মানুষজন ঈদের নামাজে হুড়োহুড়ি করে দৌড়াদৌড়ি করতেছে, চারদিকে ধুপধাপ ধুলো উড়তেছে, আর ঠিক সেইখানে নব্বই দশকের রোদের গন্ধ মাখা একটা তুমুল হট্টগোলের ভেতর থেইকা জাস্ট একটা আওয়াজ আসল, ভাইসাব, হবরে খান!
ব্যাপারটা বুঝতেছেন? এইটা জাস্ট একটা আরসি কোলার বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল না। এইটা হইলো একটা আস্ত টাইম মেশিন। নোয়াখালীর জাঁদরেল ব্যবসায়ী, পারটেক্সের এম এ হাসেম সাহেব তখন মাত্র এমপি হইছেন। উনার মাথায় কী খেলল কে জানে, উনি ভাবলেন, চলো, এইবার চশমা-টাই পরা বাবুদের বাদ দিয়া মাটির গন্ধওয়ালা কিছু একটা করি। যেই ভাবা, সেই কাজ।
২০০২ সালের কুরবানির ঈদে টিভির পর্দায়, বিটিভির ওই ঝিরঝির করা স্ক্রিনে যখন এইটা রিলিজ হইল, বাঙালি তো পুরা থতমত খাইয়া গেল। মানুষজন প্রথম প্রথম বুঝেই নাই হবরে খান মানে কী! অনেকে ভাবছে, কিসের নাকি খবর দিতে বলতেছে! পরে যখন বুঝল এইটার মানে “তাড়াতাড়ি খান”, তখন ততক্ষণে যা হওয়ার, তা হইয়া গেছে, পুরো দেশের মগজে এই গান সেট হইয়া গেছে।
দৃশ্যপটটা একটু ভিজ্যুয়ালাইজ করেন। গ্রামের ধুলোওড়া মাঠ, ঢোল বাজতেছে ধুমধাম, বাচ্চারা লুঙ্গি গুঁজ্যা গরুর পিছে দৌড়াইতেছে, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতেছে বেলাল হোসেনের সেই খাঁটি নোয়াখাইল্লা গলা, এক বছরে দুইআন খুশি আমরা মুসলমান...
কী অদ্ভুত সরলতা, কী মারাত্মক হাহাকার লাগানো এক আনন্দ! বেলাল হোসেন নামের ওই লোকটা, যে কিনা নোয়াখালীর এক কোনায় পইড়া থাইকা গান গাইত, সে এক রাতের মধ্যে জাস্ট জাদুকর হইয়া গেল। এই একটা গান দিয়া সে নোয়াখালীর ভাষাটারে নিয়া গেল ড্রয়িংরুমের একদম মাঝখানে। অভিজাতদের নাকউঁচু ভাবটারে বুড়ো আঙুল দেখাইয়া আঞ্চলিক ভাষাই হইয়া উঠল ঈদের আসল আনন্দ।
আজকে ২০২৬ সালে খাড়ায়া যখন ফেসবুক স্ক্রোল করবেন, কিংবা ইউটিউবে কোনো মিম দেখবেন, দেখবেন এই গানটা এখনো মরে নাই। মরে নাই কারণ এইটার ভেতর আমাদের ফেলে আসা শৈশবের কোলাহল জড়ায়া আছে। রমজানের ঈদে যেমন নজরুলের ওই গানটা না শুনলে মন ভরে না, কুরবানির ঈদে এই হবরে খান না শুনলে মাংসের গন্ধটাই কেমন যেন ফিকে লাগে।
একটা ২২ সেকেন্ডের জিঙ্গেল কীভাবে একটা জাতির নস্টালজিয়ার পার্মানেন্ট দলিল হইয়া যাইতে পারে, এই বিজ্ঞাপনটা তার জ্যান্ত প্রমাণ।
ভাইসাব, সময় তো চলি যার, দেরি অই যার... আন্নেও এক্কানা হবরে খান!



পাঠকের মন্তব্য