পা দেবতা

৫২ পঠিত ... ১৫:৪৩, জানুয়ারি ০৭, ২০২৬

ধাক্কা নগরীতে অভিজাত সমাজে ‘মন খারাপের হাওয়া দুলে দুলে ওঠে।’ ১৭৯৩ সাল থেকে এই নগরীতে একটি বিশ্বাস দৃঢ় হয়; ধন সম্পদ সম্মান আভিজাত্য অর্জনে পা দেবতাকে তুষ্ট করতে হবে। সেই থেকে একটি পায়ের মূর্তি গড়ে সেখানে পুষ্পার্ঘ্য না দিলে গাছে ফুল ফোটেনা, পাখি গান গায় না, সরোবরে জল টলমল করে না, গায়কের গলায় সুর আসে না, নর্তকীর অঙ্গুলিতে মুদ্রা হাসে না।

পার্শ্ববর্তী কলতলা নগরীতে প্রথম পা দেবতার পূজা শুরু হয়। লর্ড কর্ণওয়ালিশের পদযুগলে পুষ্পার্ঘ্য দিলে; দরিদ্র ম্যাজিক মাসুয়ারেরা রাতারাতি জমিদারি পেয়ে যায়। তাদের ছেলেরা বিলেতে পড়তে যায়। সেখান থেকে পেডিকিউর বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ফিরে রাইটার্স বিল্ডিং-এ গোরা সাহেবদের ফুট মাসাজ দিতে শুরু করে।

গোরা সাহেবেরা সিদ্ধান্ত নেয়, ধাক্কা নগরীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা জরুরী। ফুট মাসাজ দিতে না শেখায় উন্নয়নের মূল ধারায় আসতে পারছে না ঐ জনপদ। কলতলা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে ওঠে ধাক্কা বিশ্ববিদ্যালয়; যেখানে পা দেবতার জন্য মানপত্র রচনার ব্যুতপত্তি লাভ করতে থাকে ছাত্রেরা। ম্যাজিক মাসুয়ার থেকে যারা জমিদারি পেয়েছিলো তারা একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। কৃষকের ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ম্যাজিক মাসুয়ার হয়ে পড়লে জমিদার হতে চাইবে।

শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। ধাক্কা নগরীতে নতুন ম্যাজিক মাসুয়ারেরা জমিদারির ভাগ চেয়ে বসলো। গোরা সাহেবেরা বিদায় নিলে জমিদারি হারিয়ে কলতলার ম্যাজিক মাসুয়ারেরা কলতলায় ফিরে গিয়ে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলো। জমিদার তনয়েরা ধাক্কা নগরীতে রয়ে গেলো আধুনিক পেডিকিওর শিক্ষক হিসেবে। তারা প্রচলন করলো, পা মালিশের সঙ্গে সঙ্গে সংগীত পরিবেশন। এতে পা দেবতার ঘুম এসে যায়। এইভাবে পা মালিশের বিষয়টি একটি সাংস্কৃতিক দ্যোতনা লাভ করলো।

গোরা সাহেবদের পা মালিশ করত যারা; তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হীরামণ্ডির নবাবদের পদযুগলে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করলো। সোনাগাছির মহারাজারা তা দেখে মন খারাপ করলো, আমারি বঁধুয়া আনবাড়ি যায়; আমারি আঙ্গিনা দিয়া।

অবশেষে ধাক্কা নগরীতে গোয়ালন্দের নবাবদের প্রাধান্য চলে এলো। ধাক্কা নগরীতে পায়ের মূর্তি স্থাপিত হলো। এসময় উপকথার মতো প্রচলিত হলো, পা দেবতার কাছে গেলে; তিনি যদি একটা লাথি দেন; সঙ্গে সঙ্গে জমিদারি পাওয়া যায়। প্লেটোর রিপাবলিকের ধারণা এভাবে পাপাবলিক হয়ে পড়ে ধাক্কা নগরীতে।

ক্ষমতার পালাবদলে পা যায় পা আসে; ম্যাজিক মাসুয়ারেরা পুরোনো পা ছেড়ে নতুন পায়ে আছড়ে পড়ে। এইভাবে পা দেবতার পা মালিশ করে অভিজাত শ্রেণী স্ফীত হয়। গানে গানে সুরে সুরে মন্ত্রে মন্ত্রে আয়াতে আয়াতে পায়ের উপাসনা করে মানুষের ভাগ্য বদলায়; ছাপড়া থেকে দালান হয়, গরুর গাড়ি থেকে যন্ত্রের গাড়ি হয়, গঞ্জিকার তুরীয় উড়াল থেকে হেলিকপ্টার হয়, মতুয়া পল্লীর ভাটিয়ালি ভাষা নদীয়ার ভাষা হয়; আবার ইংলিশ ভিংলিশ হয়। পয়সার হাটের পাটকাঠির বেড়ার ঘর বেগম পাড়ার সেকেন্ড হোম হয়। কি জাদু আছে ঐ পায়ে; যে পা জড়িয়ে ধরলে ভাগ্যলক্ষ্মী রেশমী চাদর জড়িয়ে দেয়। কি ভয়ংকর ঐ পা যা জড়িয়ে না ধরলে পেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়। যদি তুমি পা মালিশ করো তবে তুমি বেশ, যদি না করো তবে তুমি শেষ।

অনেক কষ্টে ক্যানিবাল হয়ে ওঠা পায়ের মূর্তি ভেঙ্গে; পা'টিকে কলতলায় পাঠিয়ে দিলে; ধাক্কা নগরীর নিম্ন অংশে যারা থাকে; তারা মুক্তির স্বাদ পায়। কিন্তু উচ্চ নগরীতে পা হারানোর বেদনায় হু হু করে কাঁদতে থাকে ম্যাজিক মাসুয়ারেরা, আমায় একটি পা এনে দাওনা যার রক্ত সাদা।

সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অনেকগুলো অস্নাত অভুক্ত অতৃপ্ত রাতের পর অলৌকিক এক পায়ের আগমনে উচ্চনগরীরে আনন্দের হুই দিয়ে যায়। শীর্ণকায়া ক্ষীণাঙ্গী নদীর বুকে যৌবনের বান ডাকে। উচ্চ নগরীর বণিক, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ক্ষয়িষ্ণু জমিদার তনয়েরা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, পিএইচডি ফেলো, ইতিহাস গবেষক, মিডিয়া মুঘল বেদের মেয়ে জ্যোতস্না, সংস্কৃতি জগতের রসের বাইদানি, সচিবালয়ের জেলে, সেনানিবাসের মাঝি, মগবাজারের পোপ, দিল্লির লাড্ডু কারিগর হুমড়ি খেয়ে পড়ে নবাগত পা দেবতার পায়ে।

ভাষ্করেরা আবার পায়ের মূর্তি গড়তে থাকে, কবি কবিতা লেখে, গায়ক গান করে, নর্তকী মুদ্রা সাজায়, ধাক্কা নগরীতে আবার একটা পায়ের মূর্তি চাই।

৫২ পঠিত ... ১৫:৪৩, জানুয়ারি ০৭, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top