আজ পাহাড়ের সবুজে সবুজে লেগেছে অন্য হাজার রঙয়ের ছোঁয়া। আজ পহেলা বৈশাখ। সারা এলাকায় যেন রঙ্গীন প্রজাপতির দল ছুটে বেড়াচ্ছে। নানা রঙে, নানা ঢঙয়ে নিজেদের সাজিয়ে তারা আনন্দের সন্ধানে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
চাকমা বসতির এককোণেই আমার বাস। সকাল থেকেই দেখছি চাকমা নারীরা নানা রঙয়ের 'হাদি'(ব্লাউজ/ ওপরের অংশ) এবং 'পিনন'(কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত স্কার্ট) পরে নানাকাজে ব্যস্ত। এই ফুল তুলছে, এই ঘর নিকোচ্ছে, এই শিশুদের সাজাচ্ছে আবার নিজেরাও সাজছে। আবার একটু বয়স্ক রমনীরা রাঁধা-বাড়ার কাজে ব্যস্ত। আজ তাদের অনেক কাজ। বিঝু শুরু হয়েছে যে। আনন্দের যেমন অভাব নেই, তেমনি নেই কাজেরও অভাব।
চাকমা ফুলবিজু উৎসব
আমি সমতলবাসী। আমি অবাক হয়ে চেয়ে আছি এই রঙ, রূপ, বৈচিত্রের দিকে। বাঙ্গালি হিসেবে আমার দেখা বাঙ্গালি সমাজের একান্ত নিজস্ব সবচেয়ে বড় আনন্দানুষ্ঠান হিসেবে পালিত হয় বর্ষবরণ বা বাংলা সনের বিদায় ও নতুন সনের আগমনী উৎসবটি। আমরা বাঙালিরা একে 'শুভ বাংলা নববর্ষ উদযাপন' বলে থাকি। আর আমাদের নিজস্ব ধারায় বিভিন্ন রীতিনীতির সাথে পালন করে থাকি। রঙ, বৈচিত্র সেখানেও থাকে কিন্তু পাহাড়ে যেন এর ধরণটা ভিন্ন।
আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীরা যাদের আমরা আদিবাসী বলে থাকি তারাও এই নতুন বছরকে নিজস্ব আঙ্গিকে বরণ করে থাকে। সেখানেও থাকে নানা রঙ ও বৈচিত্রের সমাহার। তার সাথে সাথেই আনন্দের বহরটাও কিন্তু বিশাল।
বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা, বিশেষ করে বান্দরবান জেলায় দশটি ভাষাভাষী এগারোটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বাস রয়েছে। যাদের ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার নানা বৈচিত্র্যময় জীবনধারা, নানা সংস্কৃতির সম্মিলন বর্ষবরণ উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ করায় তা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। আজ আমাদের পাহাড়ে পাহাড়ে যে আনন্দের ঢেউয়ের শুরু হয় তার ছোঁয়াচ যেন সারাবিশ্বেই মেলে।
আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ভাষায় নানা নামে বর্ষবরণ উৎসবকে অভিহিত করে থাকে। এই উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে ‘বৈসু’/বৈসুক, মারমাদের কাছে ‘সাংগ্রাইং’, এবং চাকমাদের কাছে ‘বিজু’ নামে পরিচিত। এই তিনটি উৎসবের আদ্যক্ষর নিয়েই 'বৈসাবি' নামটি তৈরি হয়েছে। এই নামটিই বর্তমানে সমতল বাসিন্দাদের মানে আমাদের মত মানুষদের কাছে বেশি পরিচিত।
আবার ম্রো/মুরং জনগোষ্ঠীর কাছে এটি ‘চাংক্রান পোয়ে’, চাক জনগোষ্ঠীর কাছে ‘সাংগ্রাইং’, খুমী জনগোষ্ঠীর কাছে ‘সাংক্রাইং’, খেয়াং জনগোষ্ঠীর কাছে ‘সাংরান’ এবং তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর কাছে ‘বিষু’ নামে পরিচিত। সাঁওতালরা একে 'সোহরাই' বলে আর গারোরা বলে 'ওয়ানগালা' উৎসব।
