১.
জেরুজালেমের রাতগুলো খুব মায়াবী হয়, কিন্তু আজকের রাতটা কেমন যেন গুমোট। আকাশে চাঁদ আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না। শহরের একটা দোতলা ঘরের কোণে বারোজন মানুষকে নিয়ে খেতে বসেছেন একজন যুবক। তাঁর নাম যিশু। মানুষটার চোখে এক অদ্ভুত মায়া, অথচ আজ সেখানে বিষাদও খেলা করছে।
তিনি হঠাৎ একটা রুটি হাতে নিয়ে টুকরো করে সবার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, নাও, এটা আমার শরীর।" সবাই চমকে উঠল। যিশু একটু হাসলেন, সেই হাসিটা বড় রহস্যময়। এরপর আঙুর রসের পেয়ালাটা তুলে বললেন, "এটা আমার রক্ত। তোমাদের মুক্তির জন্য আজ রাতে আমি হারিয়ে যাব।
শিষ্যরা সব হতভম্ব। এর মাঝেই যিশু পিনপতন নীরবতায় একটা বোমা ফাটালেন। নিচু গলায় বললেন, তোমাদের মধ্যেই একজন আজ রাতে আমার সাথে বেইমানি করবে। ঘরটা এক নিমেষে বরফ হয়ে গেল। জুডাস নামের ছেলেটি তখন পকেট সামলাচ্ছে। সেখানে ত্রিশটি রুপোর মুদ্রা ঝনঝন করে বাজছে। সে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অন্ধকার রাতে তার ছায়াটা বড় কুৎসিত দেখাচ্ছিল।
যিশু জানতেন কী হতে যাচ্ছে। তিনি শিষ্যদের নিয়ে অলিভ বাগানে গেলেন। সেখানে পাথরের ওপর মাথা রেখে প্রার্থনা করতে করতে তাঁর কপাল দিয়ে ঘাম নয়, যেন রক্ত ঝরতে শুরু করল। প্রকৃতি একদম চুপ। হঠাৎ দূরে মশালের আলো দেখা গেল। জুডাস এগিয়ে এসে যিশুকে একটা চুমু খেল। ভাবুন তো, ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে সুন্দর ভঙ্গিটি ব্যবহার করা হলো বেইমানির সংকেত হিসেবে! সৈন্যরা যিশুকে বেঁধে নিয়ে গেল। আকাশ থেকে তখন হয়তো কোনো নক্ষত্র নিঃশব্দে খসে পড়ল।
২.
সকালটা শুরু হলো বড় বিশ্রীভাবে। চারদিকে শুধু চিৎকার আর মানুষের হট্টগোল। পন্তিয়াস পিলাত নামের রোমান শাসনকর্তাটি পড়লেন মহাবিপদে। তিনি লোকটার চোখে কোনো অপরাধ খুঁজে পাচ্ছেন না, কিন্তু বাইরের জনতা যেন রক্ত চাইছে। পিলাত ভাবলেন গা বাঁচিয়ে চলবেন। তিনি এক গামলা জলে হাত ধুয়ে বললেন, এই নির্দোষ লোকের রক্তে আমার হাত নেই। কী চমৎকার অভিনয়! অথচ মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবিচারটা ঠিক তখনই ঘটে গেল।
যিশুর গায়ে চড়িয়ে দেওয়া হলো একটা রাজকীয় লাল রঙের আলখাল্লা। মাথায় পরানো হলো অতি সূক্ষ্ম আর ধারালো কাঁটার এক মুকুট। বিদ্রূপ করে সৈন্যরা বলছে, এই তো আমাদের রাজা! চাবুকের আঘাতে যিশুর পিঠের চামড়া চিরে রক্ত ঝরছে, অথচ মানুষটা টু শব্দটি করছেন না। কেন করছেন না? মানুষের সহ্যশক্তিরও তো একটা সীমা থাকে। যিশু কি তবে সেই সীমার ওপারকার কোনো মানুষ?
