যে রাত থেকে বাংলাদেশ সূচনা

৫৮ পঠিত ... ১৫:৪৫, মার্চ ২৫, ২০২৬

২৫ মার্চ, ১৯৭১

ওইদিন ঢাকার আকাশডা ওইরকম শান্ত আছিল। বসন্ত যাইতাছে, গরম ঢুকতাছে আস্তে আস্তে। রাস্তাঘাটে মানুষজন, চায়ের দোকানে রেডিওর সামনে ভিড়। সবার মুখে একটাই কথা—স্বাধীনতা। সাতই মার্চের ভাষণের পর মানুষজনের বুকের ভেতর আগুন ধরছে, কিন্তু ওই আগুন যে এভাবে শহর পুইড়া ছাই কইরা দিবে, এইডা কেউ বুঝে নাই।

রাত দশটার পর হঠাৎ কেমন জানি নিস্তব্ধ হইয়া গেল শহরডা। রিকশার টুংটাং নাই, মানুষের গলা নাই। নীলক্ষেতের মোড়ে একটা কুকুর দাঁড়ায়া কাঁই কাঁই কইরা ডাকতেছিল। হয়তো পশুপাখি আগেই টের পাইছে, আমরা মানুষরা পাই নাই।

ঠিক সাড়ে এগারোটার টাইম। হঠাৎ আকাশ ফাইটা আগুন নামলো রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। ওই যে শব্দ—ওইডা বন্দুকের আওয়াজ না, ওইডা আছিল ট্যাংক আর ভারী কামানের গর্জন। শহরডা মুহূর্তে নরক বানাইয়া ফেললো। মানুষ ঘুমাইতে যাইতেছিল, কেউ নামাজ পড়ে শুইছে, কেউ বই গুছাইতেছিল। কেউ জানত না মৃত্যুর গেট সামনে দাঁড়ায়া আছে।

সবচেয়ে খারাপ যা হইছে, তা হইছে ঢাকা ইউনিভার্সিটির জগন্নাথ হলে। পোলাপান ঘুমায়া আছিল। কারো বালিশের নিচে মায়ের চিঠি, কারো টেবিলে খোলা বই। হঠাৎ বুটের শব্দ, তারপর ব্রাশফায়ার। দরজা ভাঙা, কাঁচ চুরমার, রুমে রুমে ঢুইকা গুলি। কেউ পালাইতে গিয়া গর্তে লুকাইছে, ট্যাংকের চাকা দিয়া পিষা দিছে।

পিলখানায় বাঙালি জওয়ানরা দাঁত কইরা প্রতিরোধ করছে। কিন্তু থ্রি নট থ্রি দিয়া কতক্ষণ? সামনে অটোমেটিক অস্ত্র। আগুন লাগাইয়া দিলো ইত্তেফাক অফিসে, বস্তিতে। মানুষ ঘর থাইকা বের হইলে গুলি, ভেতরে থাকলে আগুনে পুড়া। এক রাতেই শহরডা জ্বলন্ত কড়াই।

আর ওই সময়ই কিছু লোক রাস্তায় জিপের সামনে সামনে হাঁটতেছিল। পথ দেখাইতেছিল। এই শহরেরই পোলা, এই মাটিরই মানুষ। পরে ইতিহাসে এদের নাম হইলো রাজাকার। তারা আঙুল দিয়া দেহাইতেছে—এই বাড়িতে নেতা থাকে, ওই বাসায় হিন্দু পরিবার, এই মেসে ছাত্র বেশি। পাকিস্তানি মিলিটারিরা আছিল অন্ধ শিকারি, আর এই লোকাল গাইডরা আছিল তাদের চোখ।

শাঁখারিবাজার, তাঁতীবাজার আগুনে জ্বলতেছিল। চিৎকার, কান্না, গুলির শব্দ একসাথে মিশা গেছে। লুটপাট চলতেছে। রাজাকাররা ভাবতেছে তাদের ভাগ্য খুলা গেছে। কিন্তু তারা বুঝে নাই, মানুষ চুপ থাকলেও সব দেখে রাখে।

রাত শেষ হইয়া ভোর হইলো ২৬ মার্চ। সূর্য উঠছে, কিন্তু আলো লালচে। বাতাসে বারুদের গন্ধ, পোড়া মাংসের গন্ধ। রাস্তা ফাঁকা, মোড়ে মোড়ে ট্যাংক দাঁড়ানো। কিন্তু মানুষের ভেতরের ভয় ওইদিন শেষ হইয়া গেছে। যখন সব হারায়া ফেলা যায়, তখন আর ভয় থাকে না।

চট্টগ্রাম দিক থাইকা খবর আইলো—স্বাধীনতার ঘোষণা। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থাইকা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা পড়া হইলো। এই খবর আগুনের মত ছড়াইয়া গেল। কৃষক, ছাত্র, দোকানদার—সবার চোখে একরকম আগুন।

পাকিস্তানি জেনারেলরা ভাবছিল এক রাতেই সব শেষ। কিন্তু তারা একটা জিনিস ধরতে পারে নাই—বাঙালির জেদ। ট্যাংক দিয়া শরীর পিষা যায়, কিন্তু জেদ পিষা যায় না। ঢাকার গলি দিয়া মানুষ লাঠি, দা, পুরান রাইফেল নিয়া বের হইতে শুরু করলো। এক রাতেই দেশটা গেরিলা মানসিকতায় ঢুইকা গেল।

২৫ মার্চের রাত আছিল কালো, কিন্তু ওই কালো রাতেই জন্ম নিল নতুন সকাল। জগন্নাথ হলের ছাত্র, রাজারবাগের পুলিশ, শাঁখারিবাজারের ঘুমন্ত বাচ্চা—তাদের রক্তই পতাকার লাল হইয়া উঠলো।

ঢাকা তখনো ধোঁয়ায় ঢাকানো। কিন্তু ধোঁয়ার ভেতর থাইকা আস্তে আস্তে একটা স্লোগান উঠতেছিল। আগে আস্তে, পরে জোরে, তারপর গর্জন কইরা—

জয় বাংলা।

ওইদিন থাইকা ইতিহাস আর আগের মত নাই।

৫৮ পঠিত ... ১৫:৪৫, মার্চ ২৫, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top