বাংলা পঞ্জিকায় এই সময়টিকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘মহা বিষুব সংক্রান্তি’ হিসেবে। তাই ধরে নেয়া হয়, আদিবাসীদের দেয়া বিভিন্ন নামসমুহের শব্দাবলির বেশিরভাগের উৎপত্তি ঘটেছে এই ‘বিষুব সংক্রান্তি’ শব্দদ্বয় থেকে।
যদিও আমাদের দেশের সমতলবাসী আর পাহাড়ি জনগোষ্ঠী উভয়েই সমান তালে পালন করে থাকে কিন্তু জনশ্রুতি রয়েছে এই বর্ষবরণ বা বৈসাবি উৎসবের আদি শিকড় মুলত দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত। খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতাব্দী বা তারও আগে ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃতি পরিব্যাপ্ত হয়েছিল দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায়। খ্রিস্টীয় ও ইসলামী প্রভাব পড়েনি এমন দেশ, যেমন মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশে এই উৎসব পালিত হয় বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণ উৎসব হিসেবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘সংক্রান্তি’ বা ‘সংক্রান্ত’ হিসেবে। থাইল্যান্ডে এটি ‘সংক্রান’ এবং মায়ানমারে ‘থিংগিয়ান’ হিসেবে পরিচিত, যা সংস্কৃত শব্দ ‘সংক্রান্ত’ থেকে এসেছে।
আবার, বাংলাদেশের বাঙালি বৌদ্ধ সম্প্রদায় একে ‘চৈত্র পরব’ বা ‘বিয়ু পরব’ নামে অভিহিত করে থাকে। বাংলাদেশ ও মায়ানমারের রাখাইন জনগোষ্ঠীর কাছে এটি পরিচিত ‘সাংগ্রাইং’ হিসেবে। কমলগঞ্জের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের কাছে এটি ‘বিষু’ নামে পরিচিত। ভারতের হিমাচল প্রদেশ ও হিমালয়ের প্রায় সবক’টি রাজ্যে বিষুব সংক্রান্তি ‘বিষু’ বা ‘বৃষু’ নামে পরিচিত।
হিমালয়ের চম্বা (প্রাচীন চম্বা নগরী) ও কিন্নৌর অঞ্চলের আদিবাসীরা ‘বিষু’ পালন করেন বর্ষবরণ উৎসব হিসেবে। নেপালেও এই উৎসবটিকে বলা হয় ‘বিষু’ উৎসব। ভারতের আসামে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী ‘স’ বা ‘ষ’-কে উচ্চারণ করে ‘হ’ হিসেবে। একারণে অহমীয়াদের কাছে ‘বিষু’র উচ্চারণটি হয়ে গেছে ‘বিহু’। আসামের প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব বিষু বা বিহু নৃত্য। মজার বিষয় হচ্ছে নাম নানারকম হতে পারে বটে, উপলক্ষ কিন্তু একটিই - পুরাতনের বিদায় আর নতুনের আগমন।
এই উৎসবের উৎপত্তি নিয়ে একটি মজার পুরাকথা প্রচলিত রয়েছে। অনেক অনেককাল আগে একদিন স্বর্গরাজ্যের দেবরাজ ইন্দ্র ও আসীব্রহ্মা নামক এক প্রচন্ড শক্তিশালী দেবতা জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধানের উপায় নিয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যা তারা নিজেরা সমাধান করতে পারেননি। তাই তারা ঠিক করলেন যে, মর্ত্যলোকে ‘কওয়ালমইং’ নামক একজন জ্ঞানী ঋষির কাছে গিয়ে এই বিতর্কের মীমাংসা নেবেন। ঋষি যা সমাধান দেবেন তা-ই তাঁরা মেনে নেবেন। কিন্তু যিনি জিতবেন তিনি পরাজিতের মাথা তরবারি দিয়ে কেটে ফেলবেন। মানে রাজ-রাজড়াদের কারবার আরকি! কিছু হল তো গর্দান গেল!
