ে ফ্রেমিং ও শেমিং করেছে। ফলে হাসিনার পতনের পর তারা কেউ কেউ জনরোষে পড়েছে। ভারতীয় মিডিয়া সেটাকে অতিরঞ্জিত করে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। ভারত থেকে বিজেপির আইডি লীগের এমপি ক্রিকেটার মাশরাফির বাড়িতে ভাংচুরকে ক্রিকেটার লিটন দাসের বাড়িতে ভাংচুর, আওয়ামী লীগ মালিকের রেষ্টুরেন্টে আগুনকে মন্দিরে আগুন বলে প্রচার করেছে। এখানেও রয়েছে সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট, ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার গুজরাট, কাশ্মীর, উত্তর প্রদেশ হয়ে বিহার-পশ্চিমবঙ্গ-আসামে মুসলমান নিগ্রহ করে চলেছে; তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিচ্ছে;  আর এদিকে বাংলাদেশে তিলকে তাল করে প্রচার করে ইউনূসকে চাপের মুখে ফেলে দেবার চেষ্ঠা করেছে। অথচ দুর্গাপূজায় বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা মন্দির পাহারা দিয়েছে; চট্টগ্রামে সন্দেহভাজন হিন্দুত্ববাদী কর্মীর হামলায় আইনজীবী আলিফ হত্যার পর; নিহতের পিতা ছেলের জানাজায় দাঁড়িয়ে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির ডাক দিলে;ড. ইউনূস মন্দিরে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করলে; সেই ইতিবাচক মনোভঙ্গির খবরকে মেইনস্ট্রিম হতে দেয়নি ভারত ও বাংলাদেশের গদি মিডিয়া।

আওয়ামী লীগের সময় মাজারগুলোকে রাজনীতিকরণ হয়। এমপি-মন্ত্রীরা প্রধান অতিথি হতেন মাজারের ওরসে।  আবার তৌহিদি জনতাকে প্রশ্রয় দেয়া হয়, হেফাজতকে নিয়ে শোকরানা মেহেফিল করা হয়। মাজারের ধারা ও মসজিদের ধারা উভয়েই চলে জনগণের চাঁদায়। ফলে জুলাই বিপ্লবের পরে মসজিদের ধারার লোকেরা মাজার ভেঙ্গে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় চাঁদার একচ্ছত্র মালিক হতে চেষ্টা করে। প্রথম দিকের মাজার ভাঙ্গা প্রকল্পে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী ইসলামপন্থীদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়; পরে দেশব্যাপী এই ট্রেন্ড ছড়িয়ে পড়লে তখন তৌহিদি জনতার ব্যানারে এই অশুভ কর্মকাণ্ড চলে। পুলিশ বাহিনী দুর্বল থাকায় ইউনূস প্রশাসন এই বিপর্যয় রুখতে পারেনি। তবে মাজার ভাঙ্গার অপরাধে নিয়মিত গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে।

আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যে বিএনপির দখল ও চাঁদাবাজির নৈরাজ্য, সাম্রাজ্য দখলের দ্বন্দ্বযুদ্ধে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড; এসব ব্যাপারে অনুশীলিত নির্লিপ্ততা পালন করে; নির্মূলের রাজনীতির সওদাগরেরা দাড়ি টুপি পরা লোকেদের পান থেকে চুন খসলেই তা নিয়ে হ্যাশট্যাগের মার্চ পাস্ট শুরু করে। শাহবাগে একটি মেয়েকে ওড়না ঠিক করে পরতে বলে গ্রেফতার হওয়া ও চাকরি হারানো যুবকের মুক্তির পর কিছু দাড়ি টুপি পরা লোকযুবককে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করলে; সেই ছবি ধ্রুপদী ছবি হয়ে ঘুরতে থাকে। অন্যদিকে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার হাতে নিহত ভ্যানচালক, কিংবা লঞ্চে যুবদলের নেতা এক জুলাই আন্দোলনের তরুণীকে ধর্ষণ করলে; তা নিয়ে অনুশীলিত নির্লিপ্ততা নেমে আসে। ফলে আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির পক্ষে সিলেক্টিভ এক্টিভিজমে নেমে পড়ে কথিত কালচারাল উইং।

