২০১৫ সাল। মেয়ে নিখোঁজ। বাবার দৌড়াদৌড়ির যেন কোনো শেষ নেই। কখনও থানায় যান, কখনও তদন্ত সংস্থায়। আবার কখনও তাকে দেখা যায় আদালত প্রাঙ্গণে। কিন্তু মেয়ের কোনো খোঁজ নেই। সাত বছর ধরে এই দৌড়াদৌড়ি চলছে। দীর্ঘ এই সময়ে থানা-পুলিশ, ডিবি, পিবিআই ও সিআইডি, এই চারটি সংস্থা তদন্ত করেও বিষয়টির কোনো সমাধান পায়নি। প্রতিটি সংস্থা থেকেই তদন্ত করে জানানো হয়, নিখোঁজের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু বাবা তা মানতে নারাজ। চারবারই তিনি নারাজি জানান।
এই তদন্ত চালাতে গিয়ে তিনি ঋণ করেছেন, জমিজমা বিক্রি করেছেন। বারবার মেয়ের জামাইয়ের ওপর সন্দেহের কথা জানিয়েছেন। এরপর আবার আদালতে আবেদন করেন। এবার আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে পিবিআইকে (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) মামলাটি পুনরায় তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মেয়েটির নাম ছিল পারুল আক্তার। আর তার খোঁজে ঘুরে বেড়ানো বাবার নাম মো. কুদ্দুছ মিয়া। ২০১২ সালের ২৮ মে বাসা থেকে পালিয়ে একই গ্রামের নাসির উদ্দিন বাবুকে বিয়ে করেন পারুল। এরপর তিন বছর তারা ঢাকার আশুলিয়ায় বসবাস করেন। ২০১৫ সালে পারিবারিক ঝামেলা হলে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন পারুল। তার বাবা তাকে ফিরে আসতে বলেন। বাবার কথায় ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই স্বামীর সংসার ছেড়ে টাঙ্গাইলে ফিরে যান পারুল।
এরপর রহস্যজনকভাবে পারুল নিখোঁজ হন। ২৮ জুলাই আশুলিয়ায় পারুলের বাসায় গিয়ে নাসিরকে পেলেও মেয়ের খোঁজ পাননি বাবা। নাসির সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় তিনি টাঙ্গাইলে ফিরে মামলা করেন।
যখন পিবিআইকে আদালত আবার তদন্তের দায়িত্ব দেয়, তখন তারা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তদন্ত শুরু করে। এবার বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং পারুলের স্বামীর করা জিডির তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। আর তাতেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যায়, পারুলকে আর কেউ নয়, বরং তার বাবাই একজন ভাড়াটে খুনির সহায়তায় হত্যা করেছেন।
পারুল বাসা থেকে বের হওয়ার আগে যে ফোন নম্বর দিয়ে তার বাবার সঙ্গে কথা বলেছিল, পিবিআই সেটি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। দেখা যায়, সিমটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় তা পুনরায় বিক্রি হয়ে গেছে এবং বর্তমান ব্যবহারকারী একজন গার্মেন্টসকর্মী। নম্বরটি আগে পারুলের বাবার কাছেই ছিল। তবে পারুলকে হত্যার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে এই নম্বরের বিষয়টি পারুলের পরিবার সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। পরবর্তীতে পুলিশ পারুলের পরিবারের ২২ জন সদস্যকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সেই রহস্যময় মোবাইল নম্বরটির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়।
নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করায় পারুলের ওপর তীব্র ক্ষোভ ছিল বাবা কুদ্দুছ মিয়ার। তার ধারণা ছিল, মেয়ের এই সিদ্ধান্তে সমাজে তার সম্মান নষ্ট হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি মেয়েকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন।
এই নৃশংস কাজে সহায়তার জন্য তিনি ভাড়াটে খুনি ও ডাকাত মোকাদ্দেছের সঙ্গে হাত মেলান। হত্যার জন্য বেছে নেওয়া হয় জয়পুরহাটের তুলসীগঙ্গা নদীর এক নির্জন পাড়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুদ্দুছ মিয়া পারুলকে মিথ্যা আশ্বাস দেন।তাকে নতুন করে ভালো এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে। বাবার কথায় বিশ্বাস করে ২২ জুলাই পারুল তার সঙ্গে জয়পুরহাটে রওনা হন।
সেই রাতেই নদীর পাড়ে পারুলকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছ ও কুদ্দুছ মিলে ওড়না দিয়ে তার হাত-পা বেঁধে ফেলেন। এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। লাশটি নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে তারা রাতেই টাঙ্গাইলে ফিরে আসেন। এভাবেই তথাকথিত সম্মানের দোহাই দিয়ে এক বাবা নিজের সন্তানের হত্যাকারীতে পরিণত হন।
২০২২ সালের ১১ ডিসেম্বর পারুলের স্বামী নাসির উদ্দিন ও তার এক মামাকে অভিযুক্ত করে আশুলিয়া থানায় মামলা করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে পিবিআই তাদের দুজনকে গ্রেপ্তারও করে। তবে নিবিড় তদন্তে দেখা যায়, এই হত্যাকাণ্ডে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
বরং তদন্তের মোড় ঘুরে যায় মামলার বাদী কুদ্দুছ মিয়ার দিকেই। বেরিয়ে আসে, তিনিই এবং তার সহযোগী ভাড়াটে খুনি মোকাদ্দেছ এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর। সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর পিবিআই নাসির উদ্দিনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে কুদ্দুছ মিয়া ভেঙে পড়েন এবং নিজের দোষ স্বীকার করেন। তিনি জানান, তিনিই তার মেয়েকে হত্যা করেছেন এবং প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেন।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পিবিআই পারুলের লাশের সন্ধানে নামে। কুদ্দুছ মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা পাঁচবিবি থানার পুরোনো নথি ঘেঁটে দেখেন, ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই তুলসীগঙ্গা নদী থেকে এক অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় ২০১৯ সালে মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহটি পারুলের বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন জানানো হয় এবং পুনঃতদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কুদ্দুছ মিয়া ও মোকাদ্দেছকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। বর্তমানে বগুড়ার আদালতে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সমাজে বসবাস করতে গেলে অনেক কিছু আমাদের মেনে চলতে হয়। এর মধ্যে একটি শব্দ হলো ‘সম্মান’। কিসে সম্মান যাবে আর কিসে যাবে না—এ নিয়ে সমাজে নানা ধারণা প্রচলিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সম্মানের মূল্য কি একটি জীবনের চেয়েও বেশি?
হয়তো স্বাভাবিকভাবে আমরা বলব, না, কোনো কিছুই জীবনের চেয়ে বড় নয়। জীবন অমূল্য। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন। মানুষ কখনও কখনও তুচ্ছ কারণে এই অমূল্য জীবনকে মূল্যহীন করে দেয়। আপনজনের জীবন নিতে দ্বিধাও করে না।
এমনই এক ভয়াবহ বাস্তবতা হলো ‘অনার কিলিং’। নামটি যতই আড়ম্বরপূর্ণ শোনাক, এটি অত্যন্ত জঘন্য একটি অপরাধ। যে ধরনের হত্যাকাণ্ড সম্মানের অজুহাতে সংঘটিত হয়, সেগুলোকেই অনার কিলিং বলা হয়। সহজভাবে বললে, সম্মানহানি হয়েছে, এই ধারণা থেকে কাউকে হত্যা করাই অনার কিলিং।
সাধারণত পালিয়ে বিয়ে, সামাজিক বৈষম্য, ধর্ষণ বা বিয়েতে অমত, এসব কারণে এমন ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী হলেও পুরুষরাও এর শিকার হতে পারে।
বাংলাদেশে অনার কিলিং তুলনামূলক কম হলেও পারুলের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়।মিথ্যা সম্মানের মোহে মানুষ কখনও কখনও কতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে।



পাঠকের মন্তব্য