লেখা: শাখাওয়াত হোসেন
দুই হাজার কোনো এক সালে মুক্তি পাওয়া এই বাংলা সিনেমা বাংলাদেশের অধিকাংশ দর্শক দেখেছে আনন্দ বিনোদন লাভের উদ্দেশ্য। শুধু আমি একাই দেখেছি এবং উপভোগ করেছি এই সিনেমার গভীর সব অর্থ। নানাবিধ মেটাফোর ব্যবহার করে ভরপুর সামাজিক মেসেজ চোখে আঙুল গুঁতিয়ে দেখিয়ে দেওয়া এই ‘দাবাং’ সিনেমা সম্পর্কে আপনারা আদৌ পরিচিত নন।
*স্পয়লার অ্যালার্ট*
দাবাং সিনেমার গল্প মূলত কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে। সিনেমার শুরুর দিকে কক্সবাজারের শান্ত নিটোল পরিবেশ দেখিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, আমাদের দেশটা এমন সুন্দর। পরক্ষণেই ঐ সুন্দর কক্সবাজারের নিরপরাধ বালির মধ্যে শহরের নতুন ডন হওয়ার অভিপ্রায়ে মারামারি শুরু করেন হিটলার এবং কোবরা। মারামারির শেষদিকে এক হাতে কোবরার মাথা চেপে ধরে বালির ভেতর পুঁতে ফেলেন হিটলার। এবং নিজেকে শহরের নতুন ডন ঘোষণা করেন।
পরিচালক আজাদ খান খুব সুক্ষ্ণ কৌশলে দেখিয়েছেন, ক্ষমতার লোভে মানুষ কী করে বালির ভেতর পুঁতে গুম করে ফেলে বিপক্ষ দলকে। হিটলার হয়ে ওঠেন শহরের ডন। ত্রাস। তার সমস্ত অনুগত গুন্ডারা লাঠি চাপাতি হাতে শহরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। আর একজন সৎ পুলিশ অফিসার এসে তার সমস্ত মদের আড্ডা বন্ধ করার চেষ্টা করেন। একটা পর্যায়ে হিটলারকেও গ্রেফতার করতে সক্ষম হন। কিন্তু হিটলার একটা ঔষধ খেয়ে মুখ দিয়ে গল গল করে রক্ত বের করতে করতে মারা যান। তাকে হসপিটালে নিয়ে মৃত ঘোষণা করেন ডাক্তার। সিনেমা শেষ ভাবছেন?
আপনার কচু।
সিনেমা সবে শুরু।
মর্গ থেকে হঠাৎ মৃত হিটলার উঠে বসেন। তখন বুঝতে পারা যায়, হিটলার আসলে কেমন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন লোক। ঐ ঔষধটা ছিল বিশেষ এক ধরণের ঔষধ। আর যে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করে তাকে, সে ডাক্তারও তার নিজের লোক। পরিচালক আজাদ খান এই জায়গায় অকপটে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্নীতি তুলে ধরেছেন। ক’টা টাকার লোভে এরা ভুলভাল সার্টিফিকেট দেয়, দশ বারোটা অকারণ অপারেশন করে ফেলে। জীবিতকে মৃত করে, মৃতকে জীবিত করে।
হিটলার এরপর ঐ সৎ পুলিশ অফিসারকে মারার জন্য নিজের ভাই ওসমানকে পাঠান। এবং ওসমান ঐ পুলিশ অফিসারকে কুকুর কুকুর কুকুরের মতোন দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে মারেন। বউয়ের কোলে শুয়ে পুলিশ মরে যান। বউ দেশের আইন শৃঙ্খলার এমন অবনতি দেখে রাগের চোটে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করতে যান। চিৎকার করে বলেন, ‘ঐ খুনীদের শাস্তি দেয়ার জন্য সত্যি কেউ নেই।’
ঠিক তখন টুপি, দুল, চশমা পরিহিত কেউ একজন একটা বাইকের উপর বসে শব্দের প্রতিধ্বনি খেলতে খেলতে বলেন, ‘মিথ্যে কথা।’
কে সে?
'আজাদ। হি ইজ আজাদ। আজাদ দ্য গ্রেট। সে যা বলে, তা করে।'
সিনেমার হিরোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় আমাদের। আজাদ ভারী ভালো ছেলে। সে পুলিশের বউকে কথা দেয়, ত্রিশ দিনের ভেতর খুনীদের শাস্তি দেবে। শাস্তি দেয়ার জন্য আজাদ মুখে দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে সমুদ্র সৈকতে চলে যায় বন্দুক হাতে। যেখানে বুলবুলি ‘কুত কুত’ খেলছিল সখীর সঙ্গে। এবং পানিতে জলকেলি করছিল। আজাদ চারজন গুন্ডাকে ঐখানে গুলি করে মেরে ফেলে। তারপর দাঁড়ি গোঁফ খুলে ফেলে। এবং ঘটনাটা বুলবুলি দেখে ফেলে।
এই জায়গার মেসেজটা বুঝার চেষ্টা করুন। আজাদ দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে মারতে এসেছিল গুন্ডাদের। মারা শেষে দাড়ি গোঁফ খুলে ফেলল। তাও বুলবুলির পাশ কেটে যাওয়ার সময়। বর্তমান দেশে কী অমন হচ্ছে না? আমরা কী দেখতে পাচ্ছি না একদল হেলমেট বাহিনীকে? যারা হেলমেট পরে, তবে সেটা মুখ আড়াল করার জন্য নয়। ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য। যেমন আমরা জানি হেলমেটের ভেতর কার মুখ, কিন্তু ভয়ে বলি না। এটাই ত্রাস। যেভাবে বুলবুলি তার মুখ দেখল কি দেখল না, এই বিষয়ে সামান্যতম চিন্তাও আজাদের ছিল না। পরিচালক আজাদ খানকে স্যালুট।
হিটলারের গোপন আস্তানায় হামলা দিয়ে হিটলারকে নাজেহাল করে দিলো আজাদ। দু’জনের সাক্ষাৎ হলো। এবং দর্শকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো একটা নতুন চরিত্রের। রাজ। নাম তো শুনা হোগা। আজাদের পাতানো ভাই রাজ। ছোটবেলায় যাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল আজাদ, আজ বড় হওয়ার পর সে নিজের বুকে বোমা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে। আজাদের জন্য সে বারবার মরতে পারে।
পরিচালক আজাদ খান পুরো বিষয়টার মধ্যে রোমান্টিক ভাব আনয়ন করেছেন। আমাদের সমাজে সমকামীদের ঘৃণার চোখে দেখা হয়। আজাদ এবং রাজ, এই দুই বন্ধুর মধ্যে রোমান্টিক একটা বন্ধন সৃষ্টি করে পরিচালক আজাদ খান আমাদের সমাজের কোমরে আলতো করে টোকা দিয়েছেন। পুরুষে পুরুষেও প্রেম হয়। ওরাও মাথা রাখে একে অন্যের বুকে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হলুদ রঙা দাঁত বের করে কাঁদে।
রাজ শুধু আজাদের প্রেমে মগ্ন নয়, তার গার্লফ্রেন্ডও আছে। শুধু সমকাম নয়, বাইসেক্সুয়াল বিষয়টায়ও পরিচালক আজাদ খানের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। ঐ দিকে বুলবুলির সঙ্গে আজাদের একদিন দেখা হয়। আজাদের মনে ধরে বুলবুলিকে। যখন বুলবুলির মাতাল পিতা মরে যায়, তখন বুলবুলিকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে আজাদ। রাজ বুলবুলিকে ছোট বোন বলে সম্বোধন করে। চাইলেই এইখানে ষড়ভুজ এঙ্গেলের প্রেম দেখানো যেত, কিন্তু পরিচালক আজাদ খান বানাচ্ছেন সামাজিক মেসেজ নির্ভর সিনেমা। পদ্মা নদীর মাঝি, চোখের বালি নামক উপন্যাসগুলোতে যে হারে পরকীয়া উপস্থাপন করা হয়েছে, পরিচালক আজাদ খানের তা পছন্দ নয়। দেবর ভাবী কিংবা শালীর সঙ্গে পরকীয়ার মতোন সস্তা বাজে একটা দিক প্রচার করার পক্ষে তিনি নন, বরং বন্ধনটা ভাই ও বোন হিসেবে ঠিক করেছেন।
এরমধ্যে একদিন হিটলারের ভাই ওসমানকে রাজ ও আজাদ মেরে হসপিটালে পাঠিয়ে দেয়। হিটলারের সঙ্গে থাকা একটি মেয়ে, যে ভালোবাসতো হিটলারকে, সে অন্য একটা মেয়ের হিংসের বলি হয়ে মরে যায়। হুমায়ূন একটা কথা বলেছেন, পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে। একটাও খারাপ বাবা নেই। এই অমূল্য বাণীটা যেন ভিন্ন আঙ্গিকে দেখালেন পরিচালক আজাদ খান। মন্দ মানুষদেরও ভালোবাসার মানুষ থাকে। হিটলার নিজের প্রেমিকাকে দাফন করে কবরের সামনে যখন কাঁদে, তখন আজাদ ফোন করে বলে, ‘আজাদ। আই এম আজাদ। আজাদ দ্য গ্রেট। আমি যা বলি, তা করি।’
এটুকুন কথা আজাদ পুরো সিনেমায় সবাইকেই একবার করে বলেছে। শুধু হিটলারকে বলেছে বারবার। চতুর্থবারের মতোন নাম পরিচয় দেয়ার পাশাপাশি আজাদ এও জানায়, হিটলারের ভাই ওসমান আজ মরে যাবে।
ওসমানকে মারার জন্য একটা ছুরি হাতে দৌড়ে যান সিনেমার শুরুর দিকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে মরতে চাওয়া সৎ পুলিশের বউ। হিটলার দ্রুত পৌঁছে যায় ভাইয়ের কাছে। পুলিশের বউকে গুলি করে ঝাঁঝরা করেও ভাইকে বাঁচাতে পারে না সে। প্রতিশোধ নিতে সে দারুণ একটা গেইম খেলে। আজাদের দূর্বল জায়গা রাজ। দূর্বল জায়গায় আঘাত করে। রাজ যখন তার ছোটবোন বুলবুলির জন্য শাড়ি কিনে ফিরছিল, কয়েকজন লোকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে প্যাকেট অদল বদল হয়ে যায়। যে প্যাকেট নিয়ে রাজ ঘরে ফেরে, ওটায় ছিল বোমা।
এই জায়গায় পরিচালক আজাদ খান আমাদের জানাচ্ছেন, অপরিচিত মানুষের দেয়া কিছু খাবেন না। এমনকি ধাক্কাও না। ব্যাগ অদল বদল হয়ে যেতে পারে। হয়তো বউয়ের জন্য শাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন, বউয়ের নাম তনিমা। বাড়ি গিয়ে প্যাকেট খুলে দেখলেন ‘ভালোবাসি’ লেখা কার্ড, উপরে লেখা সখিনা।
যাইহোক, ঐদিকে হিটলার ফোন করে আজাদকে জানিয়ে দেয় বোমার কথা। আর এইদিকে বুলবুলির জন্য শাড়ি নিয়ে এসেছে শুনে রাজের গার্লফ্রেন্ড আহ্লাদ করে বলে, আমি পরব আমি পরব। তারপর পরতে গিয়ে অক্কা পায়। এই জায়গায় কারিশমা দেখিয়েছেন পরিচালক আজাদ খান। অতি আহ্লাদ যে ভালো না, এই বিষয়টা এতটা স্পষ্ট করে আগে কখনও কোনো মুভিতে দেখানো হয়নি বলেই আমার ধারণা।
প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেয়েদের ‘আম্মুর শাড়ি, আপুর শাড়ি’ পরে আহ্লাদ করতে দেখা যায়। তাদের জন্য এই সিনেমা একটা সতর্ক বার্তা হয়ে থাকল। যা মানুষ পায়, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। অতি আহ্লাদ করে অন্যের শাড়ি পরা উচিৎ নয়।
রাজের গার্লফ্রেন্ড মরে যাওয়ার পর রাজ গরম হয়ে যায়। প্রচুর কোপায় সে। রাস্তায় রাস্তায়। এবং একদিন পাল্টা আক্রমনে নিজেও মরে যায়। আজাদ বন্ধুর লাশ বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে গাল দেয় হিটলারকে, ‘ইউ সান অব অ্যা বিচ।’ এরপর ক্লাইমেক্সে রাজের দাফন হওয়ার পাশাপাশি হিটলার এবং আজাদ দ্য গ্রেটের সঙ্গে তুমুল মারামারি শুরু হয়। সবশেষে অর্ধমৃত হিটলারকে গাড়ি করে এনে জীবিত কবরে পুঁতে ফেলা হয়।
সিনেমার শুরুতে যেভাবে কোবরাকে বালিতে জীবিত পুঁতে শহরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল হিটলার, সিনেমার শেষে ঠিক ঐভাবেই তাকে জীবিত পুঁতে ফেলার মাধ্যমে ত্রাসের সাম্রাজ্য ধ্বঃস করে দেয়া হয় তার।
সর্বশেষ এই মেসেজটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছুর শেষ আছে। একদিন সকল ক্ষমতা চলে যাবে মাটির ভেতর। উপরে পড়ে থাকবে ধ্বঃসস্তুপ শুধু। আর অসংখ্য মৃত লাশ। তাছাড়া পরিচালক আজাদ খান ক্লাইমেক্সে একটি ট্রিবিউট দিয়েছেন দুনিয়া কাঁপানো তুরস্কের টিভি সিরিজ ‘সুলতান সুলেমান’ এর সুলেমানের মুখ নিঃসৃহ একটা অমুল্য বাণী।
‘ক্ষমতা হলো আগুনের তৈরী পোশাক। এটি যদি ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারো, তোমায় রক্ষা করবে। একটু অসর্তক হলে, নিজেই পুড়ে ছাই হবে।’
হিটলারের পতনের মাধ্যমে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন পরিচালক আজাদ খান আমাদের সু্ক্ষ্ণ একটি তথ্য জানাতে চেয়েছেন। কয়জনই বা আমরা তার খোঁজ রাখি। এই ছিল দাবাং সিনেমা। বাংলা চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া সিনেমা। আজাদ দ্য গ্রেট চরিত্রে অভিনয় করেছেন জায়েদ খান। তার যোগ্যতা নিয়ে কথা বলার অভিনয় আমার নেই। বলিউডের তিন খান, টলিউডের শূন্য খান আর আমাদের জায়েদ খান।
অনর্গল মেটাফোর ব্যবহার করে বাংলাদেশের সমাজ, শাসনব্যবস্থা, কুসংস্কার, রাজনীতি কিংবা বর্তমান পরিস্থিতি চোখে আঙুল গুঁতিয়ে দেখিয়েছেন পরিচালক আজাদ খান। তিনিই আজাদ খান। আজাদ দ্য গ্রেট। সবকিছু বিবেচনা করে আমি শুধু এটা বলতে চাই, এই সিনেমা আমাদের সিনেমা। এই সিনেমা সময়ের চেয়ে বহু এগিয়ে থাকা সিনেমা। দেখার পর রক্ত গরম হয়ে বাসায় কাঁচের দুয়েকটা জিনিসপত্র ভেঙে ফেলার মতোন একটা সিনেমা। জীবন বদলে দেয়ার মতোন একটা সিনেমা।
সিনেমায় টাকা ঢেলেছেন: আতিকুর রহমান লিটন
সিনেমাটা নিজ হাতে লিখেছেন: আব্দুল আলীম, কমল সরকার, আজাদ খান স্বয়ং
ক্যামেরার পেছনে ছিলেন: আজাদ খান
দেখে ধন্য হতে পারবো: ইউটিউব



পাঠকের মন্তব্য