যে ইতিহাস মধুর নয়

২১ পঠিত ... ১৭:২১, মার্চ ২৫, ২০২৬

কাকডাকা ভোরের কুয়াশার চাদরে মোড়ানো পথে একটি তন্বী নারীকে দেখা যাচ্ছে শিউলি ফুল কুড়োতে। মেয়েটি অদ্ভুত উপায়ে শিউলিফুল তুলছে। শিউলি গাছটি ছোট, সে আগে গাছটিতে একটি ঝাঁকি দিচ্ছে, তারপর হুটোপুটি করে এসে নিজের আঁচল ছড়িয়ে বসে পড়ছে গাছের তলায়। কিছু শিউলি তার ধরতে পারার আগে ঝরে পড়লেও তার বিছানো আঁচলেই পড়ছে বেশিরভাগ ফুল। তার শাড়ির কোচড় ভরা শিউলি হাসছে। মেয়েটিও হাসছে শিউলির মতই স্নিগ্ধভাবে। সে ফিরে তাকিয়ে উজ্জ্বল হাসল অদূরে আরেক গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণের দিকে তাকিয়ে। তরুণ তার স্বামী, রণজিৎ।

সেও সস্নেহ হাসল স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে, বলল, উঠে আয় রানী, আর দেরি হলে মা বকবেন।
রীনা রানী একটু আদুরে স্বরে বলল, আরেকটু থাকি না গো। কি ভাল্লাগছে বল! আর মা-ই তো বলেছেন সকালের পুজোর ফুল আমাকে তুলে দিতে। তুমি মা কে একটু বুঝিয়ে বলতে পারবে না?
রণজিৎ স্ত্রীর আদুরে স্বরে হেসে ফেলল, আচ্ছা থাক আরও কিছুক্ষন।

তার আর রীনা রানীর বিয়ে হয়েছে দিন দশেক হল। মেয়েটির বয়স কৈশোর পেরিয়ে গেলেও আচরণ শিশুসুলভ। তাতেই তাদের সম্পর্কটা গাঢ় হয়েছে দ্রুত। সে তার শিশুসুলিভ স্ত্রীর প্রতি গভীর মায়া অনুভব করে। হাসিমুখে দেখে স্ত্রীর ফুলের সাথে জলকেলী। কিন্তু বাইরের পরিবেশ ভালো নয়। ফেরা উচিত এবার তাদের। আকাশ ফরসা হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই।

সময়টি মার্চ মাস, ১৯৭১ সাল। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ। সারাদেশে যুদ্ধ আবহাওয়া।
রণজিৎ-এর বাবা মধুসূদন দে তার পুরো পরিবার সুদ্ধ বসবাস করেন একেবারে গন্ডগোলের কেন্দ্রে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ি এলাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের পাশে তিনি চালান একটি খাবারের দোকান, নাম 'মধুর ক্যান্টিন'। তাঁর ওখানেই বসে ছাত্র ও ছাত্রনেতাদের আড্ডা। বাবা নিজেও জানেন অনেক কিছু যা বাইরের আর কেউ জানে না। তিনি হচ্ছেন সবার প্রিয় মধুদা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দাবির প্রেক্ষিতে ডাকসু কার্যক্রম শুরু হয়। আর কলা ভবনের পাশে মধুদার দায়িত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় মধুর রেস্তোরাঁ। সেটিই মধুর স্টল, মধুর টি-স্টল প্রভৃতি নাম শেষে মধুর ক্যান্টিন নামে পরিচিতি লাভ করলো। মধুর ক্যান্টিনের খাবারের মধ্যে ছিল প্রধানত তাদের নিজেদের তৈরি সন্দেশ, রসগোল্লা আর সিঙ্গাড়া। মাঝে মধ্যে পাওয়া যেত পুরাণ ঢাকার বেকারিতে তৈরি কিছু বিস্কুট। আর চা তো ছিলই। মধুদার বন্ধুসুলভ আচরণ ও সততার জন্য তিনি ছাত্রদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, হয়ে ওঠেন বিশ্বস্ত। ক্যান্টিনের পাশেই ডাকসু কার্যক্রম চলতো বলে ছাত্ররাজনীতির সূতিকাগার হয়ে ওঠে মধুর ক্যান্টিন। ৬৯ থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত বহু রাজনৈতিক বৈঠক মধুদার ক্যান্টিনে হয়েছে। রাতের অন্ধকারে এসব বৈঠক সম্পর্কে রাজনৈতিক নেতারা ছাড়া শুধু মধুদাই অবহিত থাকতেন। মধুর ক্যান্টিন ছিল প্রগতিবাদী গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের অলিখিত হেড কোয়ার্টার।

বাবা আজব মানুষ। তার ক্যান্টিনে কত শত মানুষ আসে। নামকরা সব মানুষ। ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ভিড় লেগেই থাকে সবসময়। আসে উঠতি কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, খেলোয়াড়। তারা খাবার খায়, আড্ডা দেয়, রাজনীতি আলোচনা করে। অনেকেই দাম মেটায় আবার কেউ কেউ লিখে রাখতে বলে। বাবা সেই লিখে রাখার খাতাটির শিরোনাম দিলেন ‘না দিয়া উধাও’।

ওই খাতায় এককালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজ, শামসুর রহমান, আহমদ ফজলুর রহমানসহ কত কৃতী ব্যক্তিত্বের নাম যে আছে। ষাটের দশকে অনেকেই ‘না দিয়া উধাও’ খাতায় স্থান করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে মিজানূর রহমান শেলী, জিয়াউদ্দীন, কাজী জাফর আহমদ, মহীউদ্দীন, আতাউর রহমান কায়সার, রেজা আলী, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, ওয়ালীউল ইসলাম, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, রফিক আজাদ প্রমুখ।

বাবাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধু হাসেন। বলেন, বাবারে, এনারা একদিন দেশের কান্ডারী হইব। আইজ আমি তাগোরে যদি একটু মাগনা খাওয়াইয়াই থাকি তো একদিন আমার নামও এনাগো লগে ইতিহাসে লেখা অইব।
কিন্তু রণজিৎ পরিষ্কার বোঝে ইতিহাসে নাম লেখানোর লোভে নয়, এই মানুষগুলোর প্রতি ভালবাসার জন্যই বাবা এমন করেন। সে বাবার কথা চিন্তা করে আনমনে হাসে। তার বাবা বড় সোজা-সরল ভালো মানুষ।

আজ ২৫ মার্চ। দেশের পরিস্থিতি খুব বেশি মাত্রায় খারাপ। বাবার শরীর ভালো না। মা বারবার বাবাকে বললেন আজ ক্যান্টিনে না যেতে। বাবা বারণ শুনলেন না। তাকে ঐ মানুষগুলোর দরকার। এই পরিস্থিতিতে সে ক্যান্টিন বন্ধ রাখে কিভাবে। শেষে বাধ্য হয়ে মা বললেন রণজিৎকে তাঁর সাথে যেতে। রীনা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল ভয়ে। রণজিৎ স্ত্রীকে অভয় দিল। তারপর বাবার সাথে বেরোল। সারাদিন সে তার বাবার সাথেই থাকল। ক্যান্টিনে যেই এলেন বাবা তাকেই বললেন কোন নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ যে কোন মুহূর্তে শুরু হবে বলে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, মধুদা তৎকালীন ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন-কে একটি ডিম ভেজে খাইয়ে বলেছিলেন, “দাদা পরিস্থিতি ভাল না। নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।” মেনন এবং অন্যরা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারলেন, কিন্তু মধুদা গেলেন শিববাড়িস্থ কোয়ার্টারে।

এল ২৫ মার্চ কালরাত্রি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকার মানুষ মেরে স্তুপ করে ফেললো। সারারাত চলল তাদের তান্ডব। বিভীষিকাময় রাত্রি।
রীনা সারারাত রণজিৎ-এর কোলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থেকেও আতংকে থরথরিয়ে কেঁপে গেল। রণজিৎও তার স্ত্রীকে আঁকড়ে ধরে রইল ভয়বিহ্বল চোখে। ওপাশে বাবা-মা কি করছেন ভগবান জানেন। কোয়ার্টারটি শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ।

আস্তে আস্তে পূবাকাশ ফরসা হল। ২৬ মার্চ, ১৯৭১। রক্তস্নাত এক ভোর। আজ আর শিশুসুলভ মেয়েটি ভোর হতেই শিউলি তুলতে যাবার জন্য স্বামীকে পাগল করে ফেলল না। বরং তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বোধহয় ভাবলো দিনের আলোয় আতংকের কিছু নেই।

কিন্তু তারা ভুল ভেবেছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে কত বড় পিশাচ তা তাদের জানা ছিল না। সেই ভোরবেলাতেই তাদের বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেংগে খানখান করে বুটপরা শয়তানেরা ঢুকে পড়ল বাড়িতে। দেখতে দেখতে রণজিৎ, তার শিশুসুলভ স্ত্রী রীনা রানী আর তার মা যোগমায়া লাশ হয়ে পড়ে রইল। তাদের নিথর দেহে, খোলা চোখে এখন আর কোনো অনুভূতির অবকাশ নেই।

শয়তানেরা মধুদাকে খুঁজে পেল না। কিন্তু তারা আবার ফিরে এলো। মধুদাকে খুঁজে বের করে নিয়ে গেল জগন্নাথ হল মাঠে। সেখানে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক জি.সি. দেবের সাথে এক লাইনে দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের সবাইকে একসাথে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। মধুদাকে জগন্নাথে নিহত সবার সাথে সেখানেই গণকবর সমাহিত করা হয়। শেষ হয়ে যায় একটি সদা হাস্যমুখ, সৎ, বন্ধুবৎসল সাদা প্রাণ। সত্যিই ইতিহাসে নাম লেখা হয়ে যায় তার।

এই দিনেই একটি ভবিষ্যৎ দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা হল। যথাসময়ে সেই দেশটি কঠিন পরীক্ষায় উতরে গিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু তা আর দেখা হল না মধুদা আর তার পরিবারের। তারা ইতিহাস হয়ে রয়ে গেলেন।

আজও তার সেই বিখ্যাত ক্যান্টিনটি তার নামের মধ্যেই বেঁচে আছে। আজও শহীদ মধুদার ক্যান্টিনে বহু দূর-দূরান্তের মানুষ আসে সেই সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে। আজও সবার মনে বড় উজ্জ্বল হয়ে বেঁচে আছেন মধুদা।

বি.দ্র: এই গল্পের কোন চরিত্র কাল্পনিক নয়। মধুর ক্যান্টিনের মালিক মধুসূদন দে এর স্ত্রী যোগমায়া, সদ্যবিবাহিত পুত্র রণজিৎ আর তার স্ত্রী রীনা রানিকে তাদের শিববাড়িস্থ কোয়ার্টারে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করে।
তখন তারা মধুদাকে তারা পায়নি। কিন্তু পরবর্তীতে এই পিশাচবাহিনী আবার ফিরে আসে আর মধুদাকে ধরে নিয়ে যায়।
এই গল্পের শুধুমাত্র রণজিৎ আর তার স্ত্রীর অংশখানি কল্পনাপ্রসূত।

২১ পঠিত ... ১৭:২১, মার্চ ২৫, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top