গুড লাক বিএনপি

১৭৯ পঠিত ... ১৯:৩৮, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬

সতেরো মাস ধরে 'নির্বাচন হবে না' প্রচারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট শাসনের কারণে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের পতনের ফলে; বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিএনপি ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তাদের দেড় দশকের ট্র্যাজেডির অবসান ঘটেছে।

দেড় দশকের গুম-খুন-ক্রসফায়ার-দেশলুণ্ঠনের পথ ধরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায়; জামায়াত সেই শূন্যস্থান পূরণ করে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এলো সাম্প্রতিক নির্বাচনে। জুলাই বিপ্লবের যাত্রাবাড়ির লেনিনগ্রাদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ হয়ে জাতীয় সংসদে তারা রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রিক্লেইম করেছে।

জুলাই বিপ্লবীদের রাজনৈতিক দল এনসিপির ছয়জন তরুণ নির্বাচনে জিতে বাংলাদেশ সংস্কারের দাবিটি নিয়ে সংসদে যাচ্ছেন। এনসিপির অন্যান্য তরুণেরা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। তৃতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির অভিষেক; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এই নির্বাচনে বাম দলগুলোর ফলাফল হতাশাব্যঞ্জক। কিছু ভালো প্রার্থী তাদের ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট শাসনামলে নির্মূলের রাজনীতিকে অনুপ্রাণিত করায়; সাধারণ মানুষের মনে বামপন্থীদের প্রতি একটি ভীতি রয়ে গেছে।  বিএনপি বিশাল বিজয় লাভের পর এর সমর্থকদের বিজয় উদযাপনে পরিমিত হতে দেখা গেলেও; বামপন্থীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সোল্লাসে বিজয় মিছিল করেছে। ২০০৮-এর নির্বাচন ও ২০২৬-এর নির্বাচনের পর বামের বিজয় মিছিলের একই প্যাটার্ন; তাদের বিদ্বেষ, বিভাজন ও নির্মূলের রাজনীতি চালিয়ে যাবার ইঙ্গিত বহন করে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নেতারা বিএনপিকে নির্বাচনী বিজয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতা নরেন্দ্র মোদি তার শুভেচ্ছা বার্তায় বিএনপির মাঝে 'প্রগতিশীলতা'র সম্ভাবনা দেখতে চেয়েছেন।

বাংলাদেশের বামসমর্থক ও ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি; 'প্রগতিশীল'তা শব্দটিকে 'মুসলিম বিদ্বেষ' হিসেবেই চর্চা করে। ফলে তারা তাদের একমাত্র পছন্দের দল আওয়ামী লীগের দুধের স্বাদ; 'অগত্যা পছন্দে'র দল বিএনপির ঘোলে পূরণের লক্ষ্যে তাদের স্বপ্নযাত্রা শুরু করলো বলে মনে হয়। অবশ্য এসবই তাদের প্রত্যাশা। বিএনপি তাদের প্রত্যাশার 'ঘোল' হতে চাইবে কিনা; ভবিষ্যতের দিনগুলো তা বলে দেবে।

বিএনপি তার নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কিভাবে কাজে লাগায় তা দেখার বিষয়। জুলাই আকাংক্ষার রাষ্ট্রসংস্কারের প্রসঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই রাষ্ট্রের সংস্কার চায়।

আওয়ামী লীগের দেড় দশকে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে গেছে; অবাধ দেশলুন্ঠনে অর্থনীতিও রুগ্ন। ফলে নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির ক্ষমতার মধুচন্দ্রিমার খুব বেশি সময় আছে বলে মনে হয় না। বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের বলা, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ বাক্যটি কতটা আন্তরিক; তা প্রথম ১০০ দিনের সরকারি দলের কার্যক্রমেই প্রতিভাত হবে বলে ধারণা করি।

বিএনপির কর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির জনঅভিযোগ রয়েছে; সেই 'কালো দাগ' মুছতে বিএনপি সরকারকে তার প্রথম কর্ম দিবস থেকেই কাজ করতে হবে বলে মনে করি।

