লক্কড়-ঝকড় এক্সপ্রেস

৫৯ পঠিত ... ১৪:৫০, জুন ০৭, ২০২৬

আমি ঢাকার গণপরিবহনের এক জীবন্ত কঙ্কাল। বাইরে আমার চামড়া বলতে কিছু নেই, শুধু তালি মারা মরিচাধরা টিনের ক্যানভাস। সেখানে আঁকা আছে হাজারো রেষারেষির ক্ষতচিহ্ন। ভেতরের স্প্রিং-ভাঙা সিটগুলো দেখলে মনে হবে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র। অথচ এক দশক আগে যখন প্রথম এই শহরের পিচঢালা রাস্তায় নেমেছিলাম, আমার রূপালি রঙে রোদের আলো ঝিলমিল করত। আজ আমি এক চলন্ত নরক।

আমার মালিকের কাছে আমি কোনো বাহন নই, স্রেফ একটা টাকা ছাপানোর যন্ত্র। আমার ব্রেক ক্ষয়ে গেছে, ইঞ্জিন থেকে প্রতিনিয়ত কালো বিষাক্ত ধোঁয়া বের হয়, ফিটনেস সার্টিফিকেট বলতে কিছুই নেই। কিন্তু মালিকের লোভের কোনো শেষ নেই। প্রতি রাতে ট্রিপ শেষে যখন আমার ভাঙা হাড়গোড় নিয়ে গ্যারেজে একটু জিরোতে চাই, তখন শুধু শুনি জমার টাকার হিসাব। ইঞ্জিন বিকল হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলে মেরামতের বাজেট জোটে না। অথচ প্রতিদিন আমার সামর্থ্যের চেয়ে তিনগুণ বেশি যাত্রী বোঝাই করে আমার ওপর চালানো হয় নির্মম অত্যাচার। মালিকের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ে, আর আমার আয়ু কমে।

ফার্মগেট থেকে শাহবাগ—এই সামান্য পথটুকু আমার কাছে মনে হয় যেন এক যুগান্তরের যাত্রা। কারওয়ান বাজারের মোড়ে যখন আমি জ্যামে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন আমার ইঞ্জিনটা একটানা গোঙাতে থাকে। পিচঢালা রাস্তা থেকে ওঠা তপ্ত উত্তাপ আর আমার নিজের ইঞ্জিনের গরম মিলে ভেতরের যাত্রীরা যেন জীবন্ত তন্দুরি চিকেনে পরিণত হন।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার টিনের ছাদ ফেটে দীর্ঘশ্বাস বের হয়। চারপাশের শত শত গাড়ির হর্ন আর বিষাক্ত কালো ধোঁয়ার মাঝে আমি এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। জ্যাম যত বাড়ে, আমার ভেতরের মানুষের রক্তচাপও ততই বাড়ে।

আমার যিনি চালক, তাঁর কাছে স্টিয়ারিং হুইল মানে কোনো দায়িত্ব নয়, যেন ভিডিও গেমের রিমোট কন্ট্রোল। জ্যাম একটু ছুটলেই অন্য বাসের সঙ্গে যখন তিনি রেষারেষি শুরু করেন, তখন আমার জরাজীর্ণ বুকটা কেঁপে ওঠে। ব্রেক চাপলে কাজ হয় না, কিন্তু তাঁর পায়ের চাপ কমে না।

ভেতর থেকে তখন যাত্রীদের চিৎকার ভেসে আসে,
— ওই মিয়া, গাড়ি চালান নাকি মরণখেলা খেলেন? মারবেন নাকি আমাদের?

চালক তখন নির্বিকার চিত্তে কড়া কায়দায় উত্তর দেন,
— মামা, ডরাইলে বাসে উঠছেন ক্যান? ডাইরেক্ট হেলিকপ্টারে যাইতেন!

ট্রাফিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যখন তিনি উল্টো পথে গাড়ি ছোটান, তখন নিজেকে খুনি মনে হয়।

আমার দরজায় দাঁড়িয়ে হেলপার অনবরত গেট পিটিয়ে চিৎকার করে,
— গাবতলী, মিরপুর, ডাইরেক্ট গেটলক! কোনো লোকাল নাই!

অথচ ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। এক যাত্রী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন,
— এই ব্যাটা, বললি গেটলক, এখন তো ছাগলের মতো মানুষ ভরতাছস! নামা আমারে!

হেলপার তখন মুখ ভেংচে বলে,
— চিল্লাইয়েন না তো মামা! ভাড়া দিছেন আঠারো টাকা, ভাব দেখান যেন এসি গাড়ির মালিক! সামনে চাপেন, জায়গা খালি আছে!

বৃদ্ধ যাত্রীদের যেভাবে ধাক্কা দিয়ে নামানো হয়, কিংবা চলন্ত অবস্থায় যেভাবে নারীদের বাসে উঠতে বাধ্য করা হয়, তা দেখে আমার টিনের দেয়ালগুলো লজ্জায় শিউরে ওঠে। যাত্রীদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না; তারা যেন স্রেফ কিছু টাকার বস্তা।

আমি প্রতিদিন হাজারো মানুষের কান্না, ক্ষোভ আর ঘাম বহন করি। জ্যামে আটকে থেকে যখন আমার ভাঙা সাইলেন্সার দিয়ে তীব্র কালো ধোঁয়া বের হয়, তখন চারপাশের মানুষ আমাকে অভিশাপ দেয়। এই অভিশাপ আমার প্রাপ্য নয়; প্রাপ্য আমার পেছনের মানুষদের। আমি তো শুধু চলতে চাই সুস্থ শরীরে, নিয়ম মেনে। কিন্তু এই শহরে নিয়ম মানেই তো বিলাসিতা।

কোনো একদিন হয়তো ব্রেক ফেল করে কোনো এক সড়কদ্বীপের ওপর আছড়ে পড়ে আমার এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে। সেই দিনের অপেক্ষায় আজও আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছি ঢাকার রাজপথে।

৫৯ পঠিত ... ১৪:৫০, জুন ০৭, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top