সেই কাক ডাকা ভোর থেকে অনবরত ঝগড়া চলছে দুজনের। ঝগড়ার বিষয়বস্তু খুব সাধারণ। প্রকৃতির নিয়মও বোধহয় এমনই, সাধারণ ঝগড়া রূপ নেয় কুরুক্ষেত্রের।
রাতে বাচ্চাদের খাবার খাওয়ানোর কথা ছিল বাচ্চার বাবার।
কিন্তু বাবা রিল দেখতে গিয়ে সেটা ভুলে গিয়েছিল।
‘বলি সংসারটা কি আমার একার? খুব সুন্দর বাড়ি বানিয়ে নেচে নেচে দেখিয়েছিল বলে না হয় প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু না আছে আমার প্রতি খেয়াল, না আছে বাচ্চাগুলোর প্রতি ঠিকঠাক দরদ! আবার মনের মধ্যে কী কী চলে কে জানে! সারাক্ষণ এর ওর ফোনে গিয়ে গাছ থেকে রিল দেখে। সেই গল্প এসে আবার বাচ্চাগুলোর সাথে করে। উচ্ছ্বন্নে যাচ্ছে আমার সংসারটা।
চোখ বুঁজে সব শুনে গেলেও ভয়ে ভয়ে মুখ খুললো এবার বাচ্চার বাবা—কিন্তু তারপর তো খাবার আমিই এনেছিলাম, আমি কি শুধু ফোনের রিল দেখি? রিল দেখতে দেখতে মানুষগুলো যে খাবার খেয়ে ফেলে রাখে, তা যে বাচ্চাদের জন্য নিয়ে আসি তার জন্য কখনও তো একটুও গান গেয়ে শোনাওনি আমায়। পাশের ঘরে গেলে তো ঠিকই সুরেলা গলায় কথা বলো!
: পাশের ঘর? পাশের ঘর থেকে মাকড়সার কালাভুনাগুলো দিয়ে গিয়েছিল বলে রক্ষে! তুমি তো এই কমিউনিটি দেখিয়েই আমায় ফাঁসিয়েছো। বাচ্চাগুলোর শত শত বন্ধু হয়েছে এখানে। তুমি না থাকলেও ওদের আমি বড় বাবুই বানাতে পারব। এখানে এত বড় পরিবার আছে বলেই তো আছি। শুধু আমি বলে তোমার সংসার করে গেলাম।
: বলছিলাম আজ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আমি একটু বাইরে যাব? একটা ফটোশ্যুট আছে।
: কী? কী শ্যূট?
: আহা, মোবাইলের ক্যামেরার সামনে লেজ, পাখা নাড়িয়ে, পা ভাঁজ করে স্টাইল মেরে ছবি তোলার ব্যাপারটা... আমি গাছে বসলে মাঝেমাঝেই মানুষ ক্যামেরা তাক করে। ওরা আমায় নিয়ে রিল বানায় আমি বুঝতে পারি। ভাবলাম বাচ্চাগুলো কে নিয়ে...
: খবরদার! ওরা উড়তে পারে না ঠিকমত,একদম তোমার ডানার পাখনা ছিঁড়ে দেব!
বাচ্চাগুলোর একটু কাঁদকাঁদ হয়ে বাবাকে সমর্থন করার চেষ্টা একদম উবে গেল মায়ের চোখ রাঙানিতে।
: আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। ঐ পাশের মাঠটায় শস্য রোদে দিয়েছে। প্রায় একশজনের একটা দল আমরা বের হচ্ছি কীটপতঙ্গ আর মাকড়সা আনতে। রাতে বারবিকিউ করবো।
বাচ্চাদের আনন্দ আর দেখে কে! বাবার সাথে এই সুযোগে কুমিরের রিলের গল্প শুনতে পারবে।
মাঠে শস্য টোকানোর সময় হঠাৎ বিকট শব্দে চারিদিক কেঁপে ওঠে।
কী ব্যাপার! কোন এক নেতানিয়াহু নাকি শুধু সবাইকে মেরে ফেলে, হামলা করে। সে কি আমাদের এখানেও চলে এল!
উৎকণ্ঠায় মা বাবুইয়ের চোখে জল চলে এল, পাখা ঝাপটাতে শুরু করল। সবাই মিলে তৎক্ষণাৎ ফিরে এসে দেখলো তাদের আশ্রয়স্থল উপড়ে পড়ে আছে।
মানুষের জটলার জন্য ভয়ে যেতে পারছে না।
ওপর থেকে উড়ে উড়ে বোঝার চেষ্টা করছে। কোথায় তার ঝগড়ার সঙ্গীটি, কোথায় প্রাণাধিক প্রিয় বাচ্চাগুলো!
ঘটনার প্রায় তিনদিন হয়ে এল, বাবুই পাখিটি এখনও কাটা গাছটার ধারে অপেক্ষা করে। বাচ্চাগুলো নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও উড়ে গিয়ে থাকবে, নিশ্চয়ই থাকবে, আমার প্রথম বাচ্চারা!
চড়ুই খালা কিছু পোকা এনে দিয়ে যায় প্রত্যেকবেলা। খালা খেয়াল করে না, পোকাগুলো পাশে শুকিয়ে পড়ে থাকে।



পাঠকের মন্তব্য