আ ক্রিসমাস ক্যারল: চার্লস ডিকেন্সের যে উপন্যাস বদলে দিয়েছিল ব্রিটিশ সমাজ

৪৫ পঠিত ... ৬ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে

আধপাগলা এক ঔপন্যাসিকের কামরা। কেউ নেই, তিনি নিজে ছাড়া। অথচ ঘর থেকে অন্তত তিনজন আলাদা মানুষের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কাজের মেয়েটি ঘর ঝাড় দিতে গিয়ে আতঙ্কে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে এল। সে প্রায়ই সাহেবের ঘর থেকে অপরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, যদিও বাড়িতে কোনো অতিথি আসেননি। কী আজব ব্যাপার!

এদিকে নিজের কামরায় চার্লস ডিকেন্স তাঁর লেখার টেবিলের কাগজ, দোয়াত-কলম আর বাকি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় গুছিয়ে রাখছেন। এমনটা ছাড়া তিনি একেবারেই লিখতে পারেন না। একটু দূরে বসে আছে তাঁর একসময়ের প্রিয় পোষা কাক গ্রিপের স্টাফড মমি।

আজ তাঁর মেজাজ সপ্তমে উঠেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় দেখা যাচ্ছে ১৮৪৩ সাল। সরকারি একটি রিপোর্ট আজ তাঁর হাতে এসেছে। সেখানে উঠে এসেছে লন্ডনের বিভিন্ন কয়লাখনি ও কলকারখানায় চলা অমানুষিক শিশুশ্রম ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র। রিপোর্টটি এক ধাক্কায় তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে নিজের শৈশবে। সেই শৈশব তাঁর কাছে এক দুঃস্বপ্ন। কী কঠিন সময়ই না কেটেছিল তাঁর!

তিনি সারা ঘরময় পায়চারি করছেন। রাগে যেন তাঁর মাথা ফেটে যাচ্ছে। কবে বন্ধ হবে এই অমানবিকতা? আর কত? কত শিশুকে নিজের শৈশব মাটিচাপা দিয়ে জীবন বাঁচাতে হবে? তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে। নইলে বিবেকের দংশনে তিনি টিকতে পারবেন না।

প্রথমে তাঁর মাথায় এলো, প্রতিবাদ হিসেবে একটি রাজনৈতিক লিফলেট বা প্যামফ্লেট লিখবেন। সেই ভাবনা নিয়েই খসড়া তৈরি করতে লাগলেন মনে মনে। কিন্তু কোনোভাবেই তা তাঁর মনঃপূত হলো না। মনে হতে লাগল, এতে প্রতিবাদ করা হবে ঠিকই, কিন্তু তাতে স্থায়ী কোনো প্রভাব পড়বে না। মানুষ হয়তো দেখবে, আলোচনা করবে, তারপর ভুলেও যাবে। তাঁকে এমন কিছু করতে হবে, যা মানুষ চাইলেও ভুলতে পারবে না।

হ্যাঁ, তিনি লিখবেন। তিনি তো ঔপন্যাসিক। তিনি উপন্যাসই লিখবেন।

ব্যস, যেই চিন্তা সেই কাজ। তিনি বসে গেলেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এমন এক সাহিত্যকর্ম রচনা করতে, যা অমর হয়ে থাকবে যুগের পর যুগ।

এরপর শুরু হলো চরিত্র-চিত্রণ।

তাঁর গল্পের প্রধান চরিত্র এবেনিজার স্ক্রুজ। একজন অত্যন্ত ধনী কিন্তু চরম কৃপণ, নিষ্ঠুর ও একাকী বৃদ্ধ। তিনি ক্রিসমাস বা উৎসবের আনন্দকে ঘৃণা করেন, কারণ তাঁর কাছে এগুলো অপ্রয়োজনীয় অর্থব্যয় ছাড়া কিছু নয়।

এই চরিত্রটি তৈরি হয়েছিল জন এলওয়েস নামের এক বাস্তব ব্যক্তির আদলে। তিনি ছিলেন ব্রিটেনের একজন ধনী সংসদ সদস্য। কিন্তু কৃপণতার জন্য তাঁর খ্যাতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি ছেঁড়া কাপড় পরে থাকতেন, এমনকি খাবার নষ্ট হবে ভেবে পচা মাংসও খেতেন। তাঁর কৃপণতার গল্প সে সময় এতটাই বিখ্যাত ছিল যে ডিকেন্স নিজের প্রধান চরিত্রের অনেক বৈশিষ্ট্য তাঁর কাছ থেকেই নিয়েছিলেন।

অন্যদিকে স্ক্রুজের অফিসের কেরানি বব ক্র্যাচিট ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর মানুষ। অত্যন্ত সৎ, পরিশ্রমী ও নিরহংকার হয়েও তিনি বঞ্চনার শিকার হতেন। তবু তিনি ছিলেন ঈশ্বরবিশ্বাসী, আশাবাদী ও হাসিখুশি। সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, সহনশীলতা ও মানবিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

গল্পে আছে টাইনি টিম নামের জন্মগতভাবে পঙ্গু এক শিশুও, যে শেষ পর্যন্ত কৃপণ বৃদ্ধ স্ক্রুজের হৃদয়ের বরফ গলিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এই চরিত্রটিও পুরোপুরি কাল্পনিক নয়। ডিকেন্সের নিজের বোন ফ্যানির একটি ছেলে ছিল, যার নাম ছিল টিমোথি। সে জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিল। ডিকেন্স তাঁর ভাগনেকে খুব ভালোবাসতেন, আর সেই ভালোবাসারই প্রতিফলন দেখা যায় টাইনি টিমের চরিত্রে।

এক কৃপণ ও নিষ্ঠুর বৃদ্ধ মানুষের ক্রিসমাসের রাতে তিনটি ভূতের মাধ্যমে নিজের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখার এবং এরপর সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে এক দয়ালু মানুষে পরিণত হওয়ার কাহিনি নিয়ে মাত্র ছয় সপ্তাহে রচিত হয় অমর উপন্যাসিকা ক্রিসমাস ক্যারল

আরও একবার নিজের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর সঙ্গে যেন একাকার হয়ে যাওয়া সেই আধপাগলা ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স দেখিয়ে দিলেন তাঁর অসাধারণ প্রতিভার দীপ্তি।

ডিকেন্স মূলত তাঁর চারপাশের বাস্তব, নিষ্ঠুর এবং আবেগময় সত্যগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে গল্পে সামান্য ফ্যান্টাসি বা ভূতের ছোঁয়া দিয়েছিলেন। ঠিক এই কারণেই গল্পটি কাল্পনিক হলেও এর আবেগ মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করতে পেরেছিল।

এই নভেলা ইংল্যান্ডের ধনী সমাজের ওপর এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে ১৮৪৩ সালের ক্রিসমাসে লন্ডনের অনেক বড় কলকারখানার মালিক গরিব শ্রমিকদের ছুটি ও বোনাস দেওয়ার উদ্যোগ নেন। অনেকে আবার অনাথ আশ্রমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দান করেন। অর্থাৎ, বইটির গল্প সত্যিই মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছিল।

নিজের লেখনীর শক্তিতে সমাজ পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইলেন চার্লস ডিকেন্স।

এবার আসা যাক একটি মজার গল্পে।

প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, ডিকেন্স একসময় এডিনবার্গের একটি কবরস্থানে হাঁটতে গিয়ে একটি সমাধিফলকে ‘ইবেনিজার লেনক্স স্ক্রুগি’ নামটি দেখেন। সেখানে তাঁর পরিচয় হিসেবে লেখা ছিল ‘Meal Man’, অর্থাৎ শস্য ব্যবসায়ী। কিন্তু ডিকেন্স নাকি ভুল করে সেটিকে ‘Mean Man’ বা নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে পড়েছিলেন। এতে তিনি বিস্মিত হয়ে ভাবেন, একজন মানুষ মারা যাওয়ার পরও যদি তার সমাধিফলকে এমন কথা লেখা থাকে, তাহলে জীবদ্দশায় তিনি কতটা খারাপ ছিলেন!

জনশ্রুতি আছে, এই ভুল পড়া থেকেই তিনি তাঁর বিখ্যাত চরিত্রের নাম রাখেন ‘ইবেনিজার স্ক্রুজ’। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, স্ক্রুগি নামের সেই ব্যক্তি বাস্তবে নাকি বেশ আমুদে ও জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। কিন্তু ডিকেন্সের একটি ভুল পাঠের গল্পই তাঁকে সাহিত্য-ইতিহাসে চিরকালের জন্য কৃপণ স্ক্রুজের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।

আর এভাবেই একটি ছোট্ট ক্রিসমাসের গল্প শুধু সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল পুরো একটি সমাজকে।

 

৪৫ পঠিত ... ৬ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top