মাদল বাজে বিহুর সুরে

১৫ পঠিত ... ৮ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে

পাঁচ বছরের দিনু লাফিয়ে উঠে পড়ল ঘুম থেকে। কাল সারারাতই তার ঘুম হয়নি উত্তেজনায়। কদিন ধরেই হচ্ছে না। আজ বিহু গো বিহু! আজ কি ঘুমের দিন গো? আজ যে ঘুইরা বেড়াইবার, রঙ খেইলবার, পানি ছিটাইবার আর খাইয়া বেড়াইবার দিন গো! কতদিন ধইরা বইসা আছে সে!

তার আইতা (দাদি) তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কিসের কী? দিনু হচ্ছে এলাকার রকেট। তাকে ধরে রাখা কি যেমন তেমন কাজ? আর সে তার দলের সর্দার। সর্দার কি আর হেলু-ভুলো, ন্যালা-খ্যাপা হয় গো? আইতাটা কি বোকা! দিনু একটু হেসে উঠল।

সে ছুট লাগালো। মাত্র ঊষা ফুটছে। হাতে অনেক কাজ। আজ সারাদিন পাগল-ব্যস্ত সে আর তার দল। সে একে একে নিবির, অভিজিৎ, রুপজ্যোতি, বর্ণালী, গিয়ানা, নাসীন, হিমাঙ্গী, ঈশান, অজয় সকলের বাড়িমুখে দৌড়ালো আর চিৎকার করে সকলের নাম ডেকে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যেই তার দলবল তার সাথে জমায়েত হয়ে গেল। আজ বাড়ি থেকে কাউকেই কিছুই বলবে না। আজ বিহু পরব যে!

তাদের বছর শুরু হয় যে উৎসব দিয়ে তাকে তারা বলে 'বহাগ বিহু বা রঙ্গালি বিহু'। এই বিহু চলে সাতদিন একটানা। চ'ত বিহু, রাতি বিহু, গরু বিহু, মানুহ বিহু, কুটুম বিহু, মেলা বিহু, চেরা বিহু নামে এই উৎসবের দিনগুলো তাদের মাঝে পরিচিত। এর মধ্যে তারা গবাদি পশুদের ধুইয়ে-মুছিয়ে খাইয়ে দাইয়ে তুষ্ট করে, বয়ো:জেষ্ঠদের সম্মান করে পুজো দেয়, কুটুমদের কুটুম্বিতা রক্ষা করে আর হাসি-আনন্দ, গানে মেতে ওঠে।

দিনু মানে দীননাথ সকলকে আজ কি কি কাজ তা বুঝিয়ে দিয়ে কাজ ভাগ করে দিল। এরই মধ্যে রুপামাহী (মাসি) এসে কইল, ওরে আমার সোনাই রুপাই।  আমার সোনাবাবারা, আমায় একটু জুঁইফুল তুলে এনে দে!
: কি করিবে লো মাহী?
: আর বলিস ক্যানে, খোঁপায় গুজব ওবেলায় বাবা। ওবেলায় রোদ্দুরে ফুল মরো মরো হয়ে যাবে। তখন এনে লাভ হবে না বাবারা। সেইতা মাথায় দেয়া যাবে না। এনে দে না বাবা, মেঠাই দোবখন তোদের সক্কলকে।
: ঠিক আছে গো মাহী। কিন্তু শুধু মেঠাই দিয়ে পার পাবে না গো তুমি। তিল পিঠা, ঘিলা পিঠা, লারু আর জলপান দিতে হবে। আর জলপান তুমি বানয়ে দেবে গো।

সকলে সমস্বরে হইহই করে উঠল। সকলে জানে  রুপামাহীদের বাড়ির সব খাবার এ গ্রামে সবচেয়ে স্বাদ। আর রুপামাহী চিড়া-গুড়-দই দিয়ে নিজে হাতে যে জলপান বানায়... আহা আহা... তার কোন তুলনা নেইকো। তাই ছানাপোনার দল রুপামাহীর সকল কাজ করে দিয়ে তাদের বাড়ির লারু-মুড়কি নিয়ে আর তার হাতে মাখানো জল পান খেয়ে তৃপ্তি নিয়ে ফেরে। মুখে তুলে খাইয়ে দেবে মাহী নিজেই। রুপামাহী  বড্ড আদর করে ওদের। আর দিনু তো তার জান!

