বঙ্গবন্ধু নিয়ে দিবসে দিবসে ভক্তি, কান্না ও অভক্তির কটাক্ষ

১০৫ পঠিত ... ১৫ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গ্রাউন্ড জিরোতে মিশে যাওয়া জার্মানিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খ্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন নেতা কনরাড আডেনাওয়ার। জার্মানিকে কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের কাজটি তিনি করেছিলেন। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতা ভিলি ব্রান্ট পরবর্তীতে জার্মানিকে ইউরোপের অর্থনীতির দুরন্ত সহিষ্কর করে তোলেন। নোবেল পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি। কালে ভদ্রে তাদের নিয়ে পত্রিকায় আর্টিকেল ছাপা হয়। কিন্তু দিবসে দিবসে মনের হর্ষে নিশীথে প্রদীপ ভাতি করে জার্মানিতে কেউ ‘আডেনাওয়ার’ বা ‘ব্রান্ট’ বলে বুক থাবড়ায় না।

আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল পাশাকে নিয়ে কেঁদে জার হবার লোকও তুরস্কে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক মাহাথির মোহম্মদ বা সিঙ্গাপুরের নেতা লি কুয়ানকে নিয়ে আবেগে গদগদ হবার ভঙ্গিমাও সেখানে নেই।

আমেরিকাতেই ফাউন্ডিং ফাদারদের নিয়ে দিবসে দিবসে ডুকরে ওঠা কান্নার রোল নেই কোথাও। ভারতের স্বাধীনতার জনক গান্ধীজী ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার জনক জিন্নাহকে নিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কোন হেলদোল নেই। যেহেতু ৭৮ বছরে দেশ দুটো কল্যাণরাষ্ট্র হয়নি; স্বাধীনতা শব্দটি নাগরিকদের জীবনে অনুদিত হয়নি; তাই স্বাধীনতার জনক নিয়ে আদিখ্যাতার কারণ সেখানে নেই। ভারতের একমাত্র সফল রাষ্ট্রনায়ক জওহরলাল নেহেরুকে নিয়ে আলাপ-আলোচনাও অত্যন্ত পরিমিত।

কিন্তু ব্যর্থ ও অকল্যাণ রাষ্ট্র বাংলাদেশে স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু নিয়ে দিবসে দিবসে ভক্তি, কান্না ও অভক্তির কটাক্ষের কোন সীমা-পরিসীমা নেই। ৫৫ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাজিয়ে চলেছে তাঁর ভক্তরা। মেইনস্ট্রিম হতে গেলে দিবসগুলোতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দুটি কবিতা, চারটি আবেগ ফেসবুকে প্রকাশ করতেই হবে। গ্রামীণ এই সমাজে মহামানবে আসক্তি ও এর বিপরীতে মহাদানব বানানোর যে হ্যাঙ্গারগেম; এ দুটো হাত ধরাধরি করে চলে।

বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাহুবলী হিসেবে নির্মাণ; এর বিপরীতে তাকে স্বৈরাচারী বাকশালের রাবণ হিসেবে চিত্রায়নের যে লোকজ বিনোদন; তা পালে-পার্বণে ও দিবসগুলোতে কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করে; আবার অতিদ্রুত সেই উত্তেজনা শিথিল হয়ে পড়ে।

খেয়ে দেয়ে এতোই কম কাজ আমাদের যে, নেই কাজ, তো খইভাজের এই অপসংস্কৃতি লোকজনকে ধস্ত করে ফেলে।

পৃথিবীর অন্যান্য সমাজের মানুষ রাজনীতিকে রাজনীতির আঙ্গিকে চর্চা করলেও; আমাদের সমাজে রাজনীতি চর্চিত হয় ধর্মের মতো। সেই দিক থেকে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে একটি ধর্ম হিসেবে পালন করে। বঙ্গবন্ধু সেই ধর্মের একজন পয়গম্বর। আর হিন্দুধর্মের আদলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিশুদ্ধ বাঙালিকে উচ্চবর্গ হিসেবে বিনির্মাণ করা হয়েছে। পেট মোটা, বেগুণি মুখমণ্ডল, কুঁজো লোকের মধ্যে ‘আর্য স্বপ্নের বীজ’ পুঁতে দিয়েছিলো হিন্দুধর্মের কাস্ট সিস্টেম। বেঙ্গল রেনেসাঁর সময় পেটমোটা লোক সাসপেন্ডার পরে; রেশমী পোশাক পরে; অভিজাত বাঙালির একটি আঙ্গিক অঙ্কন করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ সেই কষ্টকল্পনার ইজম। ইনফেরিয়রের সুপিরিয়র সাজানোর গাজোয়ারি প্রচেষ্টাই ইজম। সেটা চর্চার বাহন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্ম ও পয়গম্বর বঙ্গবন্ধু।

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে বৃটিশের বেনিফিশিয়ারি বাঙালির ছেলে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের কৃতিত্বের মালিক হয়েছে; এরপর তারা পাকিস্তানের মুসলিম লীগের বেনিফিশিয়ারির ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ রচনা করেছে। ফলে বাঙালি সমাজে বৃটিশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরে চিতকার করা লোকটি বৃটিশ কোলাবরেটরের ছেলে। আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরে চিতকার করে ওঠা লোকটি পাকিস্তানের রাজাকার মুসলিম লীগের নেতার ছেলে।

