বলিউডের চোখে আওরঙ্গজেব, গদি মিডিয়ার চোখে ইউনূস

৩৮৪ পঠিত ... ১৬:৫৯, মার্চ ১৯, ২০২৫

29

প্রায় ৩০০ বছর আগের মুঘল শাসক আওরঙ্গজেবকে হিন্দু নির্যাতনকারী হিসেবে চিত্রিত করে বলিউড ছাব্বা নামে একটি মুসলিম বিদ্বেষী চলচ্চিত্র মুক্তি দিয়ে এরই মাঝে ৫০০ কোটি রুপি উপার্জন করেছে। ঘটনা সেখানে শেষ হয়নি; এই চলচ্চিত্রের যে মূল উদ্দেশ্য তা হচ্ছে ৩০০ বছর আগে মুসলিম শাসকের কাল্পনিক ও অতিরঞ্জিত নির্যাতনের কাহিনী ফেঁদে; বর্তমানের ভারতে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের কুরুক্ষেত্র তৈরি করা। ছাব্বা চলচ্চিত্রের উস্কানিতে প্রভোকিত হয়ে হিন্দু-জনতা আওরঙ্গজেবের সমাধি ভাংচুরে উদ্যত হয়েছে; মুসলিম জনতার ওপর চড়াও হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জারি করতে হয়েছে।

গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র দামোদর মোদি যেরকম গুজরাটে মুসলিম গণহত্যায় চোখ বুঁজে থেকে মুসলমানদের এথনিক ক্লিনসিং ঘটতে দিয়েছিলেন; ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবার পর থেকে ঠিক সেভাবে চোখ বুঁজে থেকে ভারতব্যাপী মুসলিম নির্যাতন ও নিধন ঘটতে দিয়ে চলেছেন। ছাব্বা চলচ্চিত্রের প্রচারণায় নিজেও অংশ নিয়েছেন। যেহেতু ভারতের গরিবি, দুর্নীতি, কর্মসংস্থানহীনতা, কৃষক ও তরুণদের আত্মহত্যা, ইতিহাসের ভয়ংকরতম বৈষম্যের কোনো সমাধানের সামর্থ্য নেই; তাই মুসলিম বিদ্বেষে মশগুল রেখে নাতসি শাসনের অনুকরণে হিন্দুত্ববাদী শাসনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করাই মোদি প্রশাসনের একমাত্র কাজ।

গুজরাট, কাশ্মিরের মুসলমানদের ওপর হননযজ্ঞ চালানোর পর; সংসদ ভবনে বাংলাদেশকে ভারতের মানচিত্রের অন্তর্ভূক্ত করে; দিল্লির অনুগত কর্মচারি শেখ হাসিনাকে শিখণ্ডি করে বাংলাদেশে ভারতীয় উপনিবেশ স্থাপন করেছেন মোদি। বাংলাদেশ ল্যাবরেটরিটি ইজরায়েলি শাসক নেতানিয়াহুর অনুকরণে ঠিক যেন প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরির অনুকরণে সাজানো। জায়নিস্টেরা যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টের ন্যারেটিভ তোতাপাখির মতো আউড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ইজরায়েলি দখলদারদের দিয়ে প্যালেস্টাইনে নাকবা গণহত্যা চলিয়েছে; হিন্দুত্ববাদীরা ঠিক তেমন করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার ন্যারেটিভ তোতাপাখির মতো আউড়ে ২০০৮ সাল ভারতের নেতা প্রণব মুখার্জির রুপকল্প বাংলাদেশ উপনিবেশে দিল্লির কর্মচারী হাসিনার দখলদার বাহিনী দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন শুরু করেছে। জায়নিস্ট লবি যেভাবে হলিউডে নাতসি হলোকাস্ট নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়ে চাপা দিয়েছে প্যালেস্টাইনের মুসলমান নিধনের ট্র্যাজেডি; হিন্দুত্ববাদী লবি ঠিক তেমন করে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গণহত্যা নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়ে চাপা দিয়েছে ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশে মুসলমান নিধনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। বলাবাহুল্য এর সঙ্গে ইজরায়েলের সাধারণ ইহুদি ও ভারতের সাধারণ হিন্দু জনগোষ্ঠীর কোনো যোগসাজশ নেই। বরং সাধারণ ইহুদিরা প্যালেস্টাইনের ইজরায়েলি আগ্রাসনের ও সাধারণ হিন্দুরা বাংলাদেশে ভারতীয় আগ্রাসনের সমালোচনা করে।

বাংলাদেশের সংগ্রামশীল মানুষ যেভাবে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বর্গীদের হানা, বৃটিশ উপনিবেশ ও পাকিস্তানের উপনিবেশের মূল উতপাটন করেছে; সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় উপনিবেশের মূল উতপাটন করেছে। ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের মুখে দিল্লির কর্মচারি হাসিনার দিল্লিতে পালিয়ে যান। হাসিনার দখলদার বাহিনী ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ভারতীয় উপনিবেশের গুম, ক্রসফায়ার, চর্টার সেল আয়নাঘরে আটকে রাখা, রাজপথে হামলা, পিলখানা হত্যাযজ্ঞ সর্বত্র হিন্দিভাষী ভারতীয় অপারেটিভদের উপস্থিতির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা ভিক্টিমেরা। হাসিনার শাসনামলে তার মনিব মোদির বাংলাদেশ সফরকালে; প্রতিবাদী জনতাকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। প্রণব মুখার্জির অটোবায়োগ্রাফি কোয়ালিশন ইয়ারস, ২০১৪ সালের একপেশে নির্বাচনের আগে সুজাতা সিং-এর এরশাদকে গৃহপালিত দল হতে বাধ্য করা, ২০১৮ সালের রাতের ভোটের আগে ও পরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের লোকেরা হাসিনাকে ফুলমাল্যে বরণ করে দখলদারিত্ব ধরে রাখতে অন্ধ সমর্থন জুগিয়ে যাওয়া; ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য শাসনে বাংলাদেশকে ডোর ম্যাট হিসেবে ব্যবহার করা; প্রায় বিনামূল্যের জলপথ, সড়কপথ ও রেলপথে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর সঙ্গে কানেক্টিভিটি হাসিল; বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশকে রেমিটেন্স উপার্জনের মৌচাক বানানো; এইভাবে ভারতীয় আগ্রাসনের প্রমাণগুলো ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশ মানচিত্রের সর্বত্র। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নেতারা দিল্লিতে গিয়ে বিজেপির সঙ্গে এক সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের নামে ধর্মপ্রাণ দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষকে ডিহিউম্যানাইজ করে তারা হননযজ্ঞ এমন হিন্দুত্ববাদী ইসলামোফোবিয়ার সম্মতি উতপাদনের মাঝ দিয়ে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরির মতোই এক বিষাদ সিন্ধু।

২০২৪-এর ৫ আগস্টে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব উদ্ধার করলে বিপ্লবী ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন ড. মুহম্মদ ইউনূস। বিশ্বব্যাপী সুনামের দাবিদার এই নোবেল বিজয়ীকে নিয়ে তখন শুরু হয় উপনিবেশ হারানোর বেদনায় মুষড়ে পড়া ভারতীয় মিডিয়ার ন্যারেটিভ নির্মাণ। পশ্চিমা এনলাইটেনমেন্টের জগতে আদৃত ইউনুসকে মুসলিম শাসক হিসেবে চিত্রিত করার ক্লিশে চেষ্টা করতে থাকে হিন্দুত্ববাদী চিত্রনাট্যকাররা। এই যে মুঘল সাম্রাজ্যে ততকালীন পৃথিবীর শীর্ষ জিডিপি অর্জনকারী আওরঙ্গজেবকে যেভাবে ছাব্বা ছবিতে বর্বর মুসলিম শাসক হিসেবে দেখিয়েছে বর্বর হিন্দুত্ববাদী চলচ্চিত্র নির্মাতা। যে হিন্দুত্ববাদের মনোজগত ৩০০ বছর আগের মুসলিম শাসনের প্রতিশোধ নিতে মনের মাধুরী মিশিয়ে আওরঙ্গজেবকে চিত্রিত করতে পারে; সে সাত মাস আগের উপনিবেশ হারানোর প্রতিশোধ নিতে কতটা নির্লজ্জ হতে পারে; ভারতীয় মিডিয়া সেই প্রমাণটি রেখেছে প্রতিদিন। প্রোপাগান্ডারও তো একটা স্তর থাকে। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া প্রোপাগান্ডা পৃথিবীর প্রোপাগান্ডার স্তরে নিম্নতম মানের ও বুদ্ধাংকের।

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ভারতীয় মিডিয়া বয়ানে দিল্লির মনপছন্দ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় না থাকা মানেই বাংলাদেশ ইসলামি মৌলবাদের খপ্পরে। অথচ ২০১৪ সাল থেকে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা হিন্দু মৌলবাদের দখলে। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে ইসলামপন্থী দলগুলো কখনও কোনো নির্বাচনে জনসমর্থন পায়নি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সতত মধ্যপন্থী। তারা হাসিনার হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থা কিংবা জামায়াত ও ইসলামপন্থী চরমপন্থাকে প্রত্যাখান করে।

বাংলাদেশের হিন্দুজনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশ যারা ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বিজেপির আওয়ামীলীগ শাখা; তারা ২০১৪-২৪ আওয়ামীলীগের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল। হাসিনার পতনের পর মানবতা বিরোধী অপরাধের দোসর মুসলিম আওয়ামীলীগারেরা যেমন নির্যাতিত মানুষের রুদ্ররোষে পড়েছে; তেমনি হিন্দু আওয়ামীলীগারও নির্যাতিতদের রুদ্ররোষে পড়েছে। প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া যেভাবে তৈরি হয়। অথচ ভারতীয় মিডিয়া আওয়ামীলীগের অপরাধের দোসর হিন্দুদের সংখ্যালঘু হিসেবে চিত্রিত করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। গোয়েবলসের মতো একটি মিথ্যা একশো বার উচ্চারণ করে তাকে সত্য প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

১৬ বছর ভারতীয় উপনিবেশে ইসলামোফোবিয়ায় নির্যাতিত বাংলাদেশি ইসলামপন্থীদের একটি অংশ ৫ আগস্টের মুক্তি উদযাপনে বেপরোয়া হয়েছে। আবার ইসলামপন্থীরা হিন্দুদের মন্দির পাহারা দেওয়া ও দুর্গা পূজা নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হবার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থা আসলে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী উস্কানির প্রতিক্রিয়া। হিন্দুত্ববাদীরা ভারতের বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে এই উস্কানি তৈরি করেছিল। এর পাশাপাশি ভারতের কর্মচারি আওয়ামীলীগের সাংস্কৃতিক বলয়, হিন্দুত্ববাদকে প্রগতিশীল সংস্কৃতি বলে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে মুসলিম আত্মপরিচয় ধরে রাখতে ছোটোখাটো মানুষের সৌদি সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

যদি মুসলিম বিদ্বেষী ও প্রতিশোধ প্রবণ ভারতের আগ্রাসন না থাকত; এরকম সার্বভৌমত্ব হারানোর অনিশ্চয়তাপূর্ণ ভূগোল না হতো; তাহলে বাংলাদেশ পাল-সেন-সুলতানি-মুঘল-নবাবি আমলের মতোই সম্প্রীতিময় দেশ হিসেবে বিশ্বময় নন্দিত হতো। ভারতের প্রাত্যহিক উস্কানি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের মুসলমানেরা যদি হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান-পাহাড়ি মানুষের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ একটি জনপদ গড়তে পারে; সেটাই হবে ভারতীয় স্যাঁতসেতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর। চোখের বদলে চোখের নেশায় অন্ধ ভারতের বিপরীতে সম্প্রীতিময় চক্ষুষ্মান বাংলাদেশই আমাদের অঙ্গীকার।

(ছবিতে ছাব্বা চলচ্চিত্রে আওরঙ্গজেবকে যেভাবে দেখানো হয়েছে)

 

৩৮৪ পঠিত ... ১৬:৫৯, মার্চ ১৯, ২০২৫

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top