আনা ফ্রাঙ্ক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে এক কিশোরীর সাক্ষ্য

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে

জুন মাসের এক রৌদ্রস্নাত সকাল। ১৯৪২ সাল।

আমস্টারডাম শহরের একটি বাড়িতে তেরো বছরের একটি চঞ্চল মেয়ে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠল। আজ তার জন্মদিন। তরতরিয়ে নেমে এলো সে বিছানা থেকে। উপহারের স্তূপ দেখে দাঁত মেলে হাসল। সেখান থেকে সে টেনে নিল লাল-সাদা চেক কাপড়ে বাঁধানো একটি ডায়েরি। মেয়েটির নাম আনা। আনা ফ্রাঙ্ক।

ডায়েরিটা তার খুব পছন্দ হলো। সেটাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সে হাসল। মনে মনে বলল,

আজ থেকে তুমিই আমার সব গোপন কথার বন্ধু। তোমার নাম কী দেওয়া যায় বলো তো? কিটি? কিটি হলে কেমন হয়? ‘কিটি’ কিন্তু আমার খুবই পছন্দের।

ও আচ্ছা, তোমাকে তো বলাই হয়নি সে কে। ওই যে বাবা আমায় সিসি ভ্যান মার্ক্সভেল্ডের কিশোর উপন্যাসগুলো কিনে এনে দেন, ওর ভেতর আছে কিটি ফ্রাঙ্কেন। তুমি হবে না আমার ওই কিটি? আমি জানি তুমি হবে।

তো যাই হোক, আনা চিন্তা করল, প্রতিদিন কী ঘটছে তা সাধারণ মানুষের মতো লিখে রাখাটা খুবই বিরক্তিকর। তাই সে কল্পনা করে নিল যে সে তার খুব কাছের কোনো বন্ধুকে চিঠি লিখছে। তাই সে লেখা শুরু করত ‘ডিয়ারেস্ট কিটি’ দিয়ে আর শেষ করত ‘তোমারই আনা’ লিখে।

কিন্তু আনা জানত না, এই ডায়েরিটাই হতে যাচ্ছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কারণ এর কয়েক দিন পরেই শহরের রাস্তায় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বুটের আওয়াজ আর ইহুদিদের ধরে নিয়ে যাওয়ার চিৎকার ভারী হয়ে উঠল। তারা আনার বোন মার্গটকে খুঁজতে শুরু করায় বাবা অটো ফ্রাঙ্ক বললেন,

আমাদের এখনই লুকিয়ে পড়তে হবে।

ফ্রাঙ্ক পরিবার এরপর গিয়ে আশ্রয় নিল অটো ফ্রাঙ্কের অফিসের পেছনের একটি গোপন অংশে, যার নাম ছিল ‘সিক্রেট অ্যানেক্স’। একটি চলন্ত বইয়ের আলমারি দিয়ে ঢাকা ছিল সেই ঘরের প্রবেশপথ। আলমারিটা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেই বাইরের পৃথিবী স্তব্ধ।

এখন একটু কল্পনা করো, একটি ঘরে তুমি বন্দি, যেখানে দিনের বেলা তুমি জোরে শ্বাস নিতে পারো না, কাশতে পারো না, এমনকি বাথরুমের ফ্লাশটাও ব্যবহার করতে পারো না! জুতো পায়ে হাঁটতে পারো না। কারণ সামান্য একটু শব্দ হলেই নিচের অফিসের লোকেরা জেনে যাবে, আর পরমুহূর্তেই পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাবে।

আনা ও তার পরিবারসহ মোট আটজন মানুষের জীবন আটকে গেল অ্যানেক্সের এই দমবন্ধ করা খাঁচায়। বাইরে তখন বোমা পড়ছে, সাইরেন বাজছে। আর ভেতরে?

ভেতরে আনা জানালার একটি ছোট্ট ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই, কিন্তু আনার মন তো বন্দি নয়! সে তার কল্পনার ডানা মেলে দিল ডায়েরির পাতায়, বন্ধুর কাছে।

সে লিখল তার একঘেয়েমি, তার রাগ, মায়ের সঙ্গে অভিমান, আর ওই ছোট ঘরে তাদের সঙ্গেই বসবাসরত পিটার নামের এক কিশোরের প্রতি তার ভালো লাগার কথা। থাকত খাবারের সংকট, নাৎসিদের ভয়ে প্রতি মুহূর্তে কেঁপে ওঠার পাশাপাশি তার বড় হওয়ার স্বপ্ন, লেখক হওয়ার ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। ডায়েরি লিখতে লিখতে আনা ভুলেই যেত যে সে একটি অন্ধকার ঘরে আটকে আছে। সে লিখেছিল,

আমি যখন লিখি, তখন আমার সব কষ্ট দূর হয়ে যায়, আমার মন আবার সাহসে ভরে ওঠে!

দৃশ্যপটে ১৯৪৪ সাল, আগস্ট মাস। টানা দুই বছর (প্রায় পঁচিশ মাস) ধরে আনারা বেঁচে আছে এই বন্দিদশায়। তারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল যে যুদ্ধ বোধহয় এবার শেষ হবে, তারা আবার মুক্ত আকাশে শ্বাস নেবে।

কিন্তু মুক্ত আকাশের স্বপ্ন হয়তো আর তাদের পূরণ হওয়ার ছিল না। এক ডাচ ব্যক্তি কিছু টাকার লোভে নাৎসিদের কাছে তাদের খবর দিয়ে দিল।

৪ আগস্ট, ভারী বুটের শব্দে কেঁপে উঠল পুরো অ্যানেক্স। পুলিশ এসে সবাইকে ধরে নিয়ে চলল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের দিকে।

ঘর খালি হয়ে গেল। ছিটকে পড়ে রইল আনার সাধের ডায়েরিটা, মেঝের ধুলোয়। নাৎসিরা হয়তো ভেবেছিল তারা আনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তারা জানত না, আনার আসল আত্মাটা ওই ডায়েরির পাতায় রয়ে গেছে, যা ধ্বংস করার ক্ষমতা আর কারও নেই।

যুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু আনার আর ফেরা হলো না। মাত্র পনেরো বছর বয়সে, মুক্তির আলো দেখার ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে, বন্দিশিবিরের অমানুষিক নির্যাতন, ক্ষুধা আর টাইফাসে ভুগে নিজের স্বপ্নগুলোকে অপূর্ণ রেখেই হারিয়ে গেল আনা। আটজনের মধ্যে কেবল তার বাবা অটো ফ্রাঙ্ক বেঁচে ফিরেছিলেন।

তিনি যখন সেই গোপন আস্তানায় ফিরে এলেন, তাদের এক শুভাকাঙ্ক্ষী ডাচ রমণী আনার সেই কুড়িয়ে পাওয়া ডায়েরিটা তাঁর হাতে তুলে দিলেন।

ডায়েরিটা পড়তে পড়তে অটো ফ্রাঙ্কের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি ডায়েরির পাতায় দেখতে পেলেন এক অদম্য, সাহসী আর স্বপ্নবাজ আনাকে, যে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানুষকে বিশ্বাস করেছিল, লিখেছিল,

সব নৃশংসতা সত্ত্বেও, আমি এখনো বিশ্বাস করি যে মানুষ মনের দিক থেকে আসলে ভালো।

মেয়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে ১৯৪৭ সালে অটো ফ্রাঙ্ক ডায়েরিটি বই আকারে প্রকাশ করেন, যার নাম হয় The Diary of a Young Girl।

নাৎসিরা আনাকে বন্দি করতে পেরেছিল, কিন্তু তার স্বপ্নকে নয়। আজ এত বছর পরেও, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যখনই সেই ডায়েরি খোলে, আনা ফ্রাঙ্ক আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে যেন আমাদের দেখায় বিশ্বাসের স্বপ্ন, ভরসার হাতছানি।

পঠিত ... ২ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top