আমি আমার বিসিএস প্রিপারেশনে সময়ের গুরুত্ব যেভাবে দিয়েছিলাম

৬০ পঠিত ... ১৮:৫১, জানুয়ারি ০৮, ২০২৬

আমি আমার বিসিএস প্রিপারেশনে সময়ের গুরুত্ব যেভাবে দিয়েছিলাম:

১। শার্ট তো পরতামই না, প্যান্ট জাঙ্গিয়া কিছুই পরতাম না! পুরো একটা বছর সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে কাটিয়েছি। শুধু শীত লাগলে একটা চটের বস্তা জড়িয়ে নিতাম।

ভাবছেন, বাইরে যাওয়ার সময়? ভাই পড়তে পড়তে বাইরে যাওয়ার সময় কই? একটা সেকেন্ডের জন্যও ঘরের বাইরে যাইনি। বের হয়েছি শুধু প্রিলি রিটেন আর ভাইভার সময়... ঐদিনগুলো ব্যতীত একদিনও গায়ে কোন কাপড় জড়াইনি।

২। চুল দাড়ি কিছুই কাটাতাম না কারণ নাপিতের দোকানে যেতে আসতেও সময় নষ্ট হয়। চুল দাড়ি লম্বা হয়ে হিমালয়ের জটাধারী নাগা সন্ন্যাসীর মতো লাগত! লিখতে অসুবিধা হয় বলে জাস্ট নিয়মিত নখ কাটিয়ে নিতাম ১০-১৫ সেকেন্ডে (সেটাও বই পড়তে পড়তে, আম্মু কেটে দিত)

৩। একটা বছর এক মিলিসেকেন্ডের জন্যও ঘুমাইনি। এটা বিশ্বরেকর্ড হওয়ার কথা, বাট সেটা গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ই-মেইল করার মতো সময়টাও ছিল না বলে কেউ জানে না। ঐসময়ের আফটার ইফেক্টে এখন এমন অবস্থা যে এখন ঘুমাইলেও চোখ খুলে রাখি মাছের মতো! আপনার দিকে তাকায় থাকবো, আপনি ভাববেন আমি সব শুনতেছি। আসলে কিছুই শুনতেছি না।

৪। দিনের বেলা সুস্থ থাকা অবস্থায় এক মুহূর্তের জন্যও বেডে শুয়ে রেস্ট তো নিইইনি, হেলান দিয়েও রেস্ট নেইনি। দাঁড়ায়ে হাঁটাচলা করার তো প্রশ্নই ওঠে না। পুরোটা সময় টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে বইখাতার দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। ইনফ্যাক্ট খেতেও যেতাম না। নল দিয়ে তরল খাবার খেতাম। প্রস্রাব পায়খানার জন্যও চেয়ারে বিশেষ ব্যবস্থা ছিল।

ইনফ্যাক্ট মশা-মাছি, তেলাপোকা, বোলতা বিচ্ছু এগুলো মারার জন্যও বই খাতা থেকে হাত উঠাইনি। কামড়ের ব্যথা সহ্য করে পড়াশোনা করে গেছি। কিছু করতে চাইলেই মনকে বুঝাতাম—আমি নিজের সাথে বেইমানি করছি, আমার সময় নষ্ট না করার কমিটমেন্ট থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। মশা মারার জন্যও যদি একটু মুভমেন্ট করি তাহলে হয়তো এক মার্ক বোধহয় প্রিলিতে কমে যাবে! চুষুক ও রক্ত চুষুক, আমি এমপিথ্রি চুষি!

৫। সময় বাঁচাতে কোচিং করিনি, ইনফ্যাক্ট আমি কোন কোচিংয়ের নামই জানতাম না। কোচিংয়ে যেতে আসতে, লেকচার শুনতে যে সময় ব্যয় হয় সেটা দিয়ে বাসায় বই পড়লে আর নিজে নিজে পরীক্ষা দিলে তিন চারগুণ লাভ হয়।

৬। শুধু এমপিথ্রি ও লোকাল টেক্সটের ওপর ভরসা করিনি। নেপালের মিউজিয়াম থেকে চর্যাপদের আসল পুঁথিটি আনিয়েছিলাম। সায়েন্সের জন্য আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি, হকিংসের ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম, ম্যাথের জন্য নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা আনিয়েছিলাম। অক্সফোর্ড ডিকশনারী ও বাংলা অভিধান পুরোটা মুখস্থ করেছি। ইংরেজী ও বাংলা সাহিত্যের জন্য নিয়মিত প্ল্যানচেটে টিএস ইলিয়ট, পিবি শেলী, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমদের ভূত নামিয়ে তাদের সাথে কথা বলতাম।  

৭। দুই ঈদ, পূজা, শহীদ দিবস, বিজয় দিবস, ভ্যালেন্টাইনস- এসব বিশেষ ছুটির দিনগুলোর ৫ দিন আগে থেকে আমার রুমের দরজা জানলা বন্ধ করে দেওয়া হতো। রমজানের চাঁদ দেখা, কুরবানী ঈদের আগে গরুর গোবর মুত আর হাম্বাডাক বা পরে গরুর মাংসের গন্ধ, পূজার ঢাক-উলু, জাতীয় দিবসগুলোয় পাড়ার আওয়ামীলীগের পোলাপানের মাইকে বাজানো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বা "রাত পোহালে শোনা যেত"... কোনকিছুই আমি শুনতাম না, দেখতাম না, শুঁকতাম না, ইনফ্যাক্ট জানতামও না আজকে অমুক দিবস।

সর্বোপরি প্রতিমুহূর্ত না শুধু প্রতি ন্যানোসেকেন্ডও ধ্যানে ও জ্ঞানে পড়াশোনাকেই রেখেছি। যত সমস্যা ও বাধা আসুক, পড়াশোনায় কোনো ছাড় দেইনি।

--

তবে আমি দূর্বল মেধার ছিলাম বলে এতো পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের পরও বিসিএস প্রিলি পার করতে পারি নাই!

তবে আমি পারি নাই বলে আপনিও পারবেন না এমন কোন কথা নাই! যারা আমার মতো দুর্বল মেধার ও চাকরির পড়াশোনা করছেন, আপনাদেরকে বলবো—পড়াশোনা বাদে দুনিয়ার সবকিছু ভুলে যান।

আজ আপনার সময়, শরীর, মন, জীবন যৌবন, মান ইজ্জত, টাকা পয়সা সব বিসিএসকে দিন... কাল বিসিএস ক্যাডার হয়ে গেলে গোটা দেশের কাছ থেকে এগুলা কড়ায় গন্ডায় ছিনায়ে নিয়া নিতে পারবেন।

সবার প্রতি শুভকামনা রইল।

 

তাওসিফ ফেরদৌস

প্রিলি অকৃতকার্য

৪৫তম বিসিএস, মেধাক্রম: নাই

(বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত)

৬০ পঠিত ... ১৮:৫১, জানুয়ারি ০৮, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top