তাতিয়ানা তার ছ'মাসের ছোট্ট শিশুপুত্র আইভানকে বাড়িতে রেখে কাজে বেরিয়েছে। তার বাড়ি রাশিয়ার পেত্রোগ্রাদ অঞ্চলে। প্রচণ্ড শীতের শহর। চারদিকে বরফ, দোকানে খাবার প্রায় নেই, আর মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যুদ্ধের কষ্টে। সময়টা ১৯১৭ সাল।
সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা ভোরে কাজে যাচ্ছিল। তাদের মুখে একই অভিযোগ: রুটি নেই, বাচ্চারা না খেয়ে আছে।
তাতিয়ানারও একই দুশ্চিন্তা। তার বাচ্চাটার কিছু সময় পরপরই খাবারের জন্য মা প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাতিয়ানা কারখানা ছেড়ে আসতে পারে না। আর যা বাড়তি খাবার আইভান খেতে পারে, তার কোন কিছুই তার বাড়িতে নেই। সত্যি কথাটা হচ্ছে, তার বাড়িতে কোন খাবারই নেই।
শ্রমিক হিসেবে তাতিয়ানারা, মানে মেয়েরা, খুবই ভোগান্তির শিকার। কারণ মজুরি বৈষম্য, অনির্দিষ্ট কর্মঘন্টা, অমানবিক পরিবেশ—সবকিছুই তাদের জীবনকে করে তুলেছিল দুর্বিষহ। কিন্তু কোন উপায় নেই। এভাবেই কাজ করে আসছে লাখ লাখ নারী শ্রমিক। তারা মরিয়া। কিন্তু এরই মধ্যে তারই কিছু সহকর্মীকে সে দেখেছে যারা অধিকার আদায়ের কথা বলে।
আজ তাতিয়ানা তাদের কাছে গেল। সেও অধিকার চায়। তার নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা চাই, সমান মজুরি চাই, চাই শিশুসন্তানকে কাছে রাখার অধিকার, মানবিক পরিবেশ—এসব কিছুই চাই। আজ সে অধিকার আদায়ের জন্য পথে নামবে। তার মানুষ হবার অধিকার চাই। দিনটি ৮ই মার্চ। তারা পথে নামল, রুটি আর শান্তির দাবিতে।
এরও বেশ কিছু পূর্বের সময়েই ইউরোপ ও আশেপাশের অঞ্চলের সকল কর্মজীবী নারীরাও নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য পথে নেমেছে। ১৯০৯ সালে আমেরিকায় প্রথম ন্যাশনাল উইমেন্স ডে পালন করা হয়। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে একটি আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। সেখানে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রস্তাব দেন: প্রতিবছর একটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা উচিত। প্রস্তাবটি অনেক দেশের প্রতিনিধিরা সমর্থন করেন।
এরই ফলশ্রুতিতে ১৯১১ সালে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ডে প্রথমবার নারী দিবস পালিত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ মিছিল ও সভা করেছিল নারীর ভোটাধিকার, কাজের অধিকার এবং সমতার দাবিতে।
ফিরে যাই তাতিয়ানার কাছে। তারা তখন রাজপথে। নিজেদের অধিকার আদায় আর জার শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ।
শুরুতে সবাই একটু ভয় পেয়েছিল। তখন রাশিয়ায় প্রতিবাদ মানেই ছিল বিপদ। তবু ক্ষুধা আর অন্যায়ের চেয়ে ভয় ছোট হয়ে গেল।
শত শত নারী কারখানা থেকে বেরিয়ে এল। তারা রাস্তায় হাঁটতে লাগল এবং চিৎকার করতে লাগল:
“রুটি চাই! যুদ্ধ বন্ধ করো! রুটি চাই, ন্যায্য মজুরি চাই, সম্মান চাই।”
সেই ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল তাতিয়ানা। তার চোখে ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল সাহস।
সেদিন হয়তো পৃথিবী পুরো বদলে যায়নি। কিন্তু বরফে ঢাকা শহরের মানুষ প্রথমবার বুঝেছিল— যে কণ্ঠ এতদিন চুপ ছিল, সেই কণ্ঠ একদিন ইতিহাসও বদলে দিতে পারে।
ধীরে ধীরে পুরুষ শ্রমিকরাও তাদের সাথে যোগ দিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ল।
এই ছোট্ট প্রতিবাদ কয়েক দিনের মধ্যেই বড় আন্দোলনে পরিণত হল। অবশেষে সেই আন্দোলনের ঢেউয়ে পতন ঘটে রাশিয়ার জার শাসনের, বলশেভিক বিপ্লব শুরু হয়ে যায়।
তাতিয়ানাদের এই 'রুটি ও শান্তি' আন্দোলন জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় পুরো বিশ্বে। তাই বিশ্ব নারীদের এই কষ্টের প্রতিদান হিসেবে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মর্যাদা দেয় নারী দিবস হিসেবে।
১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটিকে 'আন্তর্জাতিক নারী দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে পালন করে আসছে। সেদিনের তাতিয়ানারা আজকের সমাজের নারীদের দিয়ে গিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা। আজকের নারীদের অনেক কষ্ট তারা লাঘব করে দিয়েছে। সেদিনের তাতিয়ানাদেরকে আজকের তাতিয়ানাদের পক্ষ থেকে হাজার সালাম। আমাদের অধিকার আদায়ের এই যাত্রা আমরা অব্যাহত রাখব।



পাঠকের মন্তব্য