যে কলকাতায় বেঙ্গল রেনেসাঁ হয়েছিলো; সেই কলকাতা আজ বিশ্বায়নের ঢেউয়ে প্রগতিশীলতার বিশ্ববীক্ষা অর্জন করেছে। ফলে বঙ্কিমচন্দ্রের   উন্নাসিকতা আজকের কলকাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু নব্বুইয়ের ঢাকা রেনেসাঁ আজো বঙ্কিম যুগে পড়ে আছে। বঙ্কিমের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে যেমন একদল মানুষকে নিম্নবর্গের তকমা দিতে হয়; ঢাকা রেনেসাঁর বঙ্কিমদের তেমনি আত্মবিশ্বাস বাড়াতে একদল মানুষকে নিম্নবর্গের তকমা দিতে হয়। বেঙ্গল রেনেসাঁর বঙ্কিম ও ঢাকা রেনেসাঁর বঙ্কিম, দুজনের চোখেই মুসলমান সেই নিম্নবর্গ; যাকে অনার্য ডাকলে নিজের আর্য কল্পনায় দোলা লাগে। মুখমণ্ডলে; দেহ সৌষ্ঠবে আর্য চিহ্ন নাইবা থাকুক; আরেকজনকে অনার্য তকমা দিলেই আর্য কল্পনায় হৃদয় নেচে ওঠে।

ঠিক এ কারণেই কলকাতা আজ হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে; আর ঢাকার কালচারাল উইং হিন্দুত্ববাদের সাধনা করে। ফলে ইউনুসের বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রচারণায় সে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেয়,সীমান্ত হত্যায় টু শব্দ করে না, আদানির সঙ্গে অসম চুক্তির ব্যাপারে সে স্পিকটি নট। কিন্তু মার্কিন চুক্তি নিয়ে সে আলুথালু। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করতে দরকার হলে সে প্যালেস্টাইন নিয়ে কাঁদবে; কিন্তু বাংলাদেশে ‘প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ তৈরির মোদি প্রকল্পে সে নান্দনিক শ্রমিক হবে। প্রতিবেশী ভারত থেকে শুরু করে ইউরোপের যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে চায়; তারা প্রত্যেকে অসম চুক্তিতেই স্বাক্ষর করে। ভারতকেও রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কিনতে ওয়াশিংটনের অনুমতি নিতে হয়। ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পুনঃবিনিয়োগ ও ট্রেজারি বন্ড কিনতে বাধ্য হতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু সুপার পাওয়ার; বিশ্ববাস্তবতায় সে আজো মাতবরি করে চলেছে; এই মাতবরি তিলে তিলে কমাতে চীনের যে অর্থনৈতিক প্রস্তুতি সেই সামর্থ্য অর্জন অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কারা যাবে, আই এম এফ-বিশ্বব্যাংকের ঋণ কে পাবে এসব নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের মাতবরি তো রয়েছেই। সেই বাস্তবতায় ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম চুক্তিতে রাজি হয়েছেন। বাংলাদেশ কখনো চিনের মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্জন করলে সেসব চুক্তির শেকল থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে যারা ইউনূস কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম চুক্তিতে রাজি হলেন এই নিয়ে ব্যস্ত; তাদের একটি অংশ আত্মনির্ভর উন্নয়ন কৌশল ও আত্মসম্মান বোধের পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু আরেকটি অংশ ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তিগুলো নিয়ে যাতে আলোচনা না হতে পারে; সেজন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে টেবিল গরম করে রাখেন।

ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন চালাতে গিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হারানো জমিদারি ফিরে পেতে উদ্যত ভারতীয় আগ্রাসন আর জেনেটিক্যালি জমিদারের দাসত্ব করা কোটাল পুত্রদের কালচারাল এক্টিভিজমের পাহাড় প্রমাণ বাধা ঠেলতে হয়েছে। পুরোনো বন্দোবস্তে অবরুদ্ধ বাংলাদেশকে মুক্ত করার যে জেনজি লড়াই; জেন আলফাদের মাঝে বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পাবার যে আকুতি; ইউনূস সেই আকাঙ্ক্ষার সারথি হতে চেয়েছেন। কারণ তিনি দেখেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গ্রাউন্ড জিরোতে মিশে যাওয়া ইউরোপের দেশগুলো কিভাবে দশ থেকে পনেরো বছরে রাষ্ট্রসংস্কারের মাধ্যমে কল্যাণরাষ্ট্রের পথে হেঁটেছে। কিন্তু প্রায় একই সময়ে স্বাধীন হওয়া ভারত ও পাকিস্তান আর ৫৫ বছর আগে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ কতগুলো জমিদার পরিবার, তাদের কালচারাল কোটাল পুত্র, বিদ্বেষ ও বিভাজনের থকথকে কাদা, বৈষম্য ধূসর নরভোজ; দেশপ্রেম ও ধর্মপ্রেমের ছেনালি, কালোটাকা ও পেশী শক্তির ভীতি, গোয়েন্দা সংস্থা আর সিভিল-মিলিটারি বুরোক্র্যাসির ছায়ানৃত্য, রাষ্ট্রক্ষমতা মানে দেশ লুন্ঠনের লাইসেন্স, মানুষ হত্যার মাংসের কারবার, অলিগার্কের আস্ফালন আর রেললাইনের ধারের প্রাতঃক্রিয়ার জেনেটিক বৈশিষ্ট্যকে মিডিয়ায় উপস্থাপনের অকল্যাণরাষ্ট্র হয়ে উঠেছে।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দেশলুন্ঠনের অপশাসনের সঙ্গে ইউনূস শাসনের ইকুয়ালাইজ করতে যে লোকগুলো প্রতিনিয়ত সক্রিয়; নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের লোক দাবি করে যারা ভারতের কাছে সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করে, জুলাই বিপ্লবীদের জুলাই জঙ্গি বলে যারা পেলব প্রগতিশীলতার উপটান মুখে মাখতে চেষ্টা করে; এরা সেই পলাশীর যুদ্ধের মীরজাফর ও জগতশেঠদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। অথবা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের শরীরে তেল মালিশ করার সময় যে ডিএনএ, দ্রোহি কৃষককে কলংক দেবার কিংবা গলা কেটে দেবার শলা আঁটতো; তারাই ফিরে ফিরে আসে টকশোতে-উপসম্পাদকীয়তে, ফেসবুকে অথবা রাজ দরবারের চিংড়ি লাউ কিংবা সজনে চচ্চড়ির শাকান্ন সভায়। হয়তো চাকরস্য চাকর স্বভাবের বুমারস, জেনেক্স ও মিলেনিয়াল কতিপয়; জেনজি ও জেন আলফার মুক্তির আকাংক্ষাকে গলা টিপে ধরতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কোটাল পুত্রের জাতিস্মর হয়ে আরো কিছুকাল আমাদের সমাজকে পেছন থেকে টেনে ধরবে। কিন্তু সার্বভৌমত্বপ্রিয় ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষায় সংগ্রামশীল জুলাই প্রজন্মকে পরাজিত করা কঠিন হবে। জাঢ্য জরদগব অচলায়তন ধসে পড়বে নবীনের জুলাই বিপ্লবের অভিঘাত থেকেই। ড. ইউনূস যে রিসেট বাটনের কথা বলেছিলেন, তা আসলে দাসত্বের মনোজগত পেরিয়ে মুক্তি যাত্রার মনস্তত্ব। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার; মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোকানদারেরা ৫৫ বছর ধরে এই প্রতিটি অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। জুলাই বিপ্লবীরাই বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার রক্ষার মিছিল শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার লিপ সার্ভিস দিয়ে আওয়ামী লীগ এই মুক্তির মিছিলের ১৪০০ শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণীকে হত্যা করেছে; পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে আরো কয়েক হাজার তরুণকে। হাসিনার খুনে পুলিশের ভাষায়, গুলি খেয়ে একজন পড়ে গেলে বাকি নয়জন দাঁড়িয়ে থাকে। মৃত্যুভয়কে জয় করেছে যে জুলাই প্রজন্ম; তাদেরকে আটকে রাখা কার সাধ্য।
ড ইউনূস বলেছিলেন, দেশ আর কখনোই ৫ অগাস্টের আগে ফিরে যাবে না। এই অমোঘ বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যারা পুনরাবৃত্তিকর মানবতাবিরোধী আয়ূধ নিয়ে ৫ অগাস্টের আগে ফিরে যেতে চায়; তারা অবিমৃষ্যকারী; বাংলাদেশের আগামী যাত্রায় মিসফিট।

২৭৬ পঠিত ... ১৫:০৯, মে ০২, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top