ধর্মীয় নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদি ও অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের ভক্তবৃন্দ দুটি বিপ্রতীপ গ্রুপ। কিন্তু তাদের অন্ধভক্তি, যুক্তিবোধ, ক্রোধাগ্নি আর খারিজি প্রবণতা মোটামুটি একই রকম। সাঈদি ও নূর উভয়েই খুব প্রতিভাবান অভিনেতা। একজন মঞ্চে ওয়াজ করার সময় অভিনয়ক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন; আরেকজন মঞ্চনাটক ও টিভি নাটকে অভিনয়দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। একজন ইসলামি চেতনার নামে আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করেছেন; আরেকজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করেছেন। তারা ভিন্নমতের মানুষকে যথাক্রমে নাস্তিক ও জঙ্গি তকমা দিয়ে হত্যাযোগ্য করে তোলার গণসম্মতি আদায়ের চেষ্টা করেছেন। একজন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দোসর, আরেকজন ২০০৯-২৪ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দোসর।
সাঈদি ও নূরের ভক্তেরা তাদের চেতনাগুরুর অপরাধ অস্বীকার করে তাদের নির্দোষ দাবি করে থাকেন।
সাঈদি ও নূরের কস্টিউমের মাঝে পার্থক্য একটি টুপির। এ বাদ দিলে সাঈদি ও নূরের ভক্তদের মাঝে বিশেষ কোনো পার্থক্য নাই। সুর করে কোরআন পড়ার শিক্ষা আর সুর করে কবিতার কণ্ঠশীলন করার মাঝে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। কারণ, কোরআন কিংবা কবিতার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে পড়ার সামর্থ্য থাকলে এমন প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার আগুন তাদের বুকে জ্বলত না। এমন যুক্তিবুদ্ধিহীন রোবট মানব তারা হতে পারত না। এদের পৃথিবীর সমস্ত যুক্তিবুদ্ধি এক জায়গায় করেও বোঝানো যাবে না যে, সাঈদি ও নূর গুরুতর অপরাধের অংশীদার। তারা তাদের প্রতিভা কাজে লাগিয়েছেন দেশের মানুষকে বিভাজিত করতে। বিদ্বেষের কারবারি এরা।
একজন আলেম সাঈদির ভক্ত, একজন অধ্যাপক নূরের ভক্ত। আলেম নূরের শাস্তি চেয়েছেন; কিন্তু সাঈদিকে নির্দোষ বলে রায় দিয়েছেন। অধ্যাপক সাঈদির শাস্তি চেয়েছেন; আর নূরকে নির্দোষ বলে রায় দিচ্ছেন। লক্ষ্য করুন, আলেম বা অধ্যাপক উভয়ের কারোর মাঝেই নৈর্ব্যক্তিকতা নেই। তারা দুই পাল পরস্পরবিদ্বেষী কোলাহলের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ঐ আলেম ও অধ্যাপক হয়তো চাচাতো ভাই। একজন ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়েছেন, আরেকজন বিশ্বভারতীতে পড়েছেন। নিজ নিজ জ্ঞানজগতে উভয়েই শিক্ষিত মানুষ। রাজনীতি এমন একটি জিনিস, যা চাচাতো ভাইকে শত্রুতে পরিণত করে। শিক্ষাকে লঘু করে ফেলে।
যেহেতু আমাদের সমাজে সাঈদি আর নূর দুজন আইকন; আলেম ও অধ্যাপক দীক্ষাগুরু; ফলে তাদের ভক্তেরা সামান্য একটি টুপির পার্থক্যে কিংবা মুখ আড়াল করা সুলতানা রাজিয়ার ভঙ্গিতে তোলা প্রোফাইল পিকচার ও ঘাড় কাত করে অপর্ণা সেনের মুখভঙ্গিতে তোলা প্রোফাইল পিকচারের পার্থক্যে বিরাট দুই কালচারাল ফ্রন্ট গড়ে তুলেছে।
আধাখ্যাঁচড়া ইতিহাসজ্ঞানে অটোমান এম্পায়ার আর বেঙ্গল রেনেসাঁর গর্ব বুকে ধারণ করে, সমান্তরাল ও বিপরীতমুখী লাইফস্টাইল নিয়ে এরা পরস্পরের খেলনা শত্রু হিসেবে সমাজে বিরাজ করছে। খোদ ইস্তাম্বুলে কিংবা কলকাতায় এরকম ইমিটেশন শোর অভিনেতা-অভিনেত্রী আপনি আর পাবেন না।