আওয়ামী লীগের নির্যাতনে বিএনপির যে কর্মীদের জীবন বিপন্ন হয়েছিলো; দলকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনতে তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিলো চোখে পড়ার মতো। এদের আমি রুপকথার 'কাজলরেখা' বলি। কিন্তু ২০২৪-এর ৫ অগাস্টের পর বিএনপিতে বসন্তের কোকিল 'কাঁকন দাসী'দের সোশ্যাল মিডিয়ায় নেমে পড়তে দেখেছি; ২০০৯-এর আওয়ামী লীগের 'কাঁকন দাসী'-দের মতো। যারা দলটির কাজল রেখাদের সাইড লাইনে ঠেলে দিয়ে; সোশ্যাল মিডিয়ায় 'সিপি গ্যাং' হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিলো। মিডিয়ায় শিং ঘষাঘষিতে রাতারাতি আওয়ামী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী'দের কপি পেস্ট লক্ষ করা গেছে বিএনপির পক্ষে। 'আগেই ভালো ছিলাম' আওয়ামী সংস্কৃতি মামা-খালার অনুকরণে 'আগে ক্ষমতায় গিয়ে নিই' রুদ্ররোষ লক্ষ করা গেছে। নব্বুই-এর গণ অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা দ্বি-দলীয় তেলাঞ্জলি মডেল সমকালীন বাস্তবতায় জন প্রত্যাখানের সম্মুখীন হবে বলে মনে হয়।

যেহেতু আওয়ামী অপশাসনের 'পনেরো বছর' বিএনপির সামনে দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়েছে; তাই আওয়ামী লীগ যে মানবাধিকার লংঘন, দেশ লুণ্ঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ করেছে; ঐসব সর্বনাশা ভ্রান্তি থেকে দূরে থাকা সহজ হবার করা। লীগ যা যা করেছে; বিএনপি তা তা না করলেই; সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

অধ্যাপক ইউনুস ও তার উপদেষ্টা পরিষদ, সেনাবাহিনী প্রধান, জনপ্রশাসন নানাপক্ষীয় শত্রুতা মোকাবেলা করে; দেশের গণতন্ত্রের লাইনচ্যুত ট্রেনটিকে আবার লাইনে তুলে দিতে সমর্থ হয়েছেন।

জুলাই বিপ্লবের আকাংক্ষা এই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া জেনজিরা বাস্তবায়ন করেই ছাড়বে। জেন আলফা সেই আকাংক্ষার মিছিলে এরি মাঝে যোগ দিয়েছে। কাজেই বসন্তের কোকিল মিডিয়া, হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন, সোশ্যাল মিডিয়ার গলাবাজ, দলের কোলে উঠতে উতস্যুক বুদ্ধিজীবী, কালচারাল উইং-এর চেয়ে বিএনপিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে জেনজি ও জেন আলফার দিকে। বুমার্স-জেনেক্স-সিনিয়র মিলেনিয়াল আসলে ফুরিয়ে যাওয়া মানুষ। নতুন চিন্তার উদ্ভাস তাদের মাঝে নেই।

বিএনপিকে নতুন চিন্তার উদ্ভাসের খোঁজ করতে হবে। সামাজিক গণতন্ত্র, কল্যাণ রাষ্ট্র, সুশাসন, অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ এসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারকে লিপ সার্ভিস থেকে বাস্তবে অনুবাদ করতে হবে।

বাংলাদেশ রাজনীতিতে রাষ্ট্র 'ক্ষমতায় যাওয়া' বলে যে বস্তাপচা ধারণা প্রচলিত আছে; সেটাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন হিসেবে আত্মস্থ করতে শিখলে বিএনপি জনরায়কে কাজে লাগিয়ে জনগণের মন জয় করতে পারবে বলে আশা রাখি।

বিএনপির 'কাজল রেখা'কে অভিনন্দন। আর 'কাঁকন দাসী'কে পলিটিক্যাল স্যাটায়ারের আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণ।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যে কিশোরের হাতের তালুতে অবাক সূর্যোদয় ঘটেছিলো; সে জুলাই বিপ্লবে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। জাতীয় সংসদে জুলাই বিপ্লবের শাপলা কলি হাতে পৌঁছেছে জুলাই তরুণেরা। সংসদে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, জীবন মিছিলে বাংলাদেশের ভবিষ্যতযাত্রার স্বপ্ন। জুলাই বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।

১৭৯ পঠিত ... ১৯:৩৮, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top