মাহী হেসে ফেলে বললে, ওরে আমার ছুচোর দল, দি না আমি তোদের ফি বার এসব করে খাইয়ে যে আবার মনে করায়ে দিতে লাগ্যাছিস? দোব দোব এখন তুরা এগ্যে যা না হুড়ো করে।

দিনু তার দলবল নিয়ে হইহই রইরই করে এগিয়ে গেল। পথেই  বিজয় কাকুর সাথে দেখা। কাকু এই ভোরবেলাতেই গ্রাম সাজাতে লেগে গিয়েছে। সারা গায়ে ঝুলছে তার  রঙ্গীন কাগজের ঝালর। কাকু নিজেই এখন একটা দ্রষ্টব্য। দিনু আর তার দলবল নিজেদের ভেতরেই একটু করে হেসে নিচ্ছে অমনি কাকু হাক দিল,
: ওরে দিনু, তোরা যে এমনিই টইটই  করে বেড়াচ্ছিস রে। আমার সাথে হাত না লাগালে আজ কেন, আগামী তিন দিনেও যে সাজ শেষ হবে না জানিস নে তা? জলদি করে আয় শিগগির!

দিনু রুপো, অভি আর হিমাঙ্গীকে কাকুর সাথে লাগিয়ে দিয়ে নিজে বলল, তুই ওদের দিয়ে করাতে লাগ কাকু, আমি এই এলাম বলে।
বলেই সে বাকিদের নিয়ে ছুটল। সকলের গরু-বাছুর বের করে নিয়ে আসছে। তাদের ধীরে ধীরে নদীর দিকে নিয়ে গোসল করানো হবে। তবে তার কিছু দেরি আছে। তার আগেই দিনুর হাতের কাজগুলো শেষ করতে হবে। নইলে গরুবিহুর পরবের মজা দেখতে পাবে না।

সে বাকিদের বলল, ওরে হুড়ো করে চল।

বেশি বলতে হল না। ওদের প্রাণেও ওর মতই তাড়া। রুপামাহীর ফুল তুলে, বিজয় কাকুর ঝালর সাজিয়ে তবেই নদীর দিকে দৌড়ুতে হবে তাদের। যেতে পথে পুণ্যি জেঠাই কোচড় ভরে লারু-মুড়কি দিয়ে দিলে। তাই সকলে মিলে চিবাতে চিবাতে কাজ করতে লেগে গেল ওরা।

কাজ শেষ হল এক সময়ে আর দিনুরা সকলে মিলে বিহুর গান গাইতে গাইতে নদীর দিকে গেল।
' কুলিয়ে নেমাতিলে বহাগ বিহু নাহে....'

দেউতার (বাবার) সনে ককাই (বড় ভাই) মাঠে গিয়েছিল। তারা ফিরেছে বলে মা ডাক পাড়ছে দিনুকে। খেয়ে যেতে বলছে। দিনুর যাবার মন নেই। তার দল মিলে বিকেলের রঙ খেলার সরঞ্জাম গুছাচ্ছে। কিন্তু মা ডাকছে। সবাইকেই  সবার বাড়ি থেকে ডাকছে। একসাথে খাবে সবাই। সবকিছু এককোণে  রেখে বাড়ির পথ ধরল ওরা।

বাড়ি এসে দেখল দেউতা(বাবা), মা, ককাই(বড় ভাই), ভনী(ছোট বোন), আতা(দাদা), আইতা(দাদি) সকলে তার জন্য অপেক্ষা করছে। উফফ! মা রেঁধেছেও কত কি! জিভটা জলে টইটুম্বুর  হয়ে গেল দিনুর।

চিড়া-মুড়ি, বোরা চাউল(আঠালো ভাত), কোমল চাউল, মাসর টেঙা( মাছের টক ঝোল), হাঁসের মাংস, বাঁশ কোড়ল, পইতা ভাত(পান্তা ভাত) কি নেই। পিঠা-পুলি তো আছেই।

দেউতা তাকে দেখে দুহাত পেতে দিলে। সে ঝাপ দিয়ে গিয়ে বাপের কোলের মধ্যে পড়ল। বাপ তাকে হামহুম শব্দ করে করে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলেন। বাপের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে সে ককাইয়ের গলা ধরে ঝুলে পড়ল।

: ও ককাই! এনেছিস আমার তা? দিবি নে ককাই?

:কি আনব রে ভাইটি? কিছু কহেছিলিস তুই আননের লিগে? মোর তো মনে পইড়ছে নারে।

: ও দেউতা! ককাই কিছু আনে নি মোর লিগে?

: ককাইয়ের কাছেই সুনে দ্যাখ! হামায় তো আর বলিস নি কি লাইগবে তোর! হামি কেনে(কিভাবে) করে জাইনব কি লাইগবে তোর?

: ও মা!...

ওমনি ককাই ঝোলা থেকে নতুন ঘুড়ি আর নাটাইটা বের করে দিলে। সকলে হেসে উঠলে। খুশিতে নাচতে লাগলো দিনু। তাই দেখে তার ভনীও হাততালি দিতে দিতে হেসে গড়িয়ে পড়তে লাগল।

সবার সাথে খাবার শেষ করে, বড়দের পুজো দিয়ে শেষ করে রঙ খেলায় নামল দিনু আর তার দল। সবাই রঙ খেলছে। এ ওর গায়ে রঙ মেখে দিচ্ছে, সে তার গায়ে পিচকিরিতে রঙ ছিটোচ্ছে। সবাই হাসছে, গান গাইছে, নাচছে। আকাশে বাতাসেও আজ আনন্দ আর আনন্দ। রঙ মেখে ভুত হয়ে গেছে সবাই। দিনুরা নিজেদেরই দেখছে আর হাসছে।

এবার হবে পানি খেলা। সে যে আরও মজা! যে যাতে করে পারছে সবাইকে পানি ছিটাচ্ছে। রুপামাহী অনির্বাণ কাকুকে পানি মেরে দিল বালতিতে করে। এব্বাবা... অনির্বাণ কাকু তো  পানি ভরা ড্রাম নিয়ে এলো মাহীকে মারতে। রুপামাহী  একছুট্টে পালাল। সব্বাই জানে আসছে মাসে ওদের 'বিয়া' হবে। সন্ধ্যামাহী, বিজয়ামাহী, তৃষণাপেহী(ফুপু), বিজয় কাকু, শৈলেন মামা, টিপাই কাকু সবাই পানি মারছে। কোত্থাও পালাবার জায়গা নেই। ও বাবা, ওদিকে দেখি আতা- আইতা, দেউতা-মা, রাঙা মামা-মামী, অজিত জেঠু-পুন্যি জেঠাই সবাই পানি খেলছে। দিনুরা ছুটে ছুটে সকলকে পানি মেরে বেড়ালো, নিজেরাও অন্যের পানিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। সবাই গান ধরেছে-

জগৎ জুড়ি বিহুর পরব
খুসি যে ছড়ায়
বসন্তের এই বিহুর লগন
উত্তাল হয়ি যায়।

বিহুর এ লগন, মধুর এ লগন
আকাশে বাতাসে লাগিল রে
চম্পা ফুটিছে, চামেলি ফুটিছে
তার সুবাসে ময়না আমার মাতিল রে।।

সন্ধ্যা নেমে গেল পানি খেলা শেষ হতে না হতেই। ধীরে ধীরে সবাই বাড়ির পথ ধরল। দিনু অজয়, ঈশান, অভিজিৎ সবার সাথে পরামর্শ করে নিল যে কাল কোন সময়ে তারা ঘুড়ি উড়াবে। গিয়ানা, হেমাঙ্গীদের সাথে চড়ুইভাতির সময়টাও ঠিক করে নিতে হবে কাল। কিন্তু পইতা ভাত খেয়ে বড্ড ঘুম পাচ্ছে আজ। সেও বাড়ির পথ ধরল।

মা তাকে মুছিয়ে সাফ-সুতরো করে দিলে। দিনু বিছানায় লুটিয়ে পড়ল অমোঘ ঘুমের দেশে। আর তার স্বপ্নে আবারও বিহুর মজা ঘুরে ঘুরে আসতে লাগলো।

১৫ পঠিত ... ৮ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top