ছমিরন বেগমের কয়েক সেকেন্ড

১৫৭ পঠিত ... ১৭:৫৯, জানুয়ারি ১৪, ২০২৩

ছমিরন-বেগমের-কয়েক-সেকেন্ড

বনানী ফুটওভার ব্রিজে ছোটখাটো একটা নাটক জমে গেছে।

আমজাদ মিয়া এই মুহূর্তে খুবই বিরক্ত। ফকিন্নীর ঘরের ফকিন্নী, সিড়ি চলে, তাতে পাড়া দিয়া উইঠ্যা গেলেই হয়, হেয় হাউকাউ লাগাইছে!

আশেপাশে উৎসাহী লোক প্রচুর। হা করে দেখছে মজা। এই বাইঞ্চোদগুলারও কাম নাই। ক্যান, তোগো মা-বইন-বউ জীবনে পরথমবার জ্যাতা সিড়িতে উঠতে গিয়া হাউকাউ করে নাই?

আমজাদ মিয়া গলার রগ ফুলিয়ে বললো, ‘আরে আবাগীর বেটি, আমার বাম ঠ্যাং লুলা। কোলে নিছি আবুইদ্যা। আরেক হাতে তোরে ধরছি। তুই ডরাস ক্যান? মরলে তো একলগেই মরুম। ঠ্যাং দে একটা।‘

ছমিরন বেগমের চোখে পানি চলে এসেছে। না, ভয়ে না। তার কারণেই তার স্বামী এমন লজ্জায় পড়ছে চিন্তা করে। কী তাজ্জব কারবার! সিড়ি বলে এমনে তরতরায়া উপরে উইঠ্যা যায়! দেখলেই তো মাথা ঝিমঝিম করে! এমন সিড়িতে কইলেই তো ফাল দিয়া উইঠ্যা যাওন যায় না!

আমজাদ মিয়া নিজেকে লুলা বলায় আরেকটু কষ্ট পেয়েছে। তার স্বামী তো লুলা না! ছোটবেলায় পোলিও হওয়ায় বাম ঠ্যাঙের পাতা একটুখানি বাইক্যা গেছে খালি। সবার সামনে লুলা কইয়া কী শান্তি পায় মানুষটা?

ছমিরন বেগম চোখ বন্ধ করে রয়েছে, এরমধ্যেই একটা হ্যাঁচকা টান খেলো। আশেপাশে শুনলো হাততালির আওয়াজ। চোখ খুলে টের পেলো আমজাদ মিয়া টান দিয়ে তাকে এই চলন্ত সিড়িতে উঠিয়ে ফেলেছে। আশাপাশের জড়ো হওয়া মানুষ হাততালি শেষ করে এখন চলে যাচ্ছে। নাটক শেষ।

আমজাদ মিয়া আস্তে করে বললো, ‘সিড়ির থিকা নামনের সময় আস্তে কইরা ঠ্যাং বাড়াইয়া নাইম্যা যাইবি। আবার সিনেমা করিস না।‘

- আপনে হজ্ঞল সময় এমুন করেন ক্যান? সিড়ি দেখতে না আইলে কী অইতো?

- একটা জিনিস আমি দেখছি, আর তুই দেখতি না? কী কস এইডা বউ?

ছমিরন চোখের ভ্রুকুটি হানলো। কপট রাগ।

মহাখালী ডিওএইচএস রোডে রিকশা চালিয়ে আজকে বিকালের আগেই আমজাদ মিয়ার আয় সাড়ে ছয়শো টাকা। অন্যদিন অর্ধেকও হয় না। আজকে কী কারণে এই রোডে ইজি বাইক স্ট্রাইক, এই জন্যে খ্যাপ পেয়েছে ডাবল!

তারপর আজকে একটা কাণ্ডও ঘটেছে। বাম পা'টা একটু বাকা বলে একটু বামে কাত হয়ে প্যাডেল মারতে হয়। আজকে এইরকম একটু বাকা হতে গিয়ে হুড়মুড়িয়ে রিকশা থেকে পড়ে গিয়েছিলো দুপুরে। ব্যাপারটা কী? শরীলের কী হইলো? ব্যালান্স নাই ক্যান?

একটুখানি ছিলকে গেছে হাটুর কাছে, তেমন কিছু না। কিন্তু আজকের বুড়ামতোন যাত্রীটা এইজন্য আরও একশো টাকা বেশি দিয়ে গেছে! বলে গেছে- চিকিৎসা করাইস।

আমজাদ মিয়ার চোখে পানি চলে এসেছিলো। আল্লাহপাক মানুষের মধ্যে কিছু ফেরেশতা দিয়া পাঠান!

তখনই ঠিক করে ফেলেছিলো, আজকে সন্ধ্যায় আর রিকশা চালাবে না। বনানী ফুটওভার ব্রিজটা দেখানি দরকার ছমিরনরে। গরীব ঘরের মাইয়া, কত কিছু দেখে নাই!

- স্যার বেলুন লাগবো?

ব্রিজের উপরে বেলুনওয়ালার ডাকে আবার যেন বাস্তবে ফিরে এলো- কত কইরা তোর বেলুন?

- বিশ ট্যাকা স্যার।

আমজাদ মিয়াকে কেউ স্যার ডাকে না। আজকে এক কোলে বাচ্চা, আরেক পাশে বউ দেখে বেলুনওয়ালা তাকে সম্ভ্রমভরে স্যার ডাকছে। আমজাদ মিয়ার মনটা ফুরফুরা হয়ে গেলো

- কী কস না কস হউরের পো! পনেরো ট্যাকায় দিবি?

- স্যার, একদাম বিশ ট্যাকা।

আমজাদ মিয়া নরম গলায় বললো- আচ্ছা, দে একটা।

ছমিরন বিবি চাপা গলায় বললো- আপনের অইছে কী? বিশ ট্যাকা দিয়া মাইয়ের লাইগ্যা বেলুন কিনেন ক্যান? এই আবুইদ্যা বেলুনের কী বুঝবো? হুদা কামে অতোডি ট্যাকা খরচ করেন!

আমজাদ মিয়া ত্যারছা হাসি দিলো। এইটা তো সে বেলুন কিনে নাই, একটু সুখ কিনছে। আজকে একটু সুখই হইলো নাইলে।

সিড়ি দিয়ে নামার সময় বাম দিকে আবার যেন একটু কাত হয়ে গেলো। ঘটনা কী? আইজকা এমুন হইতাছে ক্যান?

বাচ্চাটাকে তাড়াতাড়ি ছমিরনের কাছে দিয়ে দিলো। নামার সিড়ি সিমেন্ট-কংক্রিটের, ছমিরনের সমস্যা নাই।

ওভারব্রিজের সিড়ির পাশেই বড়সড় একটা রেস্টুরেন্ট। এই রেস্টুরেন্টে সিএনজিওয়ালার সন্ধ্যার চা-সমুচা খেতে আসে। আমজাদ মিয়াদের এখানে খেলে পোষাবে না। সন্ধ্যার চা বিড়ি তারা পাশের টং দোকানে খায়।

কিন্তু আজকে আমজাদ মিয়া ওখানেই ঢুকলো। সামনের একটা টেবিল দেখে বসলো। গলার রোয়া ফুলিয়ে ডাক দিলো- ওয়েটার!

রেস্টুরেন্টের ওয়েটার এই ডাকের সাথে বিলক্ষণ পরিচিত। বেড়াল মাঝেমধ্যে বাঘ হয়। সাথে যখন বউ থাকে। এইসময় তাদের সাথে তাজিমের সাথে কথা বলতে হয়।

একেবারে ভেজা বেড়ালের মতো কাছে গিয়ে বললো- জ্বি স্যার?

- গ্রিল আনবা তিন কোয়ার্টার। আমারে দিবা সিনার গোস্ত। এরারে দিবা মুরগির রান।

ছমিরন চোখ কপালে তুলে বললো- আপনে এই আবুইদ্যার লিগা নিতাছেন ক্যান? হ্যায় এই খাওনের কী বুঝবো?

- আরে খাক! বাপের কাছ থিকাই তো খাওন শিখবো। পরের বাড়িতে গেলে কী খাইবো না খাইবো তার ঠিক আছে?

ভারী কথা। ভারী কথা বলে আমজাদ মিয়ার আরাম লাগলো।

ছমিরন হাসি দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো- দাঁত উঠে নাই মাইয়ার পরের বাড়ির চিন্তা করে মানুষটা!

আমজাদ মিয়াও হাসলো। আজকে খালি সুখের কথাই ভাবতে ভালো লাগতেছে। ঐ ঠ্যাংটা ঘরে গিয়া রাইতে ভাতের লগে দুইভাগ কইরা খাওন যাইবো।

-আইচ্ছা, ঘরে মুরগি পুড়া দিয়া এতো মজা তো লাগে না! কী দিছে এইডার ভিত্রে? -ঠ্যাং চাবাতে চাবাতে জিজ্ঞেস করলো ছমিরন বিবি।

- এইডা হ্যারার সিরকেট। খা, আরেকটা অর্ডার দিমু?

আঁতকে উঠলো ছমিরন বিবি- পয়সা কি আইজকা আপনের বেশি অইছে? আশি ট্যাকার গিরিল দুইডা খামু? সাথে রুডি নিছেন ক্যান? দুইডা ভাত ন্যান। শান্তি কইরা খাই।

- ছুটোলোকের ঝি! বালা খাওন তো খাস নাই জীবনে! এইডা রুডি দিয়ায় খায়। লগে একটু কাসুন্দিতে চুবান দিয়া খা। দ্যাখ কেমুন লাগে!

ওরা গ্রিল খেলো, কাসুন্দিতে চুবিয়ে রুটি খেলো, পিরিচে ঢেলে ফরফর শব্দ করে সর ভাসা মালাই চা খেলো। আমজাদ মিয়ার মনে হচ্ছে, আজকের দিনটাতে পৃথিবীর সব সুখ তারই। খুশির চোটে ওয়েটারকে দশ টাকা বখশিস পর্যন্ত দিয়ে ফেললো।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হবার সময় আবার বা পাশে টলকালো সে। ব্যাপারটা কী? এমুন হইতাছে ক্যান আজকা? কালকাই হোমিওপ্যাথির বড়ি খাইতে হইবো।

ফুটপাতের পাশেই সাই সাই করে বাস এসে থামছে। অন্যদিন এইখানে গিট্টু জ্যাম, আজকে কেন যেন খালি অনেকটা। একটু সামনেই একটা কসমেটিকসের ঝুপড়ি। আমজাদ হালকা গলায় বললো- টিপ কিনবি এক পাতা?

- টিপ? আচ্ছা কিইন্যা দ্যান। অতো যহন শখ আফনের! ছমিরিন টিপ্পনি কাটে।

-আচ্ছা খাড়া তুই এইহানে বাচ্চারে কোলে লইয়া। আমি আইতাছি কিন্যা।

আমজাদ ফুটপাত থেকে রাস্তার দিকে পা বাড়ালো। ফুটপাতের মাঝখানে একটা গর্ত করা। কয়েক পা রাস্তায় হেটে আবার ফুটপাতে উঠে পড়লেই টিপের ঝুপড়ি।

কিন্তু রাস্তায় পা বাড়ানোর সাথে সাথেই শরীরটা আবার যেন হেলে পড়তে শুরু করলো। সাথে সাথেই দুই চোখে যেন একসাথে পড়লো বাসের তীব্র লাইট! কী ব্যাপার? বাসটা থামে না ক্যান? এইডার কী বেরেক নাই? আমজাদ মিয়া গলা ফুলিয়ে তীব্র চিৎকার দিয়ে উঠলো- বেরেক ধরেন, মিয়াবাই বেরেক ধরেন!

বাসের মাডগার্ডের তীব্র ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে আবার ফুটপাতেই গিয়ে পড়লো আমজাদ। সেই চুড়ির ঝুপড়ির পাশেই। আবার একগাদা লোক জড়ো হয়েছে। আবার একটা নাটক। কী নাম বাসের? সম্রাট? আনারকলি? যুবরাজ? কী আসে যায় তাতে?

ফুটওভার ব্রিজের খিলান ধরে থরথর করে কাপছে ছমিরন। এক কোলে ছয় মাসের অবুঝ শিশু। হাতের বেলুনটা কই যেন পড়ে গেছে। তাতে মা-মেয়ের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

ঐপাশে লোকটা কি মরে গেছে? নাকি বেচে আছে? কছে গেলেই চোখটা খুলে আস্তে করে বলবে- মুরগির টুকরাটা নিছোস তো? রাইতে ভাতের লগে খামু!

আর কয়েকটা সেকেন্ডের মধ্যেই জীবন সম্পূর্ণ দুইদিকে ঘুরে যেতে পারে ছমিরনের। তার কিছু জানতে ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে ফুটওভার ব্রিজটা আঁকড়ে ধরেই যদি কেটে যেতো এই একটা জীবন!

যাবার আগে শক্ত করে আরেকবার ধরলো ফুটওভার ব্রিজের খাম্বাটা। একটু আগে এই ব্রিজটাই যত্ন করে তাকে পার করে এনেছিলো তার স্বামী।

মুহূর্তের জন্য ছমিরনের মনে হলো- এই ফুটওভার ব্রিজটাই একটা আমজাদ মিয়া!

১৫৭ পঠিত ... ১৭:৫৯, জানুয়ারি ১৪, ২০২৩

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top