১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। আর্জেন্টিনা তখন বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়ে। মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বদলি খেলোয়াড় রিকার্দো বোচিনি। তাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলেন আর্জেন্টিনার ফুটবল টিমের তৎকালীন অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা। তারপর বললেন, আসুন মাস্টার, আমরা আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।
ভাবতে পারেন, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যে ফুটবলারকে আইডল মানে, সেই ম্যারাডোনারও একজন আইডল ছিলেন! আর বিশ্বকাপের মাঠে নিজের সেই আইডলকে স্বাগত জানানোর সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু বোচিনির প্রতি ম্যারাডোনার এই শ্রদ্ধার গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে, আর্জেন্টিনার ভিয়া ফিয়োরিতো নামের এক দরিদ্র এলাকায়।
১৯৬০ সালে জন্ম ছোট্টো দিয়েগোর ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল প্রবল। বল পায়ে পেলেই যেন অন্য এক জগতে চলে যেতেন তিনি। কিন্তু নিজের পছন্দের ফুটবলারদের খেলা দেখার জন্য তখনকার দিনে সহজ কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাদের বাড়িতে টেলিভিশনও ছিল না। তাই প্রিয় খেলোয়াড়কে দেখতে তাকে যেতে হতো স্টেডিয়ামে।
সেই খেলোয়াড়টির নাম রিকার্দো বোচিনি। ডাকনাম ‘বোচা’। তিনি খেলতেন আর্জেন্টিনার ক্লাব ইন্ডিপেনদিয়েন্তেতে। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরি করা, দুর্দান্ত পাস দেওয়া আর প্রতিপক্ষকে বুদ্ধির খেলায় বোকা বানানোয় তার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। ছোট্ট ম্যারাডোনা তার খেলা দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। বোচিনিকে দেখার জন্য বুয়েনস এইরেসের কাছাকাছি আভেয়ানেদায় ক্লাবটির মাঠে যেতেন তিনি।
বড় হয়ে ম্যারাডোনা নিজেই যখন ফুটবল তারকা, তখনও নিজের আইডলের কথা বলতে দ্বিধা করেননি। ২০১৬ সালে বোচিনিকে উদ্দেশ করে দেওয়া এক অডিও বার্তায় তিনি বলেছিলেন, আমার আইডলের নাম রিকার্দো বোচিনি। এমন কি বলেছিলেন, বোচিনি তাকে শিখিয়েছেন কীভাবে বলকে ভালোবাসতে হয়!
অথচ তত দিনে ম্যারাডোনা নিজেই হয়ে উঠেছেন ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত খেলোয়াড়। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিল। কিন্তু এত খ্যাতির পরও ছোটোবেলার সেই মুগ্ধতা তার মধ্যে থেকে গিয়েছিল।
১৯৮৬ সালের সেই সেমিফাইনালে তাই বোচিনি যখন মাঠে নামলেন, ম্যারাডোনার কাছে মুহূর্তটা ছিল অন্য রকম। সতীর্থ হিসেবে নয়, যেন নিজের শৈশবের নায়ককে সামনে পেয়েছিলেন তিনি। যে মানুষটিকে একসময় মাঠে গিয়ে দেখতেন, আজ তার সঙ্গেই বিশ্বকাপের মঞ্চ ভাগ করে নিচ্ছেন!
আর্জেন্টিনা সেদিন ২-০ গোলে জিতে ফাইনালে উঠেছিল। পরে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপও জেতে তারা। সেই বিশ্বজয়ের সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু তার জীবনের গল্পে বোচিনির সঙ্গে কাটানো ওই কয়েক মিনিটের জায়গাটা আলাদা।
ফুটবলের এই গল্পের সবচেয়ে জাদুকরী দিকটা বোধহয় এটাই! আমরা যখন ম্যারাডোনার খেলা দেখে মুগ্ধ হই, তিনিও একসময় কারও খেলা দেখে আমাদের মতোই মুগ্ধ হতেন । তিনিও ছিলেন এমন একটা ছেলে, যে প্রিয় খেলোয়াড়ের মতো হতে চাইত, তার কাছ থেকে শিখতে চাইত।
সেই ছেলেটা একদিন নিজেই কোটি মানুষের আইডল হয়ে উঠেছিল। আর নিজের আইডলকে সামনে পেয়ে বিশ্বকাপের মাঠেও ভুলে যায়নি শৈশবের সেই মুগ্ধতাও!
তথ্যসূত্র
TN, Argentina, Clarín, TYC sports



পাঠকের মন্তব্য