সে যাইহোক,এরপর মর্ত্যে এসে যখন তাঁরা ঋষির কাছে বিষয়টি খুলে বললেন, তখন ঋষি ইন্দ্রের মতটিকেই সঠিক বলে রায় দিলেন। ফলে দেবরাজ ইন্দ্র আসীব্রহ্মার মাথা তরবারি দিয়ে কেটে ফেললেন। কিন্তু আসীব্রহ্মার ছিন্ন মুণ্ড মর্ত্যের কোথাও পড়লে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে তাই সেই মুন্ডু বহনের জন্য সাতজন দেবীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যারা সেটিকে পালাক্রমে বহন করবে।
কিন্তু একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কোলে দেওয়া-নেওয়ার সময় সেই মুণ্ড থেকে প্রচুর পরিমাণ পচা-গলা রক্ত স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে এসে পড়ে। এতে মর্ত্যলোক অপবিত্র হয়ে যায়। তাই এই দিনে দেবরাজ ইন্দ্র নিজ কর্মের দায়বদ্ধতাস্বরুপ দেব-দেবীদের নিয়ে সদলবলে মর্ত্যের মানব-মানবীদের সাথে মিলেমিশে ধোয়া-মোছার কাজে সহযোগিতা করেন। এই দিনে যেমন সকলে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র হয় ঠিক তেমনি স্বর্গলোকবাসী এবং মর্ত্যবাসীদের মধ্যেও মিলন ঘটে বলে মনে করা হয়।
আমার মত সমতলবাসীগণ, চলুন না বর্ষবরণের এই হাওয়ায় আমরা হারিয়ে যাই পাহাড়ে। দেখে আসি নববরণের পাহাড়ি সাঁজি-
চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু/ বিঝু হচ্ছে তিন দিনের একটি ফুল-অন-ফান প্যাকেজ! বিঝু উৎসবটা হচ্ছে তাদের নববর্ষ- মানে পুরনো বছরের বিদায় আর নতুন বছরের জমজমাট ওয়েলকাম পার্টি। বছরের শেষ দুইদিন ও নববর্ষের প্রথম দিনে এই অনুষ্ঠান পালিত হয়।
প্রথম দিন 'ফুলবিঝু'। তাই চলে 'অপারেশন ফুল সংগ্রহ'। গ্রামের সকল ছেলেমেয়ে হয়ে ওঠে ফুল এক্সপার্ট! রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে ফুলতোলা উৎসব কে ঘিরে। এর কিছু দিয়ে তারা নিজেদের সাজায়, কিছু দিয়ে সাজায় ঘর আর বাকিটা? বাকিটা মহাসমারোহে তারা পানিতে ভাসিয়ে দেয়। এটাও প্রথারই অঙ্গ।
দ্বিতীয় দিনকে বলা হয় 'মুল বিঝু'। এইদিন বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করিয়ে পুজা করা হয় এবং মূল আচার হিসেবে বয়োজ্যেষ্ঠদের যেমন ঠাকুর্দা-ঠাকুমা, বাবা-মাকেও স্নান করিয়ে দেয় কমবয়সীরা। আর বয়োজ্যেষ্ঠদের কাজ হচ্ছে কনিষষ্ঠজনদের আশির্বাদ দেয়া।
এদিন হচ্ছে পেটপুরে খাবার দিন। ঘরে ঘরে পোলাও, পায়েস, পাজন/পাচন (বিভিন্ন রকমের সবজি মিশিয়ে তৈরি একরকম তরকারি) রান্না করা হয়। খাও না তুমি কত খাবে!
তৃতীয় দিন 'গইজ্যে পইজ্যের দিন' মানে অবসর বা আরামের সময় বা শুয়ে থাকার দিন। আজ কেউ কাউকে ডাকবে না, কাজ বলবে না- এটা অফিশিয়াল অলসতা দিবস! মজা না?
পুরো তিনদিন-নো মারামারি, নো প্রাণী হত্যা।
মানে শুধু শান্তি, ফুল আর খাবারের রাজত্ব। আনন্দ আর আনন্দ!
যখন চাকমা সম্প্রদায় বিঝুতে ব্যস্ত তখনই, ঠিক তখনই ত্রিপুরা রমনীরা পরেছেন 'রিনাই-রিসা'! কেন কেন? কারন এখনই যে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ে পালিত হচ্ছে বৈসু। তারাও তিনদিন ধরেই এই উৎসবের আনন্দ নিয়ে থাকেন।
এই উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয় হারি বৈসু, দ্বিতীয় দিনকে বৈসুমা এবং তৃতীয় বা শেষ দিনটিকে বলা হয় বিসি কাতাল। মূলত আগামী দিনের সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা হয়ে থাকে এই দিনগুলিতে।
তিন দিনব্যাপী এই বৈসু উৎসবের প্রথম দিন হারি বৈসু। হারি বৈসুতে ঠিক ফুলবিঝুর মতই ভোরবেলা ফুলগাছ থেকে ফুল তোলার হিড়িক পড়ে যায়। সেই ফুল দিয়ে বাড়িঘর সাজানো ও মন্দির ও পবিত্র স্থানগুলোতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
নারীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'রিনাই-রিসা' পরেন এবং তরুণ-তরুণীরা মেতে ওঠে ঐতিহ্যবাহী 'গড়িয়া নৃত্য' ও 'বৈসু নৃত্য' পরিবেশনায়।
এছাড়া রয়েছে পানি খেলা। এটা হচ্ছে তাদের চুড়ান্ত আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। সবাই সবাইকে পানি ছিটাবে, কেউ বাদ পড়বে না- বড়, ছোট, শিশু, বৃদ্ধ কেউ না। কিন্তু তরুণ-তরুণীদের জন্য এই পানিখেলা হচ্ছে প্রীতি বা ভালোবাসার খেলা। কখনও কখনো জলপূজার পর এই খেলা শুরু হয়।পুরোনো বছরের দুঃখ, গ্লানি ও পাপ ধুয়ে ফেলে,নতুন বছরকে পবিত্র ও আনন্দময়ভাবে শুরু করার মানসিকতায় এবং একই সাথে মানুষে মানুষে বন্ধন ও ভালোবাসা বাড়ানোর জন্য হাসি, গান আর আনন্দ নিয়ে এ খেলা খেলা হয়ে থাকে।
ত্রিপুরা সম্প্রদায়েও চাকমাদের মতই ‘গণত্মক বা পাচন’ রান্না চলে প্রায় ঘরে ঘরে যা ২৫ থেকে ৩০ ধরনের সবজির মিশ্রণে রান্না করা হয়। খাবার তো নয় যেন সব্জির মহাসমাবেশ! এটাও তাদের ঐতিহ্য। এছাড়া পিঠা, সেমাই, মুড়ি-মুড়কি, চানাচুর, বিভিন্ন ধরনের ফল ও ঠান্ডা পানীয় তো থাকছেই।
ত্রিপুরা জনগোষ্ঠির ঐতিহ্যবাহী খাম নৃত্য
বৈসু উৎসবে মেতেছে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠি
মারমা সম্প্রদায় বাংলা নববর্ষের সাথেই প্রতিবছর এপ্রিলের ১৩-১৫ তারিখে পালন করে বর্ষবরণ উৎসব যাকে নিজভাষায় তারা বলে 'সাংগ্রাই'। এপ্রিল মাস তাই প্রচন্ড গরম চারিদিকে। এটাই তো পানিখেলার মোক্ষম সময়। তাই তারা বর্ষবরণকে উপলক্ষ করে আনন্দে মেতে ওঠে।
মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবে জলকেলি
তিনদিনব্যাপি এই উৎসবের প্রথম দিন 'পাইন ছোয়াইক' বা ফুল তোলা। এখানেও বাচ্চারা ভেঙে পড়ে ফুল তুলতে। আনন্দের লহরি বয়ে যায়।
দ্বিতীয় দিনে আসে ‘সাংগ্রাইং রাইকু বা আইক্যা’। এ দিনটি সাংগ্রাইং দেবীর আগমন দিবস। এদিনের মূল ক্রাইটেরিয়া হচ্ছে ভোর থেকে রাত অবধি ঘরে ঘরে চলা প্রবীণ পূজা।
'সাংগ্রাইং আপ্যাইন’ হচ্ছে উৎসবের শেষ দিন। এটি দেবীর প্রত্যাবর্তন দিবস। এদিনেই তাদের আনন্দ হয়ে ওঠে বহুগুন বেশি। সময় হয় 'রিলংবোয়ে' বা পানিখেলার।
মারমাগণ সামাজিকভাবে 'রিলংবোয়ে' বা জলকেলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। যুবক-যুবতীদের মাঝে এ অনুষ্ঠান সামাজিক ঐক্য, সম্প্রীতি, প্রেম-ভালোবাসায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
কিন্তু এই জলকেলিরও কিছু নিয়ম আছে যা শক্তভাবেই পালিত হয়। পআনি ছিটানোর আবার নিয়ম? হ্যা, অবশ্যই।
পানি নিক্ষেপে কোনো ঝগড়া-বিবাদ করা যায় না।কৌনিক বা আড়াআড়িভাবে পানি নিক্ষেপ নিষেধ। অনুষ্ঠান চলাকালে কেউ কোনো অশোভন, অশালীন বা অশ্লীল আচরণও করতে পারে না। মানে আনন্দ হবে ফুল প্যাকেজে কিন্তু শালীনতার সাথে। সুন্দর না ব্যাপারটা?
এছাড়া বৌদ্ধ মন্দিরে বিশেষ পূজা, বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করানো এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের মৈত্রী স্নান (স্নান করিয়ে বস্ত্রদান) করানো হয়। বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের আপ্যায়ন করা হয়।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের এ সময়ে আছে 'সোহরাই' উৎসব। 'শাহার' থেকে এসেছে বলে মনে করা শব্দটির অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া। কৃষিভিত্তিক সমাজে ধন-সম্পত্তি ও গরু-বাছুর বৃদ্ধির জন্য বিশেষ আচার পালনের মাধ্যমে বোঙ্গা বা দেবতাদের কাছে বর চাওয়া হয় বলে এই নামকরণ হয়েছে।
আবার এও বলা হয়, ‘সোহরাই’ শব্দের অর্থ ‘স্নেহ করা ও আদর করা’। এই উৎসবটি গবাদি পশুকে আদর করা, তাদের যত্ন নেওয়া এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ওপর ভিত্তি করে পালিত হয়। এটি মানুষ ও গবাদি পশুর সম্পর্ককে তুলে ধরে-যেখানে গবাদি পশুকে শুধু কাজের উপকরণ হিসেবে নয়, বরং পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখা হয়। একে 'গরুর উৎসবও' বলা হয়। নানা আচার-অনুষ্ঠান, আনন্দ প্রকাশের মাধ্যমে উৎসবটি পালিত হয়।
ম্রো বা মুরংরা বলে 'চাংক্রান পোয়ে'। ফুল দিয়ে ঘর-বাড়ি সাজিয়ে, প্রবীণদের আশীর্বাদ নিয়ে, ঘিলা খেলা খেলে, পাঁজন খেয়ে তারাও আনন্দে বর্ষবরণ করে থাকে।
ম্রো জনগোষ্ঠির চাংক্রান পোয়ে উৎসব
যে জনগোষ্ঠী যেভাবেই নববর্ষ পালন করুক না কেন, এতে মিশে রয়েছে একাত্মতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ। যা পাহাড়ের বাসিন্দাদের করে তুলেছে আরো আকর্ষনীয় ও প্রশংসার যোগ্য। নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে পাহাড়ি বাসিন্দা হিসেবে তাদের এই পরিচয় বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সবচাইতে বড় প্রমান।








পাঠকের মন্তব্য