বিশাল একটা কাঠের ক্রুশ ওনার কাঁধে তুলে দেওয়া হলো। গলগোথা পাহাড়ের পথটা বড় খাড়া। রোদে তপ্ত ধুলোমাখা রাস্তায় তিনি বারবার আছড়ে পড়ছেন। রাস্তার দুপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কেউ হাসছে, কেউ পাথর ছুড়ছে, আবার কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। যিশু একবার শুধু মেরি—তাঁর মায়ের দিকে তাকালেন। সেই চাউনিতে যেন পুরো পৃথিবীর সবটুকু মমতা জমে আছে।
পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর পর শুরু হলো চূড়ান্ত যন্ত্রণা। হাত আর পায়ে হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠুকে দেওয়া হলো। দুপুর তখন বারোটা। ঠিক তখনই প্রকৃতি যেন খেপে উঠল। গনগনে সূর্যটা হঠাৎ উধাও হয়ে গেল, নেমে এল ঘন কালো অন্ধকার। মনে হচ্ছিল, সৃষ্টিকর্তা বুঝি লজ্জায় নিজের মুখ ঢেকে ফেলেছেন। দুপুর তিনটার দিকে যিশু ওপরের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, "সব শেষ হলো!" তারপর ওনার মাথাটা একদিকে ঝুঁকে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে পৃথিবী কেঁপে উঠল। মানুষগুলো ভয়ে চিৎকার করে পালাতে শুরু করল। তারা বুঝতে পারল, আজ সাধারণ কোনো মানুষ মরেনি।
৩.
শনিবারের পুরোটা দিন কাটল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়। যিশুর অনুসারীরা ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন। তাঁদের প্রিয় মানুষটি এক বিশাল পাথরের গুহায় বন্দি। গুহার মুখে প্রকাণ্ড এক পাথর, আর পাহারায় রোমান সৈন্যরা। তারা পাহারায় আছে যাতে কেউ দেহটি চুরি না করে। কিন্তু মানুষের তৈরি পাথর কি আর বিধাতার ইচ্ছাকে আটকে রাখতে পারে?
রবিবার, ভোরবেলা। চারপাশটা কেমন যেন ধোঁয়াটে কুয়াশায় ঢাকা। ম্যারি ম্যাগডালিন নামের মেয়েটি হাতে কিছু সুগন্ধি মশলা নিয়ে গুহার দিকে যাচ্ছেন। ওনার মনে শুধু একটা চিন্তা— "পাথরটা সরাবে কে?" কিন্তু কবরের কাছে পৌঁছাতেই ম্যারির বুকটা ধক করে উঠল। পাথরটা নেই! কে যেন সেটা হেলায় সরিয়ে রেখেছে। গুহার ভেতরটা ধবধবে সাদা কাপড়ে মোড়ানো, কিন্তু যিশু সেখানে নেই।
ম্যারি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। ভাবলেন, কেউ হয়তো ওনার প্রভুকে চুরি করে নিয়ে গেছে। ঠিক তখন পেছন থেকে একটা গম্ভীর অথচ মায়াবী কণ্ঠস্বর ভেসে এল— ম্যারি!
ম্যারি চমকে ফিরে তাকালেন। কুয়াশার ভেতর লম্বাটে এক অবয়ব। তিনি ভাবলেন বাগানের মালি বোধহয়। চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, আপনি কি তাঁকে নিয়ে গেছেন? দয়া করে বলুন কোথায় রেখেছেন?
সেই রহস্যময় মানুষটি একটু হাসলেন। সেই হাসিতে যেন শরতের সকালের রোদ্দুর ঝিলিক দিয়ে উঠল। ম্যারি এবার ভালো করে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এ তো মালি নয়! এ তো খোদ যিশু! মৃত্যু যাকে গ্রাস করতে চেয়েছিল, তিনি মৃত্যুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ফিরে এসেছেন। ওনার হাতে-পায়ে পেরেক ঠোকার দাগগুলো তখনো আছে, কিন্তু তাতে কোনো ব্যথা নেই—আছে এক অদ্ভুত জ্যোতি।
যিশু বললেন, ভয় পেয়ো না ম্যারি। আমি ফিরে এসেছি।
সেই দিনটিই ছিল প্রথম ইস্টার সানডে। অন্ধকারকে হারিয়ে আলো যে শেষ পর্যন্ত জিতে যায়, যিশু সেটা প্রমাণ করে দিলেন। তিনি এরপর চল্লিশ দিন তাঁর শিষ্যদের সাথে কাটালেন, তাঁদের সাথে মাছ ভাজা খেলেন, গল্প করলেন—ঠিক যেমন একজন অতি সাধারণ মানুষ করেন। তারপর একদিন নীল আকাশের বুকে মিলিয়ে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন এক অমোঘ বিশ্বাস—ভালোবাসার কোনো মৃত্যু নেই।
গল্পটা এখানেই শেষ, কিন্তু এর রেশ রয়ে গেল হাজার হাজার বছর ধরে। আজও মানুষ যখন খুব বিপদে পড়ে, তখন হয়তো সেই কুয়াশাভেজা ভোরের কথা মনে করে একটু আশার আলো পায়। ইস্টার সানডের এই গল্পটা আসলে আমাদের সবার বেঁচে থাকার এক পরম আশার গল্প।



পাঠকের মন্তব্য