বৃটিশের নির্যাতনে সম্পন্ন কৃষক-কারিগর থেকে দুঃস্থ হয়ে পড়া মানুষ; যারা ১৮৫৭ থেকে বৃটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে; ১৯৪৭-এর পরে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামোতে। বরং বৃটিশ কোলাবরেটর হিসেবে পিয়ন, মুন্সী, সেরেস্তাদার, দারোগা থেকে জমিদার হওয়া লোকের বাড়িতে চর্বি জমানো ছেলেরাই মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, বামপন্থী হয়ে দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে ছিল যারা; সেই সাধারণ মানুষের ছেলে-মেয়ে জীবন দিয়েছে; স্বজন হারিয়েছে, এদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী, জীবন বাঁচাতে এরাই ভারতে শরণার্থী হয়েছে; শরণার্থী শিবিরে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ইতিহাসে তাদের নাম লেখা হয়নি। পাকিস্তানের সুবিধাভোগী মুসলিম লীগের নেতার ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঝান্ডা নিয়ে; আবার ক্ষমতা কাঠামোতে ঢুকে পড়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া, স্বজন হারানো, বাড়ি পুড়ে যাওয়া-লুটপাট হওয়া, শরণার্থী হওয়া পরিবারের ছেলে-মেয়েরা মুক্তিযুদ্ধের সময় আরামে রাজাকার মামার বাসায় শুয়ে থাকা ইতিহাসবিদের কলমের খোঁচায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির বিভাজনে; রাজাকার তকমা পেয়েছে। আর মাথায় পতাকা বেঁধে রাজাকারের ছেলেমেয়েরা টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গল্প শুনিয়েছে। ফেসবুকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে গরম দেখানো লোকটার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিন; মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক নেই এদের। এরা ঢাকা শহরের কিছু মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ছেলে-মেয়েদের দলে ভিড়িয়ে চেতনার দোকান খুলে এরপর নিজেরাই এই প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। আর হিন্দুধর্মের কিছু তরুণ-তরুণীকে কে যেন ধারণা দিয়েছে; হিন্দু মানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা; আর মুসলিম মানেই রাজাকার; তারা মনের সুখে দিবসপূজার ছলে লোকজনকে রাজাকার-জঙ্গি গালি দিয়ে বেড়ায়।

কোন এক আজগুবি কারণে মেইনস্ট্রিমের বিশুদ্ধ বাঙালি হতে চাওয়া লোকজন মুসলিম লীগের নেতার সন্তান। এর চেয়ে বড় ডার্ক হিউমার আর কি হতে পারে।

জুলাই, তারুণ্য জেনজি ও জেন আলফা যখন লক্ষ্য করেছে; মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচারের কোন খবর নেই; এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধুর হেলমেট-হাতুড়ি পরে ভিন্নমত দমনে নেমেছে; নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে কোটা বিরোধী ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন; ন্যায্য দাবি তুললেই রাজাকার তকমা; তখন তারা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে এই হেজিমনি। ২০০৯-২৪ সাল পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রণব মুখার্জি, সুজাতা সিং ও নরেন্দ্র মোদির কথা ও কাজে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগ ও তার সংশ্লিষ্ট বামপন্থী সাংস্কৃতিক বলয় ভারতের কাছে সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করে সমকালের স্বাধীনতা বিরোধীর ভূমিকা পালন করেছে ও করে চলেছে।

রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তান পর্বে বঙ্গবন্ধুর সুকৃতি ইতিহাসে স্বীকৃত। কিন্তু তার ক্রেডিবিলিটি বিক্রি করে; তাকে কাল্ট হিসেবে নির্মাণ করে; তার নামে শ্লোগান দিয়ে যেভাবে ২০০৯ থেকে ২৪ পর্যন্ত গুম, ক্রসফায়ার, হত্যা, আয়নাঘর, সাজানো জঙ্গি-বিরোধী অভিযানের নাটক আর ভারতের ইসলামোফোবিয়া বাস্তবায়ন করা হয়েছে; তাতে শিশু ও কিশোর মনে বঙ্গবন্ধু একটি ভীতিজনক নামে পরিণত হয়েছেন। খুনে পুলিশ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তার শার্টের পকেটে লাগানো বঙ্গবন্ধু পিন; কালেক্টিভ মেমোরিতে নাতসিদের সোয়াস্টিকা পিনের মতো দেখিয়েছে। ফলে বুমারস, জেনেক্স, মিলেনিয়ালের চোখে বঙ্গবন্ধু আর জেনজি-জেন আলফার চোখে বঙ্গবন্ধু সম্পূর্ণ পৃথক আইডেন্টিটি।

বাংলাদেশে যদি কোনদিন সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়; সেদিন স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নামটি অর্থবহ হয়ে উঠবে। স্বাধীন মানচিত্র, পতাকা, স্বাধীনতা দিবস প্রতিটি নাগরিকের জীবনে অনুদিত হলে; সেদিন আর সামাজিক পুলিশি করে কাউকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শিক্ষা দিতে হবে না। আমরা সেই দিনের অপেক্ষা করছি।

 

১০৫ পঠিত ... ১৫ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top