পরীক্ষার আগের সেই রাত

৭২ পঠিত ... ১৮:০৭, জানুয়ারি ১৮, ২০২৬

পরীক্ষার আগের রাতের মতো আশ্চর্য রাত মানুষের জীবনে খুব কম আসে। এইসব রাত অনেক ঘটনাবহুল হয়। এইসব রাতে আমাদের হঠাৎ করে মনে হয়, যে উপন্যাসটা গত একশ বছর ধরে টেবিলের কোনায় পড়ে আছে, ওটা একটু পড়ে দেখলে এমন কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না পৃথিবীর। তিনশ বছর ধরে কোনো ফিকশনের ধারেকাছে না যাওয়া আমাদের মগজ এইসব রাতে গেঁথে যায় একেকটা গল্পের অস্থিমজ্জার ভেতর। এইসব রাতে আমাদের প্রচুর জ্ঞানতৃষ্ণা বাড়ে। ওই জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে আমরা এইসব রাতে ওই শিক্ষণীয় সিনেমা দেখা আরম্ভ করি, যে সিনেমাটা গত চুয়াল্লিশ বছর ধরে নিউ ফোল্ডারে রাখা ছিল।

পরীক্ষার আগের রাত মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা রাত। এইসব রাতে আমাদের কথা বলতে হয়। ছয়শ চুয়াত্তর বছর আগে ইনবক্সে যে মানুষটা 'হাই কামান আছান' জিজ্ঞেস করেছিল, তাকে উত্তর দিতে হয়, ভ্লো আছি। জানতে হয়, আপনি কামান আছেন? আপনার শরীর ভ্লো? মনটা কি ভ্লো? চলুন না একদিন মিট করি।

পরীক্ষার আগের রাতে আমরা আঁতকা দার্শনিক হয়ে উঠি। সক্রেটিস, প্লেটো কিংবা অ্যারিস্টটল বানানে আজীবন ভুল করে আসা আমরা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হই, পৃথিবীতে বানানই সবকিছু নয়, যদি হতো তবে কোনো সুস্থ মা তার পুত্রের নাম 'জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংপুক' রাখত না। ভুটানের রাজার নাম এটা। ভুটানের রাজধানীর নাম অবশ্য থিম্পু। থিম্পুর সাথে মিল আছে আমাদের টেম্পুর। টেম্পু করে উঠানামা পাঁচ টাকা। আর পাঁচ টাকা দিয়ে আমরা একটা বিড়িও পাই না আজকাল। যেভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য-দ্রব্যের দাম বাড়ছে হু হু করে; মনটা খারাপ হয় দেশের কথা ভেবে। ওই অর্থে আমরা দেশপ্রেমিকও বটে। তবে আমাদের পরীক্ষিত শ্রেষ্ঠ দুটো দেশপ্রেমিকের একটা বাংলাদেশ আর্মি, আরেকটা জামায়াতে ইসলাম। পরীক্ষার আগের রাতেই আমরা টেম্পু করে ভুটান হয়ে জাশিতে পৌঁছে যেতে পারি চোখের পলকে; এ এক আশ্চর্য গতিশীল পলিটিক্যাল রাত।

পরীক্ষার আগের রাতে আমাদের ইচ্ছা করে বাসার সমস্ত কাজকর্ম সেরে ফেলি। যে কিচেনভর্তি ছিল পেঁয়াজের খোসা, যে চুলোয় তিরানব্বই বছরের জং লেগেছিল, যে ময়লার বাক্স কাত হয়ে পড়েছিল, যে কয়েকটা ডিমের খোসায় মাকড়সা বাসা বেঁধেছিল; সব আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে ধুয়ে মুছে ঝকঝকে তকতকে করে ফেলি। পরীক্ষার আগের রাতে আমাদের গোয়ালঘর হয়ে ওঠে রাজবাড়ি। আমাদের ধুলোমাখা বুকশেলফ হয়ে উঠে পাকপবিত্র শ্মশান; এক সহস্র শতাব্দী ধরে যে ধুলোর আস্তরণ জমেছিল বইয়ের তাকে, তা আমরা চেটে চেটে পরিষ্কার করে ফেলি।

পরীক্ষার আগের রাতে আমাদের প্রেম করতে ইচ্ছা করে। প্রেম করা থাকলে বিবাহ করতে ইচ্ছা করে। বিবাহ করা থাকলে বাচ্চা নিতে ইচ্ছা করে। বাচ্চা নেয়া থাকলে বাচ্চাকে আদর করে পড়াশোনা করাতে ইচ্ছা করে। নিঃসন্তান হলে ‘মরামুখী, একটা বাচ্চা দিতে পারলি না’ বলে বউ পেটাতে ইচ্ছা করে। অথবা সবকিছু রেখে ইচ্ছা করে প্রেমিকা কিংবা বউয়ের সাথে চিট করি। মন চায় কাউকে চুমু খেয়ে আসি। মন চায় যে সুন্দর জীবনটা চলমান, ওটার পুন্দে একটা সিগারেট ধরিয়ে দিই। দিয়ে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকের মতো সোফায় হেলান দিয়ে বলি, আপুন কো জিন্দেগি মে কুচ ডেয়ারিং করনা থা।

পরীক্ষার আগের রাতে একজনের গোপন কথা আরেকজনকে লাগিয়ে ঝামেলা বাঁধাতে ইচ্ছা করে খুব। ইচ্ছা করে তুলসীকে গিয়ে বলি, তোকে মাইশা সেদিন বিম্বো ডেকেছে। ইচ্ছা করে মাইশাকে গিয়ে বলি, তোকে তুলসী সেদিন খাংকি ডেকেছে। তারপর ইচ্ছা করে রিধিমাকে গিয়ে বলি, তোকে মাইশা আর তুলসী 'পিক মি' বলেছে। পরীক্ষার আগের রাতে মন চায় সবার কথা সবাইকে বলে দিই। সবার সাথে সবার ফ্যাসাদ লাগাই। ইচ্ছা করে সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করিয়ে বলি- তোমরা এই পৃথিবীতে কেন এসেছ? যেখানে পদে পদে প্যাসাদের খেলা, সেখানে কেন এসেছ?

পরীক্ষার আগের রাতে ইচ্ছা করে টিভি চালিয়ে একটু টকশো দেখি। দুই রাজনীতি বিশ্লেষকের বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কঠিন কঠিন পর্যালোচনা শুনে মন চায় নিজেও একটু করি। পরীক্ষার আগের রাতে লিস্ট করতে ইচ্ছা করে, যদি কখনো এক কোটি টাকা পাই, তবে কী কী করা যায়। ইচ্ছা করে, গান গাই। মন চায় কারোর বিয়েতে একটু নেচে আসি। ভাবতে ভালো লাগে, স্টেজে উঠে নিজের অরা দিয়ে বিয়েবাড়ির সব মেয়েকে কাত করে ফেলতে। ইচ্ছা করে- টুকরো টুকরো করে দেখো মনের ভেতর গানে শাকিব খানের মতো একটু নাচি। পরীক্ষার আগের রাতে আমরা আচমকা আবিষ্কার করি, শুধু গান গাওয়া ও নাচাই আমাদের একমাত্র প্রতিভা নয়, বরং আমরা বাসাবাড়ির সুইচ গণনায় রীতিমতো সিদ্ধহস্ত।

পরীক্ষার আগের রাতে আমরা গুণে শেষ করি, আমাদের বাসায় মোট কয়টা লাইট, কয় ওয়াটের, কত করে বিদ্যুত খরচ হয় ওতে। আমরা গুণে শেষ করি, মেঝেতে মোট কয়টা টাইলস বসানো, বিছানার তলায় দুটো তোষকের নিচে কয়টা পলিথিন রাখা আছে এবং ঠিক কি পরীমাণ তুলো জমেছে আমাদের নাভির ভেতর। পরীক্ষার আগের রাতে ছয় শতাব্দী পর গোসল করতে ইচ্ছা করে। সাবান গায়ে মেখে ইচ্ছা করে শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকি অনন্তকাল। পরীক্ষার আগের রাতে সময় নিয়ে হাগতে ভালো লাগে। ভালো লাগে গ্রুপচ্যাটে 'সিলেবাস শেষ' বলে বন্ধুদের হোগায় আগুন ধরিয়ে ওদের রাতের ঘুম হারাম করে দিতে। পরীক্ষার আগের রাতে ইচ্ছা করে টেম্পুস্ট্যান্ডে গিয়ে চাঁদা তুলি। মন চায় ফেইক আইডি থেকে বিভিন্ন শাড়ির পেইজে অহেতুক শাড়ির দাম জিজ্ঞেস করি। মন চায় আইফোনের পেজে গিয়ে বলি, নতুন কোনটা আসছে, স্টকে আছে? ইচ্ছা করে ডাকসু পেইজের ইনবক্সে মেসেজ দিই- ইউরেনিয়াম আছে? পরীক্ষার আগের রাতে মানুষকে জ্বালাতন করতে ইচ্ছা করে। পরীক্ষার আগের রাতে ভেতর থেকে ভুস ভুস করে কবিতা বের হয়। ইচ্ছা করে, যারা রাত জেগে পড়ছে, তাদের ফোন দিয়ে বলি- তুমি কি এখন রাতে ঘুমাও না? রাতে ঘুম হয় তোমার?

৭২ পঠিত ... ১৮:০৭, জানুয়ারি ১৮, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top