এই দুটি খেলনা সমাজকে তাপিত করতে প্রথম আলো ও আমার দেশ নামে দুটি দৈনিকও চালু রয়েছে। প্রথম আলো দীর্ঘদিন জঙ্গি চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে তাকে হত্যাযোগ্য করার কাজটি করেছে। আমার দেশ এককালে নাস্তিক চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে তাকে হত্যাযোগ্য করে তুলেছে। ফলে সাংবাদিকতার আচরণবিধি ক্ষুণ্ণ করে কেবল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি আর অটোমান প্যালেস হয়ে ঢাকায় টিকে রয়েছে তারা।
যেহেতু আজকের কাগজ থেকে ভোরের কাগজ হয়ে প্রথম আলো ঢাকায় বেঙ্গল রেনেসাঁর প্রতিনিধিত্বশীল মিডিয়া হিসেবে অসংখ্য জার্নালিস্ট ক্যাডার তৈরি করেছে; ফলে নিউ মিডিয়া বলে যে নতুন নতুন নূরের আলো তৈরি হচ্ছে, সেখানেও ঘুরেফিরে জুলাই বিপ্লবকে অর্থহীন প্রমাণের আকুতি। আর সাঈদির আলো যেহেতু মিডিয়ায় বিকশিত হয়নি; ফলে ইউটিউব-ফেসবুকেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে অর্থহীন প্রমাণের আকুতি।
নিজেরাই নিজেদের অর্জনগুলোকে ম্লান করে, নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে বসে থাকার এই আত্মবিনাশী প্রক্রিয়া পৃথিবীতে বিরল। 'দেশ এবং দেশের মানুষ নয়', নিজ নিজ ট্রাইবাল বিশ্বাসে বুঁদ সাঈদি ও নূরের ভক্তেরা।
ঔপন্যাসিক ওয়ালীউল্লাহ তাঁর লালসালু উপন্যাসে যে লালসালুর মাজারের কথা বলেছিলেন, আমাদের সমাজের বিপ্রতীপ এই দুটি গোষ্ঠীর অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার প্রতিপালনের প্রতীকী গল্প ছিল সেটা। সমাজকে এই প্রাগৈতিহাসিক পুনরাবৃত্তির ঘেরাটোপে বন্দী রেখে দেশকে এক বিন্দু এগোতে না দেওয়ার লাটিম খেলা এইসব পুনরাবৃত্তিকর দিনরাত্রি। ইনফেরিয়রের ঘাড় গুঁজে সুপিরিয়র সাজার 'যেমন খুশি তেমন সাজো'র আসর এই উদ্দেশ্যহীন বচসামালা। অন্যকে ছাপড়ি, ফইন্নি, মূর্খ ডেকে চকিতে এলিট সাজার ছুঁচোর কেত্তন এই হামবড়াদের আখড়া।
আমার ভীষণ ভয় হয় জেন আলফা, জেন জি ও জুনিয়র মিলেনিয়ালদের নিয়ে; তারাও যদি ঐ চাচাতো ভ্রাতৃদ্বয় আলেম ও অধ্যাপকের কাছ থেকে শতবর্ষের বিভাজন ও বিদ্বেষের দীক্ষা নিয়ে ফেলে, তাহলে এ সমাজের আর রক্ষা নেই। আলেম-অধ্যাপক, মিডিয়া-নিউ মিডিয়া আসলে স্ট্যাটাস কো টিকিয়ে রেখে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাহারা দেওয়ার পণ্ডিত। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অনুবাদ প্রতিটি মানুষের জীবনে হোক, তা আসলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি কিংবা অটোমান প্যালেস নামের মিডিয়া কিংবা আলোকিত নিউ মিডিয়াগুলোর কেউই চায় না। তাদের শখ, ক্ষমতায় যেই থাকুক, পুচ্ছ দুলিয়ে ঘোরা, আর 'ভাই গিয়ে ভাই এলে' নতুন ভাইয়ের স্তবসংকীর্তন।
যতক্ষণ এই বুমারস, জেন এক্স, সিনিয়র মিলেনিয়ালদের জোর করে টিকিয়ে রাখা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অবসান না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত হাদি-শাকিল-সাওরির মতো তরুণ বলি দিয়ে দেবতা-তুষ্টির মাংসের কারবার বন্ধ হবে না।
যতদিন সার্কাসের দর্শক ওপরে ট্রাপিজের দিকে লক্ষ্য না রেখে নিচে একচাকার সাইকেল নিয়ে ঘোরা জোকারদের নিয়ে মেতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত ভাঁড়ের খেলা দেখাতে দেখাতে অনেক ওপরের ট্রাপিজে সার্বভৌমত্ব বিপণনের খেলাটা ধরা পড়বে না দর্শকের চোখে।



পাঠকের মন্তব্য