প্রায় সতেরো মাস ধরে অবসাদে ভুগছেন শিবব্রত দাদা। আগে দিবসগুলোর অনুষ্ঠান আয়োজনে অনেক অর্থ বরাদ্দ ছিল। ফলে বারো মাসে তেরো দিবসে ভাটের আলাপ করার জন্য শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমিতে ডাক পড়ত। বিটিভিতে গিয়ে 'কাঁদো বাঙালি কাঁদো' সিরিজে দুটি কথা বলে; টুটি ফ্রুটি চেক নিয়ে বাসায় ফেরা যেতো। প্রেস ক্লাবে দুঃস্থ সাংবাদিকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের ত্রাণ বিতরণের চেক পাওয়া যেত। গণভবনের পিঠাপুলির আসরে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া যেত। কোথায় গেল সেসব সোনালি দিন। কলকাতার কবি সভায় দলবেঁধে সরকারি খরচে তীর্থে যাবার সেসব অমল ধবল দিন। টিভি টকশোতে উন্নয়নের গান গাইতে যাবার কালে তরুণী ভক্ত মিউজ হিসেবে ঘুরঘুর করতো চারপাশে। আহা সেসব বসন্ত দিন। পূর্বাচলের সরকারি প্লটখানা বুঝে পাবার আগেই গণেশ উলটে গেলো। নয়নের মণি বুবুটি মোর বাণপ্রস্থ নিলেন লুটিয়েন্সে।
বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে রঙ চায়ে টোস্ট বিস্কিট ভিজিয়ে খেতে খেতে ঠোঁট ছিলে যায়। তখন শিবব্রত দাদা ফেসবুকে এসে জুলাই তারুণ্যকে বকাঝকা করে 'না' ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে তারপর অনেকক্ষণ কমোডে বসে অপেক্ষা। রাতে ভিজিয়ে রাখা ইষব গুলের ভুষি খেয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোন সুরাহা হয় না। তখন তীব্র রাগ হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর। ফেসবুকে ইউনুসকে জিন্নাহ বলে গালি দেবার চাপে পেট মোচড় দেয়।
ফোনটা বেজে ওঠে, ললিতাদি উত্তেজিত হয়ে ফোন করেছে, ও শিবুদা পোস্টাল ব্যালট কেলেংকারি হয়েছে; পোস্ট দাও পোস্ট দাও। শিবুদা তখন ফেসবুকে ভাটের আলাপ সিরিজে পোস্টাল ব্যালট কেলেংকারিতে ইসলামপন্থীদের হাত রয়েছে বলে বীণা সিক্রি টোনে একটি পোস্ট দেয়।
বৌদি এসে ধমক দেয়, মিনসের যে বের হবার কোনো লক্ষণ নেই। দুঘণ্টা ধরে অকুপাই করে রেখেছ; সে হুঁশ কি আছে! যা দুঘণ্টায় হয়নি তা আর কোনোদিন হবে না! রহমত ভাই এসেছে দেখা করতে; শিগগির বের হও।
শিবব্রত দাদা ইসলামপন্থীদের গালি দিতে দিতে প্রসাধন কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে। রহমত ভাই ব্যাকুল হয়ে বসে। আজকাল সে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীলতা বিষয়ে কীভাবে কথা বলতে হয়; তা শিখতে শিবব্রত দাদার কণ্ঠশীলন ক্লাস করতে আসে। শিবব্রত দাদা খুব মনোযোগ দিয়ে তাকে শেখায় কীভাবে তকমা দিয়ে লোকজনকে জাতচ্যুত করতে হয়। কী করে লোকজনের সামনে সংস্কৃতি ও প্রগতিশীলতার বড়াই করতে হয়। রহমত ভাইও আজকাল কথায় কথায় ভাইয়ার দিব্যি দেয়; ভাইয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো; উনি বললেন, দেশ গড়ায় মন দিতে।
শিবব্রত দাদার মনটা আনচান করে, যদি ভাইয়ার একটু দেখা পাওয়া যেত। সতের মাস ধরে বুবুর 'পা পুজো' করতে না পেরে শরীরে নানারকম বার্ধক্যজনিত রোগ বাসা বেঁধেছে। ভাইয়ার 'পা পুজো' করতে পারলে হয়তো শরীর ভালো লাগবে। রহমত আশ্বাস দেয়, হবে দাদা হবে; এবার আমাদেরও অনেক করে সংস্কৃতি করতে হবে। কাজেই আপনার মতো সংস্কৃতিজনকে তো লাগবেই। নইলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মন্ত্র পাঠ ও প্রগতিশীলতার উজান নৃত্য কে করবে!
—ভেবুনি রহমত; এবার আমাদের সব ভোট ভাইয়ার জন্য; তাতে যদি কিছুকাল পর বুবুকে ফেরত পাওয়া যায়; বুবু ছাড়া আমি বাঁচবো না গো।
রঙ চা-এ টোস্ট বিসকিট ভিজিয়ে অনেক কসরত করে ভেজা ল্যাপচা বিসকিট মুখে পুরে চোখ বন্ধ করে চিবাতে থাকে রহমত। তারপর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর ভঙ্গিতে বলে, হ্যা ভোটের প্রচারণা ইউনুস কি করে করে! সে তো নিরপেক্ষতা হারালো।
—আলবাত; নিরপেক্ষতা ভেঙে খানচুর হয়ে গেছে। গণভোট গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এই দেকুন পালকি শর্মা কী বলছে! একই কথা বলছেন শাহদীন মালিক ও বিশিষ্ট ১০১ নাগরিক।
এমন সময় উত্তেজিত হয়ে ফোন করে সহমত ভাই, ও শিবুদা দেখেছ, আসিফ নজরুল এবার জুলাই তারুণ্যকে 'দায়মুক্তি' দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
শিবব্রত অশ্রুসিক্ত হয়ে হাসিনার পুলিশের জন্য কাঁদতে থাকে, ঐ যে থানা জ্বালিয়ে দিল! এতোগুলো দেশপ্রেমিক পুলিশ মারা গেল; ও রহমত ভাই, আপনারা ক্ষমতায় এলে এর বিচার করবেন না! আমাদের বিপ্লবদাকে কিন্তু চাকরিতে ফিরিয়ে নিতে হবে!
—শিশু-কিশোর-তরুণদের হত্যা করেছে যে পুলিশ; তাদের জন্য এত প্রকাশ্যে কাঁদবেন না দাদা। লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদুন।
রহমত ফিরে গেলে শিবব্রত দাদা মমতাজউদ্দীন আহমদের মতো সব হারানোর অভিব্যক্তি নিয়ে সোফায় বসে থাকে। বৌদি একটু ঢিলা খিঁচুড়ি আর পোড়া বেগুন এনে দেয়।
—আমার ক্ষিদে নেই গো। দুঃশ্চিন্তা হয়; বুবু কী খাচ্ছে না খাচ্ছে।
—থাক আর ঢং করুনিকো। তোমার বুবু ঠিকই কাঁঠালের বার্গার খাচ্ছে। তুমি এটুকু খেয়ে নাও; নইলে সুগার ফল করবে। ডায়াবেটিসের রোগী তবু এত অনিয়ম করো।
প্রবল অনিচ্ছায় শিবব্রত অল্প একটু খাবার মুখে তুলে বাকিটা বেড়ালটাকে খাইয়ে দেয়, খাও বাবা খাও; না খেলে শুকিয়ে যাবে বাবা।



পাঠকের মন্তব্য