ক্ষীণ আলোয় আলোকিত একটি অনুজ্জ্বল কামরা। এক কোণে জ্বলছে একটি টিমটিমে বাতি। ঘরজুড়ে আবছায়া। আবছায়ায় দেখা যাচ্ছে একটি বিছানা, যেখানে নয়-দশ বছরের একটি শীর্ণ শিশু গায়ের কাঁথা দিয়ে নাক পর্যন্ত ঢেকে ভীত চোখে এদিক-ওদিক দেখছে। তার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, সে ভয় পাচ্ছে। কারণ এখন সে একা। কিছুক্ষণ আগেও তার মা ছিলেন এখানে। নিজের অসুস্থ সন্তানের পাশে বসে তাকে শুশ্রূষা করার ফাঁকে গল্প শোনাচ্ছিলেন—রূপকথা আর ভূতের গল্প। এইমাত্র কোনো কাজে উঠে গেছেন। এখনই ফিরবেন।
ছেলেটা খুব গল্পের পাগল। তাও ভৌতিক গল্পের! বাচ্চাটা অনেক দিন যাবৎ অসুস্থ। তাই তাকে ভুলিয়ে রাখাও মায়ের এক কাজ। মা ফিরছেন না দেখে সে মিইয়ে যাওয়া স্বরে ডাকল, “মা?”
মা সাড়া দিলেন না। সে এবার একটু আতঙ্কিত স্বরেই ব্যস্তভাবে ডাকল, “মাআআ?”
সঙ্গে সঙ্গে মা সাড়া দিলেন, “কী বাবা? আমি আছি তো এখানেই।”
ছেলেটির ভয় মনে হলো একটু কমল। তবু সে তার মুখের বাকি অংশ কাঁথার নিচ থেকে বের করল না। সে তার মায়ের কাছে শুধু ভূতের গল্প শুনতে চায়। আবার যখন কেউ কাছে না থাকে, তখন সে খুব ভয়ও পায়। কিন্তু কী করবে? ভূতের গল্প আর রূপকথাই সবচেয়ে মজা!
তার মায়ের ভাণ্ডার অফুরন্ত। সে তার মায়ের কাছ থেকেই গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের রূপকথা, রাশিয়ার রূপকথা ছাড়াও নানা ভৌতিক গল্প এরই মধ্যে শুনে ফেলেছে। দারুণ লাগে তার!
ছেলেটির নাম আব্রাহাম ব্রাম স্টোকার। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্ম নেওয়া ছেলেটি মায়ের কাছ থেকে পাওয়া বিশাল গল্পের ভাণ্ডার নিয়ে শৈশব থেকে কৈশোরে পা দেয়। তার কল্পনাশক্তি অবাক করার মতো। আর মাথার ভেতরে জমিয়ে রাখা গল্পগুলো তার পিছু পিছু ছায়ার মতো ফেরে। সে আরও গল্প জমায়। তার সঙ্গে যোগ করে ইতিহাস, লোককথা, সাহিত্য। তারপর একদিন সে লিখে ফেলে দুনিয়া কাঁপানো এক উপন্যাস ‘ড্রাকুলা’। তাঁর সৃষ্ট এই কাল্পনিক চরিত্রটি দেখতে দেখতে হয়ে ওঠে জীবন্ত।
এই ‘ড্রাকুলার’ জন্ম কীভাবে হয়েছিল? কথিত আছে, স্টোকার একদিন রাতে পেট ভরে ‘ড্রেসড ক্র্যাব’ নামের একটি কাঁকড়ার রান্না খেয়েছিলেন। সেদিন রাতে তিনি ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখেন—কবর থেকে এক ভ্যাম্পায়ার উঠে আসছে। এখান থেকেই তিনি ভ্যাম্পায়ার গল্পের অনুপ্রেরণা পান।
আসলে ‘ড্রাকুলা’ চরিত্রটি পুরোপুরি কাল্পনিক নয়। স্টোকার তরুণ বয়স থেকেই ইতিহাসের এক কুখ্যাত চরিত্র, রোমানিয়ার এক ঐতিহাসিক অঞ্চল ওয়ালাচিয়ার প্রিন্স ভ্লাদ দ্য ইমপেলার বা তৃতীয় ভ্লাদ সম্পর্কে খুবই কৌতূহলী ছিলেন। এই প্রিন্স তার শাসনামলে প্রচণ্ড নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী ছিলেন। এই প্রিন্সের আরেক নাম ছিল ‘ড্রাকুলা’। মূলত ‘ড্রাগন’ শব্দটি থেকে ‘ড্রাকুল’ শব্দটি আসে, আর সেখান থেকেই ‘ড্রাকুলা’। যদিও স্টোকারের ড্রাকুলা আর ঐতিহাসিক ড্রাকুলার মধ্যে নাম ছাড়া তেমন মিল ছিল না, তবুও স্টোকার এই প্রিন্সকে সামনে রেখেই তার চরিত্রটি দাঁড় করান।
প্রাথমিকভাবে এই উপন্যাসটির নাম ‘ড্রাকুলা’ ছিল না, ছিল ‘দ্য আনডেড’। কিন্তু প্রকাশের কিছু আগে স্টোকার নিজেই নামটি বদলে ‘ড্রাকুলা’ করে ফেলেন।
স্টোকার ইংল্যান্ডের হুইটবি নামক এক সমুদ্রতীরবর্তী শহরে গিয়েছিলেন ছুটি কাটাতে। সেখানে তিনি লাইব্রেরিতে বসে ‘ট্রানসিলভানিয়া’ শব্দটি পান এবং নামটি পছন্দ হওয়ায় ভ্যাম্পায়ারের আস্তানা সেখানে স্থাপন করেন।
লোককথা অনুযায়ী, আয়না মানুষের আত্মার প্রতিচ্ছবি দেখায়, আর যেহেতু ভ্যাম্পায়ারের কোনো আত্মা নেই, তাই আয়নায় ড্রাকুলা দৃশ্যমান হন না। ড্রাকুলাকে আয়নায় দেখা যায় না—এই ধারণাটি ব্রাম স্টোকারই প্রথম তার উপন্যাসে প্রবর্তন করেন।
সত্যিকারের ড্রাকুলা, অর্থাৎ ভ্লাদ তৃতীয়, নিজ জীবনে টানা বারো বছর একটি গোলকধাঁধাময় দুর্গে বন্দিজীবন কাটিয়েছিলেন। সেখানে তার ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়েছিল। সেই দুর্গটি আজও ‘কাউন্ট ড্রাকুলার দুর্গ’ নামে পরিচিত। এই দুর্গের কোনো মানচিত্র নেই, তাই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এর ভেতরেই রয়েছে কারাগার, যার একটি কক্ষ ‘ড্রাকুলা কক্ষ’ নামাঙ্কিত।
এটি স্টোকারের প্রথম উপন্যাস নয়। ‘দ্য প্রিমরোজ প্যাথ’ তিনি প্রথম লেখেন। কিন্তু ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসটির খ্যাতি এত বিশাল যে তাঁর বাকি লেখাগুলো চাপা পড়ে গেছে।
গতকাল ছিল এই মহান গথিক ঔপন্যাসিকের প্রয়াণ দিবস। যিনি আমাদের শৈশব, কৈশোর, অনেক সময় যৌবনকালকেও নিজের একটিমাত্র অমর সৃষ্টি দ্বারা ভয়াবহ মাত্রায় প্রভাবিত করে রেখেছেন। আজও আমরা তাঁর ‘কাউন্ট ড্রাকুলা’কে রহস্য আর ভীতির চোখে দেখি



পাঠকের মন্তব্য