রমজান ১৯৭১: বারুদ, রক্ত আর অপেক্ষা

৮৪ পঠিত ... ১৫ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে


২২ অক্টোবর ১৯৭১, শুক্রবার

রাজশাহীর দুর্গাপুরের গগনবাড়িয়া গ্রাম তখনো ঘুমায়া আছে। পুব আকাশে শুকতারা ঝিকমিক করতেছে। আজ পহেলা রমজান। গ্রামে সেহরি খাইয়া সবাই নামাজের তইরি হইতেছে। কাসেম আলী মিয়া হারিকেনের আলোতে জায়নামাজ পাততেছেন, আর তার বউ আমিনা বেগম তসবিহ গুনতেছে ধীরে ধীরে। বুড়া মানুষটার বুকের ভেতর কেমন জানি ধড়ফড়ানি, কিন্তু ক্যান জানে না।
এই সময় হঠাৎ দূর থেইকা একটা ভারী গাড়ির আওয়াজ। তারপরই বুটের ঠকঠক আর গলা ফাটাইয়া চিৎকার, হল্ট বাহার আও।
গ্রামের নিস্তব্ধতা একদম চুইরা গেল। পাক হানাদার আর লগে রাজাকারগুলা গ্রাম ঘিরা ফেলছে। মানুষজনরে ঘর থেইকা টানাটানি কইরা বের কইরা খোলা মাঠে লাইনে দাঁড় করাইতেছে। কারো গায়ে লুঙ্গি, কারো গামছা, কারো হাতের ওজুর পানি এখনো শুকায় নাই।
কাসেম আলী মিয়ার পাশেই দাঁড়াইছে দশ বছরের রহিম। আজ জীবনের প্রথম রোজা রাখব কইছিল। হঠাৎ এক পাক অফিসার গর্জা উঠল, নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়বা। অভুক্ত, রোজাদার মানুষজন কোদাল দিয়া মাটি খুঁড়তেছে। কাসেম আলী মাটি কাটতে কাটতে সুরা পড়তেছেন, চোখের পানি মাটির লগে মিশা যাইতেছে। গর্ত শেষ হইতেই ব্রাশফায়ার। তপ্ত গুলি আইয়া তার বুক ভেদ কইরা গেল। লুটাইয়া পড়ার আগে দেখলেন রহিমরে বেয়োনেট দিয়া খুঁচাইয়া গর্তে ফালাইতেছে। রোজার সূর্য উঠার আগেই গগনবাড়িয়ার মাটি লাল।
ওইদিকে ঢাকায় থমথমে সকাল। রাস্তাঘাট ফাঁকা, মোড়ে মোড়ে মেশিনগান। মানুষ নামাজে যাইতেছে ঠিকই, কিন্তু সিজদায় কাঁইন্দাও ভয় পায়। কে যে শান্তি কমিটির লোক, কেডা যে রাজাকার, কেডা যে খবর দিয়া দিবে কেউ জানে না। ইফতারের টাইমে ঘরে ঘরে থালা সাজানো, কিন্তু একটা জায়গা খালি। কারো ছেলে যুদ্ধে, কারো স্বামী নিখোঁজ। আমিনা বেগম খালের ধারে বসা আছে, চারপাশে লাশ আর পোড়া ঘরের গন্ধ। আকাশের দিকে চাইয়া কইতেছে, আল্লাহ, এই রমজানে রহমত নাই নাকি। কিন্তু ওই বছর আকাশ থেইকা নামছিল বারুদের গন্ধ।


১৩ নভেম্বর ১৯৭১

রমজানের সাতাশ তারিখ। কুড়িগ্রামের হাতিয়া গ্রাম সেহরির আলোতে শান্ত আছিল। মসজিদ থেইকা আজান ভাসতেছে, আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম। মানুষ ভাবে আজ লাইলাতুল কদর হইতে পারে। কিন্তু শান্তির বদলে আইলো মর্টারের শব্দ। মেজর রিয়াজের নেতৃত্বে পাক বাহিনী গ্রাম ঘিরা ফেলছে। লগে রাজাকার, আঙুল দিয়া দেখাইতেছে কার বাড়িতে জোয়ান পোলা, কার বাড়িতে মাইয়া।
মসজিদের ভেতর ঢুইকা জুতা পইড়া মুসল্লিদের টানাটানি কইরা বাহির কইরা আনা হইল। দাগারকুঠি, নয়াপাড়া, হাতিয়া আগুনে জ্বলতেছে। এক লাইনে দাঁড় করানো হইল শত শত মানুষ। ৬৯৭ জন। কেউ তসবিহ গুনতেছে, কেউ কালেমা পড়তেছে। এক মায়ের কোল থেইকা দুধের বাচ্চা কাইড়া লইয়া আগুনে ছুড়াইয়া ফালাইছে। মা চিৎকার দেওয়ার আগেই গুলি। ধরলা নদীর পাড় লাল হইয়া গেল।
একই সময় দিনাজপুরে ১১ জনরে পুকুরপাড়ে বসাইয়া গুলি। অপরাধ একটাই, স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পইরতলায় ২৯ জন মুক্তিযোদ্ধারে ধরে নির্যাতন। নখ তুলতেছে, গরম লোহা দিতেছে, কিন্তু কারো মুখ থেইকা পাকিস্তান জিন্দাবাদ বাইর হয় না। তারা শুধু কয় জয় বাংলা।
ঢাকায় জাহানারা ইমাম ডায়েরি লিখতেছেন। রুমির বন্ধুরা আসলে গোপনে রান্না করেন, কিন্তু বুকের ভেতর হাহাকার। মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পার হইয়া ঢুকতেছে, পেটে ভাত নাই, তবু রোজা রাখতেছে। হাতে স্টেনগান, চোখে আগুন। সাতাশের রাতের পবিত্রতা যারা রক্তে ডুবাইছে, তাদের জবাব দিতেই হইব।


২০ নভেম্বর ১৯৭১

ঈদুল ফিতর। ঢাকার সকাল অদ্ভুত চুপচাপ। নতুন কাপড়ের খসখসানি নাই, বাচ্চাদের হাসি নাই। ঈদের জামাতে মানুষ কম, চারপাশে বেয়োনেট তাক করা। মোনাজাতে সবাই কাঁদে, কিন্তু শব্দ চাপা। জাহানারা ইমামের ঘরে সেমাই নাই, আছে অপেক্ষা। রুমি ফিরবো নাকি।
কিন্তু সীমান্তে যুদ্ধ থামে নাই। ভুরুঙ্গামারীতে মুক্তিযোদ্ধারা পাক ঘাঁটিতে আক্রমণ করছে। আশফাকুস সামাদ স্টেনগান হাতে সামনে। গোলার আঘাতে শহীদ হইলেন। ঈদের দিন জানাজা হইল যুদ্ধক্ষেত্রে। অন্যদিকে পইরতলার খালে ভাসতেছে ৩৯ জন মুক্তিযোদ্ধার লাশ। স্বজনরা সেমাইয়ের বদলে লাশ খুঁজতেছে।
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার চট বিছাইয়া ঈদের নামাজ পড়তেছে। তাজউদ্দীন আহমদ কইলেন, এই ঈদ ত্যাগের ঈদ, আগামীর ঈদ স্বাধীন দেশে। মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে ফিরা গুড় দিয়া রোজা ভাঙে। কিন্তু তাদের চোখে হতাশা নাই। তারা জানে, এই রক্ত বৃথা যাইব না।


১৯৭১ এর ওই রমজান আর ঈদ ছিল কান্নার, ছিল আগুনের। কিন্তু ওই কান্নার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন সকাল। মানুষ বুঝছিল, তসবিহ শুধু আঙুলে না, তসবিহ হইল লড়াইও। আর দূরে কোথাও সময় চুপচাপ গুনতেছিল দিন, বিজয় বেশি দূরে নাই।

তথ্যসূত্রঃসংগ্রামের নোটবুক,প্রথম আলো,দ্যা ডেইলি স্টার

৮৪ পঠিত ... ১৫ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top