কাঁচা মাটির গন্ধ

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে

 

গত শুক্রবারেও বাড়িটা হাসি আর আনন্দে গমগম করছিল। সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে টুনি বাবার আঙুল ধরে বায়না ধরেছিল, আব্বু, ঈদে এবার লাল রঙের ফ্রক চাই। একদম পরীদের মতো। মকসুদ মিয়া মেয়ের গোলগাল মুখটা দুহাতে চেপে ধরে হেসে বলেছিলেন, শুধু লাল ফ্রক কেন মা, সঙ্গে লাল জুতো আর কাঁচের চুড়িও এনে দেব।

সেই লাল ফ্রকটা আলমারির তাকে এখনো সুন্দর করে ভাঁজ করা আছে। কিন্তু সেটা গায়ে জড়ানোর মতো নরম শরীরটা আর নেই। কয়েক দিন আগে এক পৈশাচিক ঝড় এসে মকসুদ মিয়ার সাজানো সংসারটা ছারখার করে দিয়ে গেছে। এক নরপশুর নির্মম লালসার শিকার হয়ে, অসহনীয় কষ্ট সয়ে পৃথিবী ছেড়ে আল্লাহর কাছে চলে গেছে তাঁর কলিজার টুকরো টুনি। ঘরজুড়ে এখন কেবলই এক নিদারুণ, স্তব্ধ হাহাকার।

ঈদের আগের রাত। চারদিকে আনন্দের শোরগোল। প্রতিবেশীদের ঘর থেকে ভেসে আসছে সেমাই রান্নার সুবাস। কেউ কাজ এগিয়ে রাখছে। মকসুদ মিয়া ঘরের অন্ধকার কোণে বসে আছেন, দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে আছেন টুনির সেই লাল ফ্রকটা। কাপড়ের ভাঁজে যেন লেগে আছে মেয়ের গায়ের চেনা মিষ্টি গন্ধ। মকসুদ মিয়ার চোখে জল নেই, কান্নার সব নদী বহু আগেই শুকিয়ে গেছে। আছে শুধু এক অনন্ত শূন্য দৃষ্টি।

যে ঈদের আনন্দে সবাই ভাসছে, উল্লাস করছে, সেই উল্লাসধ্বনি তাঁর বুকে তীরের মতো বিঁধছে। প্রতিবার এই রাতে টুনি এসে হাত ধরে টানত, আব্বু, চাঁদ উঠেছে! দেখবে এসো!

মকসুদ মিয়া হেসে বলতেন, ধুর পাগলী, বড় ঈদের চাঁদ তো আগেই ওঠে।

এই ছোট্ট ভুল কথাটা শোনার জন্য আজ তাঁর আত্মা ছটফট করছে, কিন্তু ঘরজুড়ে এখন শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ।

ঈদের সকাল। অন্যান্য ঈদে এই সময়ে ঘরে একটা মধুর যুদ্ধ লেগে যেত। টুনিকে গোসল করানো, জোর করে চোখে সুরমা মাখিয়ে দেওয়া, কত কী! মকসুদ মিয়া নতুন পাঞ্জাবি পরে তৈরি হতেই টুনি এসে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত, আব্বু, আমার ঈদের সালামি দাও!

আজকের সকালটা একদম অন্যরকম। মকসুদ মিয়া পুরোনো একটা পাঞ্জাবি পরেছেন, তবে তা আনন্দের জন্য নয়, ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার সামাজিক বাধ্যবাধকতায়। জায়নামাজটা হাতে নিতেই বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নামাজ শেষে যখন সবাই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করছে, আনন্দে মেতে উঠছে, মকসুদ মিয়া তখন ভিড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। পরিচিত কেউ তাঁর কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। কারণ সবাই জানে, সান্ত্বনার কোনো ভাষাই এই বুকফাটা শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।

নামাজ শেষ করে মকসুদ মিয়া বাড়ির দিকে গেলেন না। তাঁর পায়ের জুতোজোড়া যেন এক চেনা পথ ধরে এগোতে লাগল। তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন গ্রামের এক কোণে থাকা কবরস্থানের পাশে। যেখানে একদম নতুন মাটির একটা ছোট ঢিবি তৈরি হয়েছে, যার ওপর এখনো ঘাস গজায়নি, মাটির গন্ধটা কাঁচা।

মকসুদ মিয়া কবরের পাশে ভেজা মাটির ওপর বসে পড়লেন। আলতো করে হাত রাখলেন মাটির স্তূপটার ওপর, ঠিক যেভাবে রাতে টুনিকে পিঠ চাপড়ে ঘুম পাড়াতেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করলেন সেই লাল ফ্রক আর এক জোড়া রেশমি চুড়ি। কবরের ওপর সেগুলো আলতো করে রেখে ভাঙা, কাঁপাকাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, মা রে, তোর লাল ফ্রক এনেছি। তুই বলেছিলি না ঈদের দিন পরবি? পরবি না মা? দেখ, তোর আব্বু এসেছে... তোর সালামি নিয়ে এসেছে...

বাতাসে গাছের পাতা নড়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো উত্তর এলো না। দুপুরের কড়া রোদ যখন মাথার ওপর এসে পড়ল, তখনও এক বাবা তাঁর জীবনের সবটুকু আনন্দ, সবটুকু পৃথিবী এই কাঁচা কবরের মাটিতে সঁপে দিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। চারপাশের উৎসবের দিনে এই বাবার বুকে তখন জ্বলছে এক জীবন্ত শোকের আগুন।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top