রাতে ঘুমাতে এসেছি। বন্ধ চোখের পাতায় একরাশ ক্লান্তি নিয়ে ঘুম আসার আগ পর্যন্ত বিমর্ষভাবে চিন্তা করলাম, কাল সকাল থেকে আবার যুদ্ধ শুরু। দিন শুরু করার আগেই দিন শুরুর ক্লান্তি যেন চেপে বসে রাতের শান্তির ঘুমটুকুও শেষ করে দিতে চাইছে। ঘুম এলো না। কিন্তু এভাবে তো পুরো জীবন পার হয়ে যেতে পারে না। এসব চিন্তা করছি আর ফোন স্ক্রল করতে করতে একটা মজার ব্যাপার দেখলাম। প্রতিবছর ১১ জুন পালিত হয় ‘মেকিং লাইফ বিউটিফুল ডে’ বা জীবনকে সুন্দর করার দিন। কিভাবে করা যায় সেটা?
যারা দিনটি পালন করেন, তারা বলছেন, জীবনকে সুন্দর করার উপায় সাধারণত অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, ক্ষমা করে দেওয়া, মানুষকে সাহায্য করা এবং নিজের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে নিজের ভেতরের ‘আমি’টাকে জাগিয়ে তোলার প্রচেষ্টা। যার মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ করার পথ আরও সুগম হয়।
নিজের জীবনকে সুন্দর করার একটি বড় নিয়ামক হলো অপরকে সাহায্য করা
আমরা যখন কোনো ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার কিনে দিই, রিকশাওয়ালাকে হাসিমুখে একটু বাড়তি ভাড়া দিই কিংবা কোনো সহকর্মীর কাজের প্রশংসা করি, তখন আসলে কার বেশি লাভ হয়?
বিজ্ঞান বলছে, অন্যকে সাহায্য করলে শুধু অপরজনই খুশি হন না, বরং আমাদের নিজেদের মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন ও ডোপামিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। গবেষকরা একে বলেন ‘হেল্পারস হাই’।
এটি মানুষের মানসিক চাপ কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে। অর্থাৎ, অন্যের জীবন সুন্দর করতে গিয়ে অজান্তেই আমরা নিজেদের আয়ু কিছুটা হলেও বাড়িয়ে নিচ্ছি!
আমরা নিজেদের জীবনকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় শুধু আফসোস করেই পার করি
কিন্তু সন্তুষ্টি জীবনকে সুন্দর করার অন্যতম উপাদান, সাধারণভাবেই আমরা সেটা জানি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিজ্ঞানও কিন্তু সেটাই বলছে।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে তাদের জীবনের ইতিবাচক বা কৃতজ্ঞ থাকার মতো মাত্র তিনটি বিষয়ের কথা মনে করে কিংবা ডায়েরিতে লিখে রাখে, তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে পঁচিশ শতাংশ বেশি সুখী থাকে। আর এই ছোট্ট অভ্যাসটি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মানুষের হতাশা কমিয়ে মনকে চনমনে করে তোলে।
তার মানে, কৃতজ্ঞতার চোখ বেশি সুখ বয়ে আনতে সক্ষম। আশ্চর্য ব্যাপার, তাই না?
প্রকৃতির সান্নিধ্য নিজের ভেতর আনন্দ খুঁজে পাওয়ার আরেকটি মাধ্যম
যখন আমরা ঘাসে হাঁটি, নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসি, তখন আমাদের মন সতেজ হয়। একে বলে ‘ইকোসাইকোলজি’।
জাপানি সংস্কৃতিতে একটি প্রচলিত শব্দ আছে, শিনরিন-ইয়োকু। এর অর্থ ‘অরণ্য স্নান’ বা প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, সপ্তাহে অন্তত ১২০ মিনিট প্রকৃতির কাছাকাছি কাটালে মানুষের মানসিক রোগের ঝুঁকি ও স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা অনেকাংশে কমে যায়। ফলে আমাদের মনোযোগ বাড়ে এবং মন ভেতর থেকে শান্ত ও সুন্দর হয়ে ওঠে।
অপরকে ক্ষমা করে দেওয়াও নিজের জীবনকে সুন্দর করে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ জরুরি
এটা শুধু ধর্মীয় কোনো উপদেশ নয়, বরং বিজ্ঞানও একই কথাই বলে।
আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মানুষকে সহজে ক্ষমা করতে পারেন না, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ, এর ফলে শরীরে ক্ষতিকর স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের নিঃসরণ বাড়তে থাকে, যা রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে, ক্ষমা করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের মাংসপেশি শিথিল হয়, রক্তচাপ স্বাভাবিক হয় এবং হৃদযন্ত্রের ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপ কমে যায়।
আবার, ডিউক ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী পিঠের ব্যথায় ভুগছেন এমন রোগীদের মধ্যে যারা ক্ষমার থেরাপি নিয়েছেন, তাদের ব্যথার তীব্রতা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। রাগ ও ক্ষোভ কমে গেলে শরীরে ব্যথানাশক হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে।
তাহলে বুঝুন ব্যাপারটা, ক্ষমা করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
জীবন কোনো সিনেমার গল্প নয় যে এক গানেই সব বদলে যাবে। জীবন আসলে একটি ক্যানভাস, যেখানে প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো কাজগুলো রঙের মতো কাজ করে। জীবনটা আগে থেকেই সুন্দর, শুধু বদলে নিতে হবে আমাদের দেখার চোখ আর যাপনের ধরণ।
ভাবলাম, আজকের বিশেষ দিনটি দিয়েই নাহয় শুরু করি জীবনকে সুন্দর করে তোলার পথচলা।



পাঠকের